লাতিন ফুটবলের প্রতি অন্ধ বাংলাদেশিরা, কতটুকু প্রেম পাবেন হামজারা?

মো.সাঈদুর রহমান

বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ , ০৯:৩৫ পিএম


লাতিন ফুটবলের প্রতি অন্ধ বাংলাদেশিরা, কতটুকু প্রেম পাবেন হামজারা?
টিএসসিতে বাংলাদেশিদের ফুটবল উন্মাদনা। ছবি: এএফপি

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের পর্দা নেমেছে, চ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন এবং রানার্স আপ আর্জেন্টিনা। ট্রফি ছাড়াও বড় অঙ্কের অর্থ পেয়েছে দুই দলই। ফাইনালিস্ট ছাড়াও বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া বাকি ৪৬টি দলই ফিফা থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে। বিশ্বফুটবলের এই উন্মদনায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে ফিফা।

প্রাথমিকভাবে ফিফা ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও টুর্নামেন্ট শেষে তাদের মোট আয় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে (প্রায় ১.৮৪৫ লক্ষ কোটি টাকা) গিয়ে পৌঁছেছে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের (৭.৫ বিলিয়ন ডলার) তুলনায় এই আয় প্রায় দ্বিগুণ।

২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে এতকিছু অর্জনের মধ্যে বেশকিছু দুঃসংবাদও রয়েছে। ৪৮ দল মাঠের লড়াইয়ে অংশ নিলেও বিশ্বকাপ জ্বর ভর করেছিল পুরো পৃথিবীর উপর। তাই এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ কেঁড়ে নিয়ে বেশকিছু মানুষের জীবন। 

সেই তালিকায় সবার উপরের রয়েছে বাংলাদেশের নাম। বাংলাদেশি ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার আসা নিহতের খবরের তথ্য অনুসারে এবারের বিশ্বকাপে ১১ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে আর্জেন্টিনার ফাইনাল হারের পর আত্মহত্যা করেন বেশ কয়েকজন মেসিভক্ত।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের পরেই রয়েছে আর্জেন্টিনা ও মেক্সিকোর নাম, বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়ে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে দেশ দুটিতে। অন্যদিকে বিশ্বকাপজয়ী স্পেনে প্রাণ হারিয়েছে ১ জন। এই চার দেশের মধ্যে আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো ও স্পেন বিশ্বকাপে অংশ নিলেও বাংলাদেশ বাছাই পর্ব খেলারই সুযোগ পায়নি। অথচ বিশ্বকাপ জ্বরে দেশটির ১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

২০২৬ বিশ্বকাপ কেঁড়ে নিলো ১১ যুবকের প্রাণ

বাংলাদেশ বিশ্বকাপ না খেললেও দেশটির প্রতি গ্রাম ও শহরে ছিল বিশ্বকাপ উন্মাদনার ছোয়া। পছন্দের দলের পতাকা নিজ বাড়ির আঙিনায়, অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রায় সবজায়গায় টাঙাতে দেখা গেছে। 

এছাড়াও মধ্যরাতে ঘুম বাদ দিয়ে প্রিয় দলের খেলা দেখতে বড় পর্দার সামনে বসে থাকতে হয়েছে ফুটবল প্রেমিদের। তবে প্রশ্ন হলো— কাদের প্রতি এতোটান?

দক্ষিণ এশিয়ায় ফুটবল উন্মাদনা মানেই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা। কিছু সংখ্যক জামানি, পর্তুগাল ও ফ্রান্সের সমর্থক থাকলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল লাতিন আমেরিকার দুই দেশ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। লাতিন এই দুই দলের প্রতি লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের প্রেম এতটাই গভীর যে তা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বিশ্বে।

ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা ম্যাচ জিতলে বাংলাদেশিদের সেই জয়ের উল্লাস প্রকাশ করার হয় আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো— বাংলাদেশের মানুষ ফুটবলটাকে কতটা বুঝে উপভোগ করে?

ফুটবল বোদ্ধাদের মতে, জীবনের মতো ফুটবলেও জয়ের পাশাপাশি হার মানার মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামতে হয়। কারণ, এখানে বারবার পড়তে হয়, আবার উঠে দাঁড়াতে হয়। বারবার উঠে দাঁড়িয়েই সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে হয়। কিন্তু এই ত্বত্ত কি আসলেও বিশ্বাস করেন বাংলাদেশের ফুটবল প্রেমিরা।

প্রতিটি খেলাধুলায় সমর্থকরা প্রতিপক্ষ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটার মাত্রা কত দূর হওয়ার উচিত সেটা হয়তো আমাদের জানা নেই। জানা থাকলে হয়তো, বাংলাদেশের এতগুলো যুবকের প্রাণ যেত না। ফলে ফুটবল যে জয়-পরাজয়ের খেলা সেটা অনেকে বুঝে কিনা সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়।

বিশ্বকাপ শেষে দলের জয়-পরাজয় মেনে ক্লাবে ফিরতে শুরু করেছে ফুটবলাররা। সময়ের ব্যবধানে তারা ২০৩০ বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুতি নেবেন। কিন্তু বিশ্বকাপ শব্দটি এই ১১ টি পরিবারের কাছে কালো দাগ হিসেবে রয়ে যাবে।

কুমারখালীর রতন

গত ৫ জুলাই রাতে ব্রাজিল ও নরওয়ে ফুটবল দলের মধ্যকার খেলায় রতনের প্রিয় দল ব্রাজিল পরাজয় বরণ করে। রতন ব্রাজিল ফুটবল দলের একজন কট্টর সমর্থক ছিলেন। প্রিয় দলের পরাজয় তিনি মানসিকভাবে মেনে নিতে পারছিলেন না। তার ওপর সকালের দিকে প্রতিপক্ষ ফুটবল দলের সমর্থকদের অনবরত নেতিবাচক ট্রল ও উপহাসের শিকার হন তিনি। 

পরাজয়ের কষ্ট এবং প্রতিপক্ষের বিদ্রুপ সইতে না পেরে তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় ভেঙে পড়েন এই যুবক। পরে নিজের শোবার ঘরে গিয়ে ঘরের আড়ার সঙ্গে গলায় রশি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।

নিহত রতন কুমারখালীর হোসেন মিস্ত্রির ছেলে। তিনি পেশায় একজন শ্রমিক ছিলেন। মাত্র দুই মাস বয়সী একটি সন্তান রয়েছে তার। 

ভেড়ামারার ভ্যানচালক সুমন

সুমন হোসেন (৩২) উপজেলার বাহিরচর ইউনিয়নের ১৬ দাগ চাষি ক্লাব এলাকার মো. আফজাল হোসেনের একমাত্র ছেলে। সুমন আর্জেন্টিনার সমর্থক ছিল। তাই আর্জেন্টিনার হার সইতে না পেরে অভিমান করে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

পারিবারিক ও স্থানীয়রা সূত্রে জানা যায়, ভ্যানচালক সুমন হোসেন আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার ফাইনাল খেলা দেখে ভোর ৪টার সময় বাসায় ফিরেন। তিনি এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন দিয়ে আসছিলেন। এ উপলক্ষে রোববার রাতে তিনি তার নিজের পক্ষ থেকে খিচুড়ি ও গোস্ত রান্নার আয়োজনও করেছিলেন।

Bheramara-6a5e29592d940

খেলার শেষপর্যায়ে বাসায় ফিরে নিজ কক্ষের দরজা বন্ধ করে সুমন বিছানায় শুয়ে মোবাইল দেখছিলেন। এ সময় তার স্ত্রী জেমি খাতুন তাকে ঘুমিয়ে পড়তে বলে নিজেও ঘুমিয়ে যান।

জেমি খাতুন ভোর ৫টা ২০ মিনিটের দিকে উঠে দেখেন তার স্বামী শয়ন কক্ষের বাঁশের আড়ার সঙ্গে লাইলনের দড়ি দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় আছে।

নোয়াখালীর সৌদি প্রবাসী রায়হান

নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলায় বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখা নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার জেরে সৌদি প্রবাসী রায়হান নামের এক যুবকের আত্মহত্যা করেন।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রায়হান সৌদি আরব থেকে প্রায় এক বছর আগে দেশে ফেরেন। পাঁচ-ছয় মাস আগে তিনি বিয়ে করেন। গত রোববার রাতে কানকিরহাট বাজারে বন্ধুদের সঙ্গে আর্জেন্টিনা-স্পেনের বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখতে যান। বাইরে খেলা দেখা ও দেরিতে বাড়ি ফেরা নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর ঝগড়া হয়। 

সকালে স্ত্রী রাগ করে বাবার বাড়ি চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে যান। এ সময় রায়হান স্ত্রীকে আত্মহত্যার হুমকি দেন। স্ত্রী কিছু দূর গিয়ে স্বামীর বাড়ি ফিরে দেখেন রায়হান ঘরে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলছেন। খবর পেয়ে দুপুরে পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে।

বাকি ৮ জন কে

উপরের তিনজন আত্মহত্যা করলেও চলতি বিশ্বকাপ চালাকালীন সময়ে আরও ৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে একজন আর্জেন্টিনার পরাজয়ে হ্যার্টঅ্যাটাক ও একজন পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎতের স্পর্শের প্রাণ হারান। বাকিরা খেলা দেখতে গিয়ে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনায় ৪ জনের মৃত্যু

বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার হতাশাজনক পরাজয়ের দিনে ম্যাচ চলাকালীন তীব্র উত্তেজনায় বুয়েন্স আইরেসে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে দুই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। দেশটির জরুরি চিকিৎসা সেবা সংস্থা (এসএএমই) এ তথ্য জানিয়েছে। 

জরুরি বিভাগ সূত্র জানায়, মৃত দুই ব্যক্তির বয়স যথাক্রমে ৬৭ ও ৮৮ বছর। অফিসিয়াল রেকর্ড অনুযায়ী, গতকাল স্থানীয় সময় বিকেল ৬টা ৪০ মিনিটে মন্টসেরাট এলাকার সারান্দি ও অ্যাডলফো আলসিনা সড়কের মাঝামাঝি এলাকায় নিজ বাসায় হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া ৬৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তির বিষয়ে জরুরি কল আসে। চিকিৎসকরা সিপিআর দিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা চালালেও তাকে আর বাঁচাতে পারেনি।  

দ্বিতীয় ভুক্তভোগী ৮৮ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ বিকেল ৫টা ৩৯ মিনিটের দিকে একই রকম উপসর্গে আক্রান্ত হন। চিকিৎসকরা তাকে সিপিআর দেওয়ার পর ডুরান্ড হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

এ ছাড়াও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল জয়ের পর বুয়েনস আইরেসে খেলা দেখার সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে একজন (৫১) এবং কর্ডোবা প্রদেশে উদযাপনের সময় গুলিবর্ষণের ঘটনায় একজন (২০) তরুণ নিহত হন।

বিশ্বকাপে মেক্সিকোতে ৪ জনের মৃত্যু

বিশ্বকাপ উদযাপনের সময় মেক্সিকো সিটির রাস্তায় হাজার হাজার সমর্থকের ভিড়ে দমবন্ধ হয়ে ৩ জনসহ মোট ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

মেক্সিকো দল শেষ ৩২-এর ম্যাচে ইকুয়েডরকে ২-০ ব্যবধানে হারানোর পর আনন্দ উদযাপনের জন্য ‘অ্যাঞ্জেল অব ইন্ডিপেন্ডেন্স’ স্মৃতিস্তম্ভের কাছে হাজার হাজার সমর্থক জড়ো হলে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

পাসিও দে লা রেফোরমার আশপাশের বিভিন্ন স্থানে জরুরি উদ্ধারকারী দল তিনজনকে অচেতন অবস্থায় চিকিৎসা দেয় বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। রাজধানীটির সবচেয়ে প্রতীকী এই বুলেভার্ড এবং এর আশপাশের রাস্তাগুলোতে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে উদযাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ শুরুতে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক বার্তায় জানায়, উন্নত পুনরুজ্জীবন (resuscitation) চেষ্টার পরও, দমবন্ধ হয়ে ৪৪ বছর বয়সী এক পুরুষ এবং ১৯ বছর বয়সী এক নারীর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে।

পরবর্তী এক পোস্টে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, তৃতীয় মৃত ব্যক্তি হলেন ৪৮ বছর বয়সী এক নারী। নিকটবর্তী একটি রাস্তায় তিনি শ্বাসরোধে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে তিনি মারা যান। 

পরে কর্তৃপক্ষ চতুর্থজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে, গুরুতর খিঁচুনি ও পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণ নিয়ে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল এবং কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে (হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে) মৃত্যু হয় ৩০ বছর বয়সী এক যুবকের।

বিশ্বকাপ জয়ের উল্লাসে ১ স্প্যানিশ নাগরিকের মৃত্যু

ফাইনালে স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের পর উদযাপনের সময় পশ্চিম স্পেনে এক ফোয়ারা ধসে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরের মৃত্যু হয়।

সুতরাং, চলতি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৩ দেশে নিহতের সংখ্যা ৯। আর বিশকাপের বাছাই পর্ব খেলতে না পারা বাংলাদেশে মৃতের সংখ্যা ১১ জন।

বিশ্লেষকদের মতে, লাতিন ফুটবলের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের যে আবেগ তার অর্ধেক যদি দেশের ফুটবলের প্রতি দেখাতো তবে দেশের ফুটবল আরও এগিয়ে যেতো। 

চলতি বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত হবে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশি দর্শকদের আগ্রহই প্রমাণ করতে পারে দেশের ফুটবলের প্রতি তাদের টান কতটা গভীর।

আরটিভি/এসআর

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission