
মহাকাশপ্রেমীদের কাছে ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর দীর্ঘদিন ধরেই এক রহস্যময় জগত। ব্ল্যাকহোলের শেষ প্রান্তে আসলে কী আছে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা যুগের পর যুগ গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এবার সেই রহস্য উন্মোচনে বড় অগ্রগতি এল নাসার সর্বাধুনিক পর্যবেক্ষণে।
সম্প্রতি পৃথিবী থেকে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ আলোকবর্ষ দূরে সার্সিনাস গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থিত একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্বচ্ছ ছবি প্রকাশ করেছে নাসা। ছবিতে দেখা যায়, ব্ল্যাকহোলটি আশপাশের মহাকাশে ক্রমাগত শক্তিশালী বিকিরণ ছড়িয়ে দিচ্ছে। এর চারপাশে থাকা তপ্ত গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘ অত্যন্ত উজ্জ্বলভাবে দৃশ্যমান হয়েছে, যা আগে কখনো এত স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই নতুন ছবি কয়েক দশক ধরে চলা ব্ল্যাকহোল–সংক্রান্ত নানা মহাজাগতিক রহস্যের সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সাধারণভাবে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল তাদের আশপাশের গ্যালাক্সি থেকে পদার্থ গ্রাস করে সক্রিয় থাকে। এই পদার্থ ব্ল্যাকহোলে প্রবেশের সময় একটি ঘন ডোনাট আকৃতির বলয় তৈরি করে, যাকে বলা হয় ‘টোরাস’। প্রচণ্ড ঘর্ষণের ফলে এই টোরাস অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে তীব্র আলো বিকিরণ করে।
একই সঙ্গে ব্ল্যাকহোলের দুই মেরু দিয়ে বিপুল পরিমাণ পদার্থ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বাইরে ছিটকে যায়, যা ‘আউটফ্লো’ নামে পরিচিত। তবে ১৯৯০ এর দশক থেকে বিজ্ঞানীরা একটি সমস্যার মুখোমুখি হন। টেলিস্কোপে ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রে অতিরিক্ত অবলোহিত বা ইনফ্রারেড আলোর উপস্থিতি ধরা পড়লেও প্রচলিত মডেল দিয়ে তার সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছিল না।
এই রহস্য সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যারোলাইনার গবেষক এনরিকে লোপেজ–রদ্রিগেজ ও তার দল জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপে ‘অ্যাপারচার মাস্কিং ইন্টারফেরোমিটার’ নামে একটি বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে জেমস ওয়েবের বিশাল আয়নাকে সাতটি ছোট লেন্সে ভাগ করে ছবির রেজোল্যুশন বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, সার্সিনাস গ্যালাক্সির ওই ব্ল্যাকহোল থেকে নির্গত ইনফ্রারেড বিকিরণের প্রায় ৮৭ শতাংশই আসছে টোরাস বা ডোনাট আকৃতির বলয় থেকে। বিপরীতে আউটফ্লো থেকে আসছে মাত্র ১ শতাংশেরও কম বিকিরণ। এই ফলাফল জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই আবিষ্কার মহাজাগতিক মডেলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। তবে আরও উজ্জ্বল ও শক্তিশালী ব্ল্যাকহোলের ক্ষেত্রে ফলাফল ভিন্ন হতে পারে বলেও সতর্ক করছেন তারা। গবেষক লোপেজ–রদ্রিগেজ বলেন, ব্ল্যাকহোলের শক্তি ও ভরের সম্পর্ক পুরোপুরি বুঝতে আমাদের অন্তত ডজনখানেক ব্ল্যাকহোল নিয়ে আরও গবেষণা করতে হবে।
মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় বস্তুগুলোর একটি ব্ল্যাকহোলকে বোঝার পথে এই গবেষণাকে বিজ্ঞানীরা একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।
সূত্র: ডেইলি মেইল
আরটিভি/এসকে


