
পৃথিবীতে প্রতি ২৬ সেকেন্ড পরপর ঘটে মৃদু এক ধরনের ভূকম্পন। কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা এই রহস্য নিয়ে গবেষণা করলেও এখনো এর সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে বের করতে পারেননি। পৃথিবীর এই নিয়মিত স্পন্দন প্রাকৃতিক কোনো বিশেষ প্রক্রিয়ার ফল, নাকি সমুদ্রের ঢেউ কিংবা আগ্নেয়গিরির প্রভাবে সৃষ্টি হচ্ছে, তা নিয়ে রয়েছে একাধিক তত্ত্ব।
বিজ্ঞানীদের কাছে এই ঘটনা পরিচিত ‘২৬-সেকেন্ড মাইক্রোসিজম’ বা পৃথিবীর স্পন্দন নামে। ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিকে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লামন্ট-ডোহার্টি জিওলজিক্যাল অবজারভেটরির ভূতাত্ত্বিক জ্যাক অলিভার প্রথম এই নিয়মিত কম্পন নথিভুক্ত করেন। তবে সে সময় আধুনিক সিসমোলজিক্যাল যন্ত্রপাতি না থাকায় স্পন্দনটির উৎস ও প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তী সময়ে গবেষণায় দেখা যায়, এই স্পন্দনের উৎসের সঙ্গে পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলবর্তী গিনি উপসাগরের বাইট অব বনি অঞ্চলের সম্পর্ক রয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে সেখানে প্রতি ২৬ সেকেন্ডে এমন কম্পন তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
একদল গবেষকের ধারণা, এর পেছনে রয়েছে সমুদ্রের ঢেউ। তাদের মতে, মহাসাগরের নিচে থাকা মহীসোপান বা কন্টিনেন্টাল শেলফ বিশেষ ধরনের প্রতিফলক হিসেবে কাজ করে। গিনি উপসাগরের নির্দিষ্ট এলাকায় সমুদ্রের ঢেউ নিয়মিতভাবে তলদেশে আঘাত করায় ভূকম্পনের মতো স্পন্দন তৈরি হতে পারে। অনেকটা বাদ্যযন্ত্রের ড্রামে আঘাত করলে যেমন নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের শব্দ তৈরি হয়, এখানেও তেমন একটি প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে।
অন্যদিকে, আরেক দল গবেষক এই স্পন্দনের জন্য আগ্নেয়গিরিকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, বাইট অব বনির কাছে সাঁও তোমে দ্বীপের একটি আগ্নেয়গিরির অবস্থান এবং স্পন্দনের উৎসের মধ্যে সম্ভাব্য যোগসূত্র রয়েছে। জাপানেও আগ্নেয়গিরির কারণে এ ধরনের নিয়মিত সিসমিক স্পন্দনের নজির পাওয়া গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে রহস্যটি অমীমাংসিত থাকলেও বিজ্ঞানীদের কাছে এটি এখনো বড় কোনো উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠেনি। কারণ, এই কম্পন অত্যন্ত মৃদু এবং এর সঙ্গে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে, বিশেষ করে বড়দিনের আগে, পৃথিবীর এই সিসমিক স্পন্দনের তীব্রতা কমে আসার প্রবণতা দেখা গেছে।
প্রায় ছয় দশক ধরে গবেষণা চললেও প্রতি ২৬ সেকেন্ডে পৃথিবীর এই নিয়মিত স্পন্দনের প্রকৃত কারণ এখনো অজানা। ফলে পৃথিবীর ভূকম্পনবিষয়ক গবেষণায় এটি এখনো অন্যতম আকর্ষণীয় এক রহস্য হয়ে রয়েছে।
আরটিভি/এসকে



