
বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে মেঘনার বুকে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় অবস্থিত বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া। এটি ১৯৮৩ সালে উপজেলা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও এই অঞ্চলের রয়েছে তিন হাজার বছরেরও বেশি ইতিহাস। নদী ভাঙন- যেমন এই জনপদের নিত্য সঙ্গী তেমনি নদীর বুকে জেগে ওঠা নতুন নতুন চরগুলো উঁকি দিচ্ছে সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে। গত চার দশকে দ্বীপ উপজেলাটির চারপাশে মেঘনার বুকে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩শ’র ও বেশি চর জেগেছে। এরইমধ্যে ১ লাখ ৬৪ হাজার একর চরাঞ্চলের জমি ভূমি মন্ত্রণালয়ে নথিভুক্ত হয়েছে।
নতুন করে জেগে ওঠা এসব চরে কোথাও মানুষ বসবাস শুরু করেছে, আবার কোথাও গরু-মহিষ পালন কিংবা ফসলের আবাদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। এরইমধ্যে আবার কিছু চরে সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
জানা গেছে, মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা এসব চরের নামকরণ করা হয়েছে ঢালচর, চরঘাসিয়া,চর আতাউর, দমার চর, চর নিঝুাম, গাঙ্গুরিয়ার চর, জাগলার চর, মৌলভীর চর, জাহাইজ্জার চর, চর মোহাম্মদ আলী, বদনার চর, চর আয়েশা আলী, লাল চর, কবিরার চর, চর নুর ইসলাম,কালির চর, কলাতলি, তেলিয়ার চর, ভাসানচর নামে।
এছাড়া হাতিয়ার দক্ষিণে আরও নতুন কিছু ডুবোচরের সন্ধান পাওয়া গেছে। ফলে হাজার হাজার একর নতুন ভূমি যুক্ত হতে চলেছে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানায়। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু চরে মানুষের বসবাস শুরু হয়েছে। আবার কিছু চরে ধান চাষ, গরু, মহিষ ও ভেড়ার চারণভূমি গড়ে উঠেছে।
সরেজমিনে হাতিয়ার চর আতাউর পরিদর্শন করে জানা গেছে, উপজেলার সোনাদিয়া এবং তমরদ্দি ইউনিয়নের পাশাপাশি অবস্থিত এই চরটি প্রায় বছর বিশেক আগে নদীর বুকে জেগে উঠেছে। ২০২০ সালে বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর পক্ষ থেকে চরটিতে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্প গড়ে তোলা হয় এবং সেখানে ২শ’ ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। এর বাহিরেও প্রায় শতাধিক পরিবার এখানে বসবাস করে। এখনো চরটির বিশাল পরিমাণ ভূমি খালি পড়ে আছে। এসব ভূমি স্থানীয়রা ধান চাষ, গরু-মহিষ ও ভেড়ার চারণভূমি হিসেবে ব্যবহার করছেন।
সুখচর ইউনিয়নের পাশে অবস্থিত জাগলার চরে গিয়ে দেখা গেছে, বিশাল আয়তনের এই চর এখনো জনমানব শূন্য। চরটিতে বিভিন্ন ভূমিদস্যুরা নামে-বেনামে ভূমি দখল করে আছেন। সর্বশেষ গতবছর এই সকল দখলকৃত ভূমি নিয়ে সংঘর্ষে প্রায় ৮জনের মৃত্যু হয়েছে।
সুখচর ইউনিয়নের আরেকটি চরের নাম ঢালচর। ৯০ এর দশকে জেগে ওঠা এই চরটিতে বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করেন।
১৯৭৮ সালে বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা জাহাইজ্জার চর একসময় জলদস্যু ও সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত থাকলেও ২০১৩ সালে এর নাম পরিবর্তন করে স্বর্ণদ্বীপ রাখা হয় এবং এর প্রশাসনিক ও নিরাপত্তার দায়িত্ব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে ৩৬০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের চরটিতে নানা অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। সেনাবাহিনী এই দ্বীপ থেকে জলদস্যুতা নির্মূল করেছে এবং ৬০হাজারের বেশি গাছ লাগিয়েছে। এটি বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
মেঘনার বুকে জেগে ওঠা ৪০ বর্গকিলোমিটারের আরেকটি চর ভাসানচর, যেটি একসময় ঠেঙ্গারচর নামে পরিচিত ছিল। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোর ওপর চাপ কমানোর উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকারের ‘আশ্রয়ণ-৩’ প্রকল্পের আওতায় এই চরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করা হয়। রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার জন্য দ্বীপে ৯ ফুট উঁচু বেড়িবাঁধ এবং আধুনিক আবাসন অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে এখানে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করছেন।
এছাড়া আরও কিছু চরে বিচ্ছিন্নভাবে মানুষ বসবাস শুরু করেছেন। স্থানীয়দের দাবি, মেঘনার মুখে জেগে ওঠা এসব চরগুলোকে কাজে লাগানো গেলে এবং এগুলোর সঠিক ব্যবহার করা গেলে এ সকল চরগুলো দেশের অর্থনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি হতে পারে। নতুন করে জেগে ওঠা এসব চরগুলো অর্থনীতির দিক থেকে ব্যাপক সম্ভাবনাময়।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ মহিনুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, গবেষণায় বলছে, প্রতিবছর প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন টন পলি জমা হয় বঙ্গোপসাগরে। এসব পলি থেকে জন্ম নেয় নতুন নতুন চরের। চরগুলোতে বিভিন্ন কৃষি পণ্য যেমন-বাদাম, সয়াবিন, এমনকি ধানও খুব ভালো হচ্ছে। এই চরগুলো বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। চরগুলোকে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যবহার করা গেলে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে যোগ হতে পারে নতুন মাত্রা। পাশাপাশি এসব চরকে পরিকল্পিতভাবে প্রস্তুত করে ‘টুরিস্ট জোন’ হিসেবেও কাজে লাগানো যেতে পারে। তাতে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নোয়াখালীর উপপরিচালক আশীষ কুমার কর গণমাধ্যমকে জানান, প্রতিবছর মেঘনার ভাঙনে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। ভিটেমাটি হারা এসব মানুষকে বসবাসের জন্য নতুন করে ফসলি জমিগুলো ব্যবহার করে ঘর-বাড়ি বানাতে হচ্ছে। এতে কৃষিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অথচ মেঘনার বুকে জেগে ওঠা বসবাস উপযোগী চরগুলোতে যদি নদী ভাঙনের কবলে ভিটেমাটি হারানোদের জন্য বসবাসের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে কৃষি জমির ওপর এর প্রভাব পড়বে না। কৃষিতেও কোনো বিপর্যয়ের সম্ভাবনা থাকে না।
নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, মেঘনার বুকে জেগে ওঠা চরগুলোকে নিয়ে সরকারের অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। চরগুলো যাতে বেদখল না হয় সেজন্য জেলা প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু চরের জমি ভূমিহীনদের মাঝে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। চরগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হতে পারে।
আরটিভি/এমএইচজে


