ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

মেঘনার বুকের নতুনচরে সম্ভাবনার হাতছানি

বাসস

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০১:০৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে মেঘনার বুকে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় অবস্থিত বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া। এটি ১৯৮৩ সালে উপজেলা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও এই অঞ্চলের রয়েছে তিন হাজার বছরেরও বেশি ইতিহাস। নদী ভাঙন- যেমন এই জনপদের নিত্য সঙ্গী তেমনি নদীর বুকে জেগে ওঠা নতুন নতুন চরগুলো উঁকি দিচ্ছে সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে। গত চার দশকে দ্বীপ উপজেলাটির চারপাশে মেঘনার বুকে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩শ’র ও বেশি চর জেগেছে। এরইমধ্যে ১ লাখ ৬৪ হাজার একর চরাঞ্চলের জমি ভূমি মন্ত্রণালয়ে নথিভুক্ত হয়েছে।

নতুন করে জেগে ওঠা এসব চরে কোথাও মানুষ বসবাস শুরু করেছে, আবার কোথাও গরু-মহিষ পালন কিংবা ফসলের আবাদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। এরইমধ্যে আবার কিছু চরে সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

জানা গেছে, মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা এসব চরের নামকরণ করা হয়েছে ঢালচর, চরঘাসিয়া,চর আতাউর, দমার চর, চর নিঝুাম, গাঙ্গুরিয়ার চর, জাগলার চর, মৌলভীর চর, জাহাইজ্জার চর, চর মোহাম্মদ আলী, বদনার চর, চর আয়েশা আলী, লাল চর, কবিরার চর, চর নুর ইসলাম,কালির চর, কলাতলি, তেলিয়ার চর, ভাসানচর নামে।

এছাড়া হাতিয়ার দক্ষিণে আরও নতুন কিছু ডুবোচরের সন্ধান পাওয়া গেছে। ফলে হাজার হাজার একর নতুন ভূমি যুক্ত হতে চলেছে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানায়। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু চরে মানুষের বসবাস শুরু হয়েছে। আবার কিছু চরে ধান চাষ, গরু, মহিষ ও ভেড়ার চারণভূমি গড়ে উঠেছে।

সরেজমিনে হাতিয়ার চর আতাউর পরিদর্শন করে জানা গেছে, উপজেলার সোনাদিয়া এবং তমরদ্দি ইউনিয়নের পাশাপাশি অবস্থিত এই চরটি প্রায় বছর বিশেক আগে নদীর বুকে জেগে উঠেছে। ২০২০ সালে বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর পক্ষ থেকে চরটিতে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্প গড়ে তোলা হয় এবং সেখানে ২শ’ ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। এর বাহিরেও প্রায় শতাধিক পরিবার এখানে বসবাস করে। এখনো চরটির বিশাল পরিমাণ ভূমি খালি পড়ে আছে। এসব ভূমি স্থানীয়রা ধান চাষ, গরু-মহিষ ও ভেড়ার চারণভূমি হিসেবে ব্যবহার করছেন।

সুখচর ইউনিয়নের পাশে অবস্থিত জাগলার চরে গিয়ে দেখা গেছে, বিশাল আয়তনের এই চর এখনো জনমানব শূন্য। চরটিতে বিভিন্ন ভূমিদস্যুরা নামে-বেনামে ভূমি দখল করে আছেন। সর্বশেষ গতবছর এই সকল দখলকৃত ভূমি নিয়ে সংঘর্ষে প্রায় ৮জনের মৃত্যু হয়েছে।

সুখচর ইউনিয়নের আরেকটি চরের নাম ঢালচর। ৯০ এর দশকে জেগে ওঠা এই চরটিতে বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করেন।

১৯৭৮ সালে বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা জাহাইজ্জার চর একসময় জলদস্যু ও সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত থাকলেও ২০১৩ সালে এর নাম পরিবর্তন করে স্বর্ণদ্বীপ রাখা হয় এবং এর প্রশাসনিক ও নিরাপত্তার দায়িত্ব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে ৩৬০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের চরটিতে নানা অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। সেনাবাহিনী এই দ্বীপ থেকে জলদস্যুতা নির্মূল করেছে এবং ৬০হাজারের বেশি গাছ লাগিয়েছে। এটি বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

মেঘনার বুকে জেগে ওঠা ৪০ বর্গকিলোমিটারের আরেকটি চর ভাসানচর, যেটি একসময় ঠেঙ্গারচর নামে পরিচিত ছিল। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোর ওপর চাপ কমানোর উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকারের ‘আশ্রয়ণ-৩’ প্রকল্পের আওতায় এই চরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করা হয়। রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার জন্য দ্বীপে ৯ ফুট উঁচু বেড়িবাঁধ এবং আধুনিক আবাসন অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে এখানে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করছেন।

এছাড়া আরও কিছু চরে বিচ্ছিন্নভাবে মানুষ বসবাস শুরু করেছেন। স্থানীয়দের দাবি, মেঘনার মুখে জেগে ওঠা এসব চরগুলোকে কাজে লাগানো গেলে এবং এগুলোর সঠিক ব্যবহার করা গেলে এ সকল চরগুলো দেশের অর্থনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি হতে পারে। নতুন করে জেগে ওঠা এসব চরগুলো অর্থনীতির দিক থেকে ব্যাপক সম্ভাবনাময়।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ মহিনুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, গবেষণায় বলছে, প্রতিবছর প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন টন পলি জমা হয় বঙ্গোপসাগরে। এসব পলি থেকে জন্ম নেয় নতুন নতুন চরের। চরগুলোতে বিভিন্ন কৃষি পণ্য যেমন-বাদাম, সয়াবিন, এমনকি ধানও খুব ভালো হচ্ছে। এই চরগুলো বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। চরগুলোকে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যবহার করা গেলে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে যোগ হতে পারে নতুন মাত্রা। পাশাপাশি এসব চরকে পরিকল্পিতভাবে প্রস্তুত করে ‘টুরিস্ট জোন’ হিসেবেও কাজে লাগানো যেতে পারে। তাতে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটতে পারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নোয়াখালীর উপপরিচালক আশীষ কুমার কর গণমাধ্যমকে জানান, প্রতিবছর মেঘনার ভাঙনে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। ভিটেমাটি হারা এসব মানুষকে বসবাসের জন্য নতুন করে ফসলি জমিগুলো ব্যবহার করে ঘর-বাড়ি বানাতে হচ্ছে। এতে কৃষিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অথচ মেঘনার বুকে জেগে ওঠা বসবাস উপযোগী চরগুলোতে যদি নদী ভাঙনের কবলে ভিটেমাটি হারানোদের জন্য বসবাসের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে কৃষি জমির ওপর এর প্রভাব পড়বে না। কৃষিতেও কোনো বিপর্যয়ের সম্ভাবনা থাকে না।

নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, মেঘনার বুকে জেগে ওঠা চরগুলোকে নিয়ে সরকারের অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। চরগুলো যাতে বেদখল না হয় সেজন্য জেলা প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু চরের জমি ভূমিহীনদের মাঝে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। চরগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হতে পারে।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
তাহিরপুরে বোরো আবাদে ব্যস্ত কৃষক, প্রণোদনার বীজ-সার নিয়ে ক্ষোভ
দেশের অন্যতম বৃহৎ হাওরাঞ্চল সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে শুরু হয়েছে বোরো মৌসুমের বীজতলা তৈরির কাজ। বর্ষায় পানিতে থইথই করা হাওরের বিস্তীর্ণ বুকে শুষ্ক মৌসুমে ফলবে সোনালি ধান। বছরের একমাত্র প্রধান ফসল বোরো ধানকে ঘিরেই আবর্তিত হয় এখানকার কৃষকদের জীবন জীবিকা। তবে গত মৌসুমে জলাবদ্ধতা ও ধানের গুণগত মানের অবনতিতে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছিলেন কৃষকরা। সেই ক্ষতি কাটিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশায় এবার আগেভাগেই বীজতলা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন তারা। তবে কৃষি প্রণোদনার আওতায় সঠিক সময়ে বীজ ও সার না পাওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে কৃষকদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, অনেক সময় বীজতলা তৈরির কাজ শেষ হওয়ার পর কৃষি অফিস থেকে বীজ ও সার দেওয়া হয়। ফলে এসব সরকারি সহায়তা কাজে না এসে নষ্ট হচ্ছে।
তাহিরপুরে বোরো আবাদে ব্যস্ত কৃষক, প্রণোদনার বীজ-সার নিয়ে ক্ষোভ
কলা কি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে!
জলবায়ু পরিবর্তন এবং মারাত্মক সব উদ্ভিদ রোগের আক্রমণে বিশ্বজুড়ে কলা চাষ এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, ক্যাভেন্ডিশ জাতের কলা এখন অস্তিত্বের লড়াই করলেও সংকট কাটিয়ে ফলটিকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এক নতুন আশার দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
কলা কি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে!
উৎপাদন বাড়লেও পুষ্টিমান হারাচ্ছে ফসল, যা বলছে গবেষকরা
আধুনিক নিবিড় কৃষি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মিলিত প্রভাবে বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্যের পুষ্টিগুণ দিন দিন কমতে কমতে ক্রমান্বয়ে তলানিতে ঠেকছে। গত কয়েক দশকে উৎপাদনমুখী চাষাবাদের কারণে শস্যের ফলন ও আকার বাড়লেও চাল, গম ও সবজিতে জিংক, আয়রন ও প্রোটিনের মতো জরুরি অণুপুষ্টির ঘনত্ব ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।  ফলে পেট ভরা খাবার পেয়েও প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের অভাবে কোটি কোটি মানুষ এক মারাত্মক ‘প্রচ্ছন্ন ক্ষুধা’ বা অদৃশ্য অপুষ্টির শিকার হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য নীতিনির্ধারকদের সামনে এক নতুন বৈশ্বিক সংকট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। যুক্তরাজ্যের অলাভজনক বিজ্ঞান সংস্থা ডিপ সায়েন্স ভেঞ্চারস (ডিএসভি) এবং মার্ক লিওনার্ড ট্রাস্ট-এর যৌথ উদ্যোগে ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসের শুরুতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত ‘হলো হারভেস্ট’ (ফাঁপা ফসল) নামক একটি বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদনের পূর্ণ শিরোনাম হলো: ‘হলো হারভেস্ট: রিবিল্ডিং দ্য নিউট্রিশনাল ভ্যালু অব ক্রপস ইন অ্যান এজ অব আবান্ড্যান্ট ক্যালোরিজ’ (ফাঁপা ফসল: প্রচুর ক্যালোরির যুগে ফসলের পুষ্টিমান পুনর্গঠন)। নেদারল্যান্ডসের লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০২৬ সালের একটি সাম্প্রতিক মেটা-অ্যানালাইসিসে ৪৩টি খাদ্যশস্যের প্রায় ৬০ হাজারটি পুষ্টিগত পরিমাপ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধির কারণে উদ্ভিদে শর্করা ও ক্যালোরির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু প্রোটিন, জিংক ও আয়রনের মতো খনিজ গড়ে ৩.২ শতাংশ কমে যাচ্ছে। এমনকি কিছু বিশেষ ফসলে জিংকের পরিমাণ ৩৭.৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ার প্রমাণ মিলেছে।  সাম্প্রতিক এই গবেষণাগুলোর ভয়াবহ তথ্য কৃষি ও পুষ্টিবিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক নিবিড় কৃষি পদ্ধতি, উচ্চ ফলনশীল জাতের একচেটিয়া চাষাবাদ এবং তীব্র জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্বব্যাপী প্রধান প্রধান খাদ্যশস্যের পুষ্টির মান ও ঘনত্ব (নিউট্রিয়েন্ট ডেনসিটি) আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। গত কয়েক দশকে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শস্যের গুণগত মানের চেয়ে পরিমাণের ওপর বেশি জোর দেওয়ায় উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদিত খাদ্যের পুষ্টিগুণ ক্রমান্বয়ে তলানিতে ঠেকছে। ফলে পেট ভরার মতো পর্যাপ্ত খাবার বা ক্যালোরি পেলেও প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের অভাবে কোটি কোটি মানুষ ‘প্রচ্ছন্ন ক্ষুধা’ বা তীব্র অণুপুষ্টির ঘাটতির (মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ডেফিসিয়েন্সি) শিকার হচ্ছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুষ্টি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এই সংকটের রূপ আরও স্পষ্ট। সর্বশেষ ‘জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সার্ভে’-র তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ শিশু এবং ৫৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারী তীব্র জিংক বা দস্তার ঘাটতিতে ভুগছেন। প্রধান খাদ্য হিসেবে প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে চাল বা ভাত খাওয়া সত্ত্বেও মানুষের শরীরে জিংক ও আয়রনের মতো অত্যাবশ্যকীয় খনিজের এই ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। মূলত প্রথাগত উচ্চ ফলনশীল সাদা চালের পুষ্টি ঘনত্ব কমে যাওয়া এবং সুষম খাদ্যাভ্যাসের অভাবই এর অন্যতম প্রধান কারণ। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ)-এর দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণ করে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. ডোনাল্ড ডেভিস ও তার দল ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখিয়েছিলেন, ১৯৫০ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে উৎপাদিত ৪৩টি বিভিন্ন ফসলে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, ভিটামিন সি এবং প্রোটিনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। কৃষিবিজ্ঞানীরা একে ‘ডিলিউশন ইফেক্ট’ বলছেন; যেখানে আধুনিক শস্যের আকার ও ফলন বাড়লেও পুষ্টির ঘনত্ব আনুপাতিক হারে কমে যাচ্ছে। তাছাড়া রাসায়নিক সারের অত্যধিক ব্যবহার এবং নিবিড় চাষাবাদের ফলে মাটির গভীরে থাকা ‘মাইকোরাইজাল ছত্রাক’ ও উপকারী অণুজীবের নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক মৃত্তিকা বিজ্ঞান সাময়িকীগুলোর গবেষণায় দেখা গেছে, এই অণুজীবগুলো উদ্ভিদের মূল বা শিকড়কে মাটি থেকে খনিজ পুষ্টি উপাদান শোষণে সরাসরি সাহায্য করে। এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত থাকায় উদ্ভিদ তার প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান পাচ্ছে না। দেশের সরকারি সংস্থা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই)-এর বার্ষিক ও জাতীয় ভূমি অবক্ষয় প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিবিড় চাষাবাদের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৭৬.২ শতাংশ আবাদি জমি মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার পুষ্টিহীনতার শিকার। সংস্থাটির দেশব্যাপী মৃত্তিকা পুষ্টি মানচিত্রের তথ্য বলছে, দেশের অর্ধেকেরও বেশি ফসলি জমির মাটিতে জৈব উপাদানের পরিমাণ আদর্শ মাত্রার চেয়ে কমে ১ থেকে ১.৫ শতাংশের নিচে নেমে গেছে এবং প্রায় সাড়ে ৫ মিলিয়ন হেক্টর চাষযোগ্য জমির মাটিতে দস্তা (জিঙ্ক), বোরন ও সালফারের মতো জরুরি অণুপুষ্টির তীব্র ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এদিকে আন্তর্জাতিক পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, ১৯৬০ সালের পর উদ্ভাবিত রুটি তৈরির গম বা ব্রেড-হুইটের তিন-চতুর্থাংশেরও কম জাত জিংকের ন্যূনতম আদর্শ মাত্রা পূরণ করতে পারছে। এই পুষ্টিহানি মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসকে অকার্যকর করে তুলছে। যেমন, আজ থেকে ৬০ বছর আগের একটি গাজর থেকে যে পরিমাণ পটাশিয়াম পাওয়া যেত, এখনকার গাজরে তার অর্ধেক পাওয়া যাচ্ছে, অর্থাৎ একই পুষ্টি পেতে একজনকে এখন দ্বিগুণ পরিমাণ গাজর খেতে হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও বিভিন্ন পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, খাদ্যশস্যের পুষ্টিমান কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানবদেহে। এর ফলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং সাব-সাহারা আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা, হাড় ক্ষয় এবং অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগ বাড়ছে। পর্যাপ্ত খাবার খাওয়ার পরও প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতের ওপর বিশাল আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। এটি ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি-২) ‘ক্ষুধা মুক্তি ও পুষ্টি নিশ্চিতকরণ’ এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে বড় অন্তরায়। এই অপুষ্টির সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ইতিমধ্যে বায়োফর্টিফাইড বা জিঙ্কসমৃদ্ধ চালের জাত (যেমন- ব্রি ধান-৭৪, ব্রি ধান-১০০) উদ্ভাবন করেছে, যা মানুষের শরীরে জিংকের দৈনিক চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করতে সক্ষম। তবে ব্রির বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, ভোক্তা পর্যায়ে অতিরিক্ত ছাঁটা ও চকচকে ‘মিনিকেট’ চাল খাওয়ার প্রবণতার কারণে চাল মিলিং ও পলিশিংয়ের সময় এর উপরিভাগে থাকা জিংক ও আয়রনের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত চাষের পাশাপাশি ভোক্তাদের আচরণ ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করাও জরুরি। ব্রির গবেষকরা এখন জিংক ও আয়রনের দ্বৈত সুবিধাযুক্ত আরও উন্নত জাতের ‘হেলদিয়ার রাইস’ উদ্ভাবনের লক্ষ্যে কাজ করছেন, যাতে একটি জাত থেকেই শরীরের অন্তত ৮০% জিংক এবং ৫০% আয়রনের চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়। বিশেষজ্ঞ মহল এই সংকট মোকাবিলায় অবিলম্বে প্রচলিত কৃষি নীতিতে আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা শুধু মোট ফলন বা ওজনের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং ফসলের পুষ্টির ঘনত্বের ওপর ভিত্তি করে কৃষকদের মূল্যায়ন ও প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলছেন। পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈব সার, অণুজীব ইনোকুল্যান্ট এবং শস্য পর্যায় পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছেন তারা। এছাড়া প্রথাগত হাইব্রিড ধান-গমের পাশাপাশি জিংক ও আয়রনসমৃদ্ধ স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী শস্য ও মিলেট চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন। নীতিনির্ধারকদের মতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেবল খাদ্যের সহজলভ্যতা বা ক্যালোরি নিশ্চিত করা নয়, বরং পুষ্টিকর ও গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্য নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। আরটিভি/এসআর
উৎপাদন বাড়লেও পুষ্টিমান হারাচ্ছে ফসল, যা বলছে গবেষকরা
আরও পড়ুন
নিষেধাজ্ঞা শেষে মধ্যরাত থেকে মাছ শিকারে নামছেন হাতিয়ার জেলেরা
হাতিয়ায় ট্রলার ডুবে নিখোঁজ দুই জেলের মরদেহ উদ্ধার
কর্ণফুলিতে কার্গো জাহাজের ধাক্কায় ট্রলার ডুবে দুই জেলে নিখোঁজ, শিকল ধরে বাঁচলেন একজন
৫০ বছরের দুর্ভোগের অবসান, সাঁকোর বদলে কাঠের সেতুতে বদলে যাচ্ছে তিন গ্রামের চিত্র