ঢাকা শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

আমার ঘুম ভাঙাইয়া গেলো গো মরার কোকিলে

পি আর প্ল্যাসিড (টোকিও, জাপান থেকে)

প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ০৪:২৮ পিএম
লেখক : পি আর প্ল্যাসিড

সম্প্রতি জাপানে অনুষ্ঠিত হলো ২৩ তম টোকিও বৈশাখী মেলা ও কারি ফেস্টিভ্যাল ১৪৩১। এ উপলক্ষে প্রতিবারের মতো দেশ থেকে কিছু শিল্পী আসার কথা ছিলো। কিন্তু ঢাকাস্থ জাপান দূতাবাসের কতিপয় বেরসিক কর্মকর্তা তাদের ভিসা না দিয়ে নাকি জাপানে আয়োজিত বৈশাখী মেলায় শিল্পীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রবাসীদের বিনোদন দিতে সহযোগিতা করেননি। তাই তড়িঘড়ি করে আমেরিকা থেকে আমেরিকান পাসপোর্টধারী বাংলাদেশী খ্যাতিমান কন্ঠশিল্পী বেবী নাজনীনকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত হয়।

শিল্পী বেবী নাজনীন যেহেতু আমেরিকার পাসপোর্টধারী তাই তাকে আমেরিকা থেকে জাপান আসতে ভিসা সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো সমস্যা হবে না মনে করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সমস্যা অবশ্য একটা ঘটেছিল অন্যত্র। নির্ধারিত সময় শিল্পী জাপানের উদ্দেশ্যে আমেরিকা থেকে রওনা হলে হঠাৎ একটি দুঃসংবাদ পান। ( মায়ের মৃত্যু ) এতে পথ ঘুরিয়ে তিনি চলে যান বাংলাদেশে। কারণ, সেই মূহুর্তে তাঁর মায়ের মৃত্যু সংবাদ তাকে কিছুটা হলেও মর্মাহত করে। ( আল্লাহ শিল্পী বেবী নাজনীনের মায়ের আত্মাকে বেহেশত নসীব করুন)।

মায়ের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে মন শক্ত করে যথাসময় চলেও আসেন তিনি জাপান। জাপানে শিল্পী বেবী নাজনীনের আসার সংবাদে মেলার আগেরদিন বাঙালী কমিউনিটিতে আনন্দের জোয়ার বইতে শুরু করে। এই জোয়ার বইতে দেখা যায় শিল্পীর ভক্তদের চেয়ে বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের শিবিরে।

স্থানীয় কয়েকজন আমার সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলে কথা বাড়াইনি। কারণ, অধিকাংশের কথা ছিলো, বেবী নাজনীনের জাপান আগমনে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে তিনি একজন শিল্পী এটাহ বড় পরিচয়, তাই। আমিও তখন তাদের সেই যুক্তিকে প্রাধান্য দিয়েছি। কিন্তু ফেসবুকে কয়েকজনের স্ট্যাটাস দেখে পরবর্তীতে সেটা আর মনে হয়নি। মনে হয়েছে সকলের যুক্তির উল্টো কথা।

জাপানে যারা রাজনীতি সচেতন বলে দাবীদার তাদের কয়েকজনের সাথে এবিষয়ে কথা বলে ঠিক এমনটাই মনে হয়েছে যে, বেবী নাজনীন শুধুই একজন কন্ঠশিল্পী। জাপানে তিনি কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে আসেননি। রাজনৈতিক ইস্যু টেনে আমি যেন কোনো কথা না বলি। শুনে ভালো লেগেছে এই জন্য যে, একটা বিষয়ে অন্তত মানুষগুলোর বোধোদয় হয়েছে। এটাকে রেফারেন্স ধরে হলেও আগামীতে কথা বলা যাবে। আর এখানেই আমার মনে হয়েছে, শিল্পীর জনপ্রিয় এক গানের কথা, " আমার ঘুম ভাঙাইয়া গেলো গো মরার কোকিলে "। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই রেফারেন্স যে কাজ হবে না, তা বুঝে গেলাম বৈশাখী মেলার দিন শিল্পীকে নিয়ে ঘটে যাওয়া হট্টগোল দেখে। আর তখনই মনে হলো গানের পরের লাইন, " আমায় পাগলও করিলো গো মরার কোকিলে "।

জাপানে এবার ২৩তম বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই মেলা জাপান প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রাণের মেলা। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভান্ডারে ২৩তম মেলা করতে প্রতিবার ছোট বড় এমন ২৩টি ঘটনার জন্ম হয়েছে। আর এসবে জন্ম হয়েছে দেশের রাজনৈতিক দলের কথিত সমর্থকদের আচরণ থেকে। তারপরেও দেশের বাইরে এতো সুন্দর একটি অনুষ্ঠান করতে তাদেরই বারবার অংশগ্রহণ কেন জরুরী? তারা কি খরচ দিয়ে মেলা চালায়? নাকী এর পিছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে? আশা করি বেবী নাজনীন ইস্যুতে বিষয়টি পরিষ্কার করার পরিবেশ তৈরী হয়েছে এবার।

দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দলের সদস্যদের মুখে যেভাবে খই ফোটার মতো বলতে শুনেছি, বেবী নাজনীন একজন কণ্ঠশিল্পী, তাকে নিয়ে বিতর্ক চলে না। এখন তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, দেশ থেকে খ্যাতিমান সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, সাংসদ আ ক ম বাহাউদ্দীন অতীতে বৈশাখী মেলায় উপস্থিত হলে তাদের বেলায় কি আচরণ করা হয়েছিল? কি হয়েছিল দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফর কালের দৃশ্য? আপনারা এতো সহজে সেসব ভুলে যান কি করে? ভুললে চলবে না কোনোটাই। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামীর জন্য রাস্তায় ফুল ছিটান। তবেই আমাদের রাজনীতির পথ সুন্দর ও প্রশস্ত হবে। হবে আমাদের মঙ্গলও। আমরা সব মানি তবে তালগাছ আমার বললে কখনও ভালো কিছু প্রত্যাশা করা যায় না।

টোকিও তথা জাপানে বাঙালী কমিউনিটি আয়োজিত সবচেয়ে বড় ইভেন্ট এই বৈশাখী মেলা ও কারি ফেস্টিভ্যাল। এই একটি আয়োজনের জন্য সারাটা বছর অপেক্ষায় থাকে জাপান প্রবাসী বাংলাদেশী সহ অনেকে। অনুষ্ঠানস্থলে প্রতিবছরই কোনো না কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। রাতের অন্ধকারে সংশ্লিষ্টরস মাপ চেয়ে সাময়িক সমাধানও করা হয় মূচলেকা দিয়ে। যে কারণে পরবর্তীতে একই ঘটনা ঘটাতে সাহস পায় তারা। এর স্থায়ী সমাধান কাম্য।

মেলাকে ধরে রাখতে এবং জাপানের মাটিতে বাঙালির সংস্কৃতিকে যথাযথ ভাবে তুলে ধরতে চাইলে আবেগ আর লোভ সংবরণ করে কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। যেমন, রাজনৈতিক পরিচয় বহনকারী কেউই মেলার কোনো দ্বায়িত্বে রাখা যাবে না। যারা একবার মেলা স্থলে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার সাথে জড়িত হয়েছে তাদের মেলায় নিষিঘোষণা বা পুলিশ অনুমোদন নিয়ে মেলা স্থলে আসার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি ভালো কিছু প্রত্যাশা করা হয় তাহলে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে, সেসকল সিদ্ধান্ত না নেওয়া হলে অদূর ভবিষ্যতে জাপানে বসবাসরত বাঙালীরা তাদের সুনাম ধরে রাখতে পারবে না।

আমার প্রত্যাাশা করছি, সবার শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবারের বৈশাখী মেলা ও কারি ফেস্টিভেলে ঘটে যাওয়া বেবী নাজনীনকে নিয়ে ঘটানো ঘটনা থেকে।

লেখক : জাপান প্রবাসী সাংবাদিক

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
 কেমন চাই গণমাধ্যমের সংস্কার
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তোড়ে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পলায়নের পরপরই দেশের সংবাদমাধ্যমের ওপর নজিরবিহীন হামলা হয়েছে। এটি ছিল সংবাদমাধ্যমের ওপর জনতার চরম ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। সংবাদমাধ্যমকে এমন টার্গেট করা ঠিক হয়েছে কিনা, সেটি ভিন্ন আলোচনা। কিন্তু সংবাদমাধ্যম কেন এমন টার্গেট হলো? স্বৈরাচারের ১৫ বছরে মিডিয়া কি কখনও গণমাধ্যম হওয়ার চেষ্টা করেছে? নাকি শুধু সংবাদমাধ্যম হিসেবেই ক্ষমতাসীনদের ফুট-ফরমায়েশ খেটেছে?  বড়দাগে বলতে গেলে দু’চারটি মিডিয়া হাউজ ব্যতীত অন্য কেউই গণমাধ্যম হওয়ার ন্যূনতম চেষ্টা করেনি। এরা বরং নিজে থেকে যেচে গিয়ে ফুট-ফরমায়েশ খেটে গৌরববোধ করেছে। এ কারণে তারা গণমানুষ থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রতিপক্ষে রূপ নেওয়ার কারণেই শেখ হাসিনার পলায়নের পর ওই ক্ষোভ গিয়ে উগড়ে পড়েছে মিডিয়া হাউজগুলোর ওপর। বিক্ষুব্ধ জনতা একের পর এক ভেঙেছে সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়। এটি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসের জন্যও একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে। একইসাথে সংবাদমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের জন্যও শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে যে, ভবিষ্যতে তারা গণমাধ্যম হিসেবে সাংবাদিকতা করবে নাকি ফুট-ফরমায়েশি করে আবারও কোনো পালাবদলে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হবে। শেখ হাসিনার পলায়নের পর অন্তবর্তী সরকার গঠন হলে দেশের বিভিন্ন খাতে সংস্কারের দাবি ওঠে। গণআন্দোলনের সময়ও এটি ছিল আন্দোলনকারীদের অন্যতম দাবি ও কমিটমেন্ট। এর পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি সংস্কার কমিশনও গঠন হয়েছে, যার মধ্যে ‘গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন’ও অন্যতম। জুলাই গণআন্দোলনে মিডিয়ার যে ভ‚মিকা ছিল তা অবশ্যই নিন্দনীয়। ধারাবাহিকভাবে আন্দোলনকারীদেরকে তৎকালীন সরকারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ‘দুর্বৃত্ত, নাশকতাকারী’ ইত্যাদি বলেছিল বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যম। শেখ হাসিনার প্রেস সচিব নাঈমুল ইসলাম খানের নির্দেশনা অনুযায়ী মিডিয়া এসব কাজ করেছিল বা করতে বাধ্য হয়েছিল। এক্ষেত্রে বাধ্য হওয়ার ঘটনা খুবই কম। গণভবন থেকে নির্দেশনা পাওয়ার সাথে সাথেই বেশিরভাগ মিডিয়া সেই অনুযায়ী ‘হুক্কাহুয়া’ বলতে শুরু করেছিল। গণভবন থেকে পাঠানো নির্দেশনা যেন ছিল মিডিয়ার প্রতি লজ্জাবতীর ছোঁয়া, স্পর্শের সাথে সাথেই তারা গুটিসুটি হয়ে চুপসে গিয়েছিল। অথচ এটি মিডিয়ার চরিত্রের সাথে যায় না। সাংবাদিকদের হওয়া উচিৎ সাহসী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী। যেমনটা কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় সেসময় (৩১ জুলাই ২০২৪) বলেছিলাম: ‘‘আমি সেই দিন হব শান্ত, যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না- বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত!’’ মিডিয়া কেন লজ্জাবতীর মতো চুপসে গিয়েছিল জুলাই গণআন্দোলন যখন তুঙ্গে, সামাল দেওয়ার পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছিল, তখন শেখ হাসিনা ইন্টারনেট বন্ধ করে গণহত্যার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। সেসময় পর্যন্তও মিডিয়া সব পক্ষের খবরাখবর পরিবেশন করছিল। ইন্টারনেট বন্ধের পর মিডিয়ার প্রতি নির্দেশনা জারি করেন শেখ হাসিনার প্রেস সচিব নাঈমুল ইসলাম খান। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বেশ কয়েকটি মুঠোফোন মেসেজে তিনি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের নিউজ প্রচার করতে নিষেধ করেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরতে বলেন তিনি। এরপর থেকেই পাল্টে যায় সংবাদমাধ্যমের চরিত্র। খবরে আরোপ হয় সেন্সরশিপ। সব টেলিভিশন যেন হয়ে যায় বিটিভি। সরকার কীভাবে সফলতার সাথে আন্দোলন দমন করছে সেটি প্রচার করাই যেন হয়ে উঠে টেলিভিশনগুলোর খবরের মূল বিষয়বস্তু। সেসময় অবশ্য গুটিকয়েক পত্রিকা ভিন্নরূপে আবির্ভূত হয়েছিল। শেখ হাসিনা সরকারের প্রেস সচিবের প্রেসক্রিপশন উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতা নিহতের খবরাখবর প্রকাশ করতে থাকে। এছাড়া মানবিক কিছু প্রতিবেদনও প্রকাশ করে তারা। এর ফলে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অবশ্য সেসব মনে রাখা হয়নি। গণমাধ্যমে কেমন সংস্কার প্রয়োজন দেশে ৯০ পরবর্তী সময়ে কর্পোরেট সংবাদধ্যম পুঁজির কাছে কুক্ষিগত হতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় গণমাধ্যম তার চরিত্র হারিয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার চেষ্টা শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় গণমাধ্যম ধীরে ধীরে সংবাদমাধ্যমে রূপ নেয়। তবে কর্পোরেট মালিকানায় গেলেও সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন সেভাবে হয়নি। বরং খারাপ সাংবাদিকতার চূড়ান্ত নজির আমরা দেখেছি। গত ৩ দশকে সাংবাদিকতা ডালপালা মেলে অনেকটা মহীরুহ হলেও নীতি-নৈতিকতার বাছ-বিচারসহ মানের দিক থেকে সবকিছুই তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। সেই গণবিচ্ছিন্নতার চূড়ান্ত রূপ আমরা দেখেছি জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময়। সেই অবস্থা থেকে উত্তরণ করে গণমাধ্যমকে প্রকৃত গণমাধ্যমে রূপান্তর করতে নিম্নোক্ত সংস্কার জরুরি। ১) নিয়োগ সংক্রান্ত সংস্কার গণমাধ্যম এমন একটা ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে যে, এখানে নিয়োগ সংক্রান্ত তেমন কোনো নীতিমালা নেই। কোনো মিডিয়া প্রতিষ্ঠানই নিয়োগ সংক্রান্ত কোনো একক নীতিমালা অনুসরণ করে না। এখানে স্বচ্ছতাও নেই। এর ফলে ন্যূনতম অভিজ্ঞতা ছাড়াই পান দোকানদার থেকে কাঠ ব্যবসায়ী, জেলে, মাদক ব্যবসায়ীসহ নানা ক্ষেত্রের দাগী অপরাধীরাও সাংবাদিকতায় ঢুকে যাচ্ছে। ফলাফল স্বরুপ ছড়িয়ে পড়ছে চাটুকারিতা ও অপসাংবাদিকতা। সাংবাদিকতাকে সঠিক পথে রাখতে হলে নিয়োগ সংক্রান্ত সংস্কার প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বার কাউন্সিলের মতো পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। অন্যদিকে অনেক মিডিয়া হাউজ রয়েছে যারা সাংবাদিকদেরকে নিয়োগপত্র দেয় না। অপেশাদার এমন আচরণ বন্ধ করে বাধ্যতামূলক নিয়োগপত্র দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া অনেক জায়গায় অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। পেশাদারিত্বের বদলে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে অবস্থান নিতে হবে। শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা: দেশে অপসাংবাদিকতায় বেশিরভাগই করে থাকেন যাদের ন্যূনতম শিক্ষাগত এবং পারিপার্শ্বিক যোগ্যতা নেই। প্রেস কাউন্সিলসহ সাংবাদিকতার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় নানা জায়গায় গিয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে কথা বলেন। অজ্ঞাত কারণে বিষয়টিকে তারা শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন। অপসাংবাদিকতা রুখতে শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টিও সংস্কার প্রক্রিয়ার অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে। চাকরির নিশ্চয়তা: পেশাদার সাংবাদিকতায় যারা রয়েছেন, তাদের বেশিরভাগেরই চাকরি নিয়ে এক অজানা আতঙ্ক থাকেন। কখন যেন আকস্মিক নোটিশে চাকরিহারা হতে হয়। সাংবাদিকদের চাকরি থেকে বের করে দেওয়া যেন ছেলের হাতের মোয়া। এমনও অনেকসময় হয় যে, রাতে কাজ করে গিয়ে সকালে শুনতে পান যে তার চাকরি নেই! এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হবে। কোন সাংবাদিককে হুটহাট নোটিশে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া যাবে না। কোনো কারণে যদি চাকরি যায়ও, সেটাও যেন আইনানুগ প্রক্রিয়ায় হয়। এতে সাংবাদিকতা অপেশাদারিত্ব থেকে রক্ষা পাবে। ২) বেতন সংক্রান্ত সংস্কার বিগত কয়েক দশকে সাংবাদিকতা পুঁজির কাছে কুক্ষিগত হলেও এর সুফল পায়নি পেশাদার সাংবাদিকরা। এখনকার বাজারেও ১০-১৫ হাজার টাকা বেতনে গ্র্যাজুয়েট কর্মী খোঁজেন মিডিয়ার কর্তারা! অনেক জায়গায় আবার সেও নেই। বেতন-ভাতা দেওয়া হবে বলে নিয়োগ দিলেও শেষ পর্যন্ত বেতন দেওয়া হয় না। দিলেও সেটি হয় অনিয়মিত। যে কারণে অনেক সংবাদকর্মী অনৈতিক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েন। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সাংবাদিকতা পেশার ওপর। এজন্য নিয়মিত বেতন দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নিয়মিত বেতন দেওয়ার সক্ষমতা না থাকলে মিডিয়া হাউজ থাকার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে হয় না। অবশ্য গ্রæপ অব কোম্পানির অন্যান্য খাতে বেতন-ভাতায় সমস্যা না হলেও মিডিয়ার ক্ষেত্রে 'দারিদ্রতার চরম রূপ' পরিলক্ষিত হয়। ওয়েজবোর্ড সংশোধন: প্রিন্ট মাধ্যমে ওয়েজবোর্ডের বিষয় থাকলেও টেলিভিশন এবং অনলাইন মাধ্যমে তারও বালাই নেই। সেজন্য কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের মনমতো অন্যায্য বেতন নির্ধারণ করেন। প্রিন্টে ওয়েজবোর্ড থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটি মানা হয় না। কিছু কিছু জায়গায় মানা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন দেখিয়ে সরকারি সুযোগ সুবিধা নেয় পত্রিকাগুলো। এছাড়া ওয়েজবোর্ড সংশোধন করে টেলিভিশন এবং অনলাইন গণমাধ্যম অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। ওয়েজবোর্ড যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা সেটি মনিটরিং করতে হবে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবও এ বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি ওয়েজবোর্ড বাতিল করে ন্যূনতম বেতনের সিস্টেম চালু করার কথা বলেছেন। সেটিও আলোচনা সাপেক্ষে বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে আইনের যথাযথ ও কঠোর বাস্তবায়ন হতে হবে। নাহলে আইন বা নিয়ম করে শেষ পর্যন্ত কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। ৩) পেশাদারিত্ব সংক্রান্ত সংস্কার জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের সময় আমরা সংবাদমাধ্যমকে লজ্জাবতীর মতো চুপসে যেতে দেখেছি। সেটাও তবু একধরনের অসহায়ত্ব বলে মানা যায়। তবে বেশকিছু সংবাদমাধ্যম আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে প্রোপাগান্ডা মেশিনে পরিণত হয়েছিল। পেশাদারিত্বের ন্যূনতম বালাই ছিল না তাদের। জনগণের প্রতিও ছিল না কমিটমেন্ট। স্বউদ্যোগে ওসব মিডিয়া সরকারের পক্ষ নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করেছে দিনের পর দিন। শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী আমলে এভাবেই পেশাদারিত্বের মুণ্ডুপাত করে গিয়েছে কথিত কিছু মিডিয়া। এই সংবাদমাধ্যমগুলো হয়ে উঠেছিল আওয়ামী লীগের গুজব সেল সিআরআই এর প্রোপাগাণ্ডা মেশিন। বিরোধী নেতাদের ব্যক্তিগত ফোনকল প্রচার, চরিত্র হনন থেকে শুরু করে নীতি-নৈতিকতার বলাৎকারসহ এমন কিছু নেই, যা কথিত সেই সংবাদমাধ্যমগুলো করেনি। এমন যাতে আর কখনও কেউ করতে না পারে, সেজন্য লাগাম টেনে ধরার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে অপেশাদার আচরণ করে এমন কাউকে সংবাদমাধ্যমে রাখা যাবে না। অন্যদিকে মালিকপক্ষও নানা সুবিধা পেতে নিউজরুমের কাছে অন্যায় আবদার করে থাকেন। অপেশাদার আচরণ করে তারা যাতে পার না পান, তার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। এজন্য সংবাদমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক এবং সাংবাদিকসহ সবার দলীয় লেজুড়বৃত্তি বন্ধ করতে হবে। এখানে যে যেই মতেরই হোক না কেন, শতভাগ পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে। এছাড়া সরকারও যাতে স্বাধীন সাংবাদিকতায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সাইবার আইনসহ সকল কালাকানুন বাতিল করা জরুরি। প্রেস কাউন্সিল শক্তিশালীকরণ: পেশাদার সাংবাদিকতা করতে গিয়ে সাংবাদিকরা নানাভাবে হয়রানি ও মামলা-হামলার শিকার হন। সেজন্য প্রেস কাউন্সিলকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। থানা বা কোর্টে নয়, সংবাদ সংক্রান্ত সব মামলা প্রেস কাউন্সিলে করতে হবে। প্রেস কাউন্সিলের অনুমতি বা অবগতি ব্যতীত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংবাদ সংক্রান্ত মামলা করতে না দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। সংবাদ প্রকাশের জন্য সাংবাদিককে কোনো ধরনের হুমকি দেওয়া বা হামলা করা হলে কঠোরভাবে প্রতিহত করার ব্যবস্থা করতে হবে। ৪) নিবন্ধন সংক্রান্ত সংস্কার দেশে সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন প্রক্রিয়া এখনও যেন সেই ব্রিটিশ আমলে পড়ে রয়েছে। কেউ যদি যথাযথভাবে সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন পাওয়ার যোগ্য হয়, সেক্ষেত্রে দ্রুততম সময়ে আবেদন নিষ্পত্তি করতে হবে। আবেদন প্রক্রিয়াও অনলাইনভিত্তিক করা জরুরি। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে এসেও মান্ধাতার আমলের মতো এ অফিস সে অফিস করে মাসের পর মাস কাটিয়ে দেওয়া যৌক্তিক বিষয় নয়। এছাড়া নিবন্ধন পেতে হয়রানি, ঘুষ দাবিসহ সব ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার ব্যবস্থা রাখতে হবে। পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে সংবাদমাধ্যমের অবমূল্যায়ন ও হয়রানি বন্ধ করে যেকোন এক জায়গায় সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন সংক্রান্ত বিশেষ সেল রাখা যেতে পারে। ভেরিফিকেশন থেকে শুরু করে নিবন্ধনসহ সবকিছু বিশেষ সেলের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা করবেন। একইসাথে কালো টাকার মালিক, অসাধু ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, মাফিয়া চক্রসহ অপেশাদার কাউকে সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন দেওয়া যাবে না। পেশাদারিত্বের বদলে সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থ কায়েমের চেষ্টা বন্ধ করতে হলে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেই হবে। স্বৈরাচারের আগে-পরে আমরা লক্ষ্য করেছি যে, কোনো রিপোর্ট সরকারের পছন্দ না হলে সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটি খুবই খারাপ দৃষ্টান্ত। টেলিভিশন-পত্রিকার জন্য বিষয়টি কিছুটা জটিল হলেও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রে খুবই সহজ। বিটিআরসি নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ না হলেও এই প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে বহু অনলাইন মিডিয়া বন্ধ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ৫৪টি অনলাইন বন্ধ করার ক্ষেত্রে কোন ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেনি। আইন না মানলে নিবন্ধন স্থগিত ব্যতীত অনলাইন সংবাদমাধ্যমসহ কোনো মিডিয়াই যেন সরকার বন্ধ করতে না পারে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এরপরও সরকার কোনো সংবাদমাধ্যম বন্ধ করলে সরকারকে অন্তত ৬ মাস ওই মিডিয়ার সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বহন করতে হবে। স্বাধীন বিচার বিভাগের মতো করেই সরকার যেন নিবন্ধন ইস্যু বা অন্য কোনভাবেই মিডিয়ার ওপর কোন ধরনের হস্তক্ষেপ অথবা খবরদারি করতে না পারে সংস্কারের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ৫) বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত সংস্কার চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর বর্তমানে প্রিন্ট পত্রিকার প্রচার সংখ্যা ও বিজ্ঞাপন হার নির্ধারণ করে থাকে। এখানে অনেক শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। যেসব পত্রিকা দৈনিক ৫০০ কপিও ছাপা হয় না, সেসব পত্রিকা লাখ লাখ কপি ছাপানোর ভুয়া তথ্য দেখিয়ে টাকার বিনিময়ে বেশি বিজ্ঞাপন রেট নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অর্থের বিনিময়ে রেট আপ-ডাউন করানো বন্ধের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। এছাড়া ৯০০ টাকা রেট দিয়ে এখনকার সময়ে কতটুকু টিকে থাকা যায় সেটিও বিবেচ্য বিষয়। এখনকার মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় রেট আরও অন্তত ৫০ শতাংশ বাড়ানো যায় কিনা সেটিও ভেবে দেখা যেতে পারে। একই কথা রেডিও, টেলিভিশন ও অনলাইন মাধ্যমের জন্যও প্রযোজ্য। সেসব মিডিয়ার জন্যও বিজ্ঞাপন নীতিমালা করা সময়ের দাবি। এছাড়া সামগ্রিক মিডিয়াকে শিল্প ঘোষণা করে এই শিল্পের বিকাশে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সরকারি বিজ্ঞাপনের বিল দ্রæততম সময়ের মধ্যে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া বিগত দিনে আমরা দেখেছি, সরকারের পছন্দমতো সংবাদ না করলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হুমকি দিয়ে বিজ্ঞাপন বন্ধ করা হয়েছে। সংবাদের কারণে কোনো গণমাধ্যমের বিজ্ঞাপন বন্ধ করাকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে। এটি প্রমাণ হলে অপরাধীদের কঠোর শাস্তি বা যে পদেই থাকুক না কেন পদচ্যুত করার বিধান থাকতে হবে। ৬) মিডিয়া সিটি তৈরি বাংলাদেশে মিডিয়া হাউজগুলো পুরো শহরজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও এটি কোনো আদর্শ পন্থা নয়। সেক্ষেত্রে মিডিয়া সিটি তৈরি করা যেতে পারে। সেখানে স্বল্পমূল্যে একই ভবনে একাধিক মিডিয়া হাউজের অফিস থাকবে। এটা উৎকৃষ্ট পদ্ধতি হতে পারে। দেশের সবগুলো সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এক এলাকায় থাকলে সব দিক থেকেই সুবিধা রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের অফিস ছাড়াও সেখানে বা পাশাপাশি কোথাও সংবাদকর্মীদের জন্য আবাসন ব্যবস্থাও তৈরি করা যেতে পারে। ৭) ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী সাংবাদিক ইউনিয়ন সংবাদকর্মীদের অধিকার রক্ষায় সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে হলেও সত্য যে, ’৯০ পরবর্তী কথিত গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর সময়ে ঐক্যবদ্ধ ইউনিয়ন দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে। সংবাদকর্মীদের অধিকার রক্ষার বদলে সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো হয়েছে দলীয় লেজুড়বৃত্তির আঁতুড়ঘর। নির্লজ্জভাবে দলীয় লেজুরবৃত্তি করাই হয়েছে তাদের একমাত্র প্রধান কাজ। সাংবাদিকতার আজকের দুর্দিনের জন্য এটিও অন্যতম কারণ। সেজন্য সাংবাদিক ইউনিয়নকে পেশাজীবী সংগঠন করতে হবে। এই সংগঠনগুলো যাতে কোনভাবেই দলীয় রাজনীতির হাতিয়ার হতে না পারে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এসব বিষয়গুলো ছাড়াও পেশাজীবী সাংবাদিক, মালিকপক্ষসহ পেশা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা করে আরও প্রয়োজনীয় বিষয় নির্ণয় করে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এর উদ্দেশ্য হলো: সাংবাদিকতা যেন সবসময় সঠিকপথে থাকে। কোন অশুভ শক্তি যেন সাংবাদিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। হোক সেটা সরকার, মালিকপক্ষ, সাংবাদিক বা যেকোন পক্ষ থেকেই। কেউ যেন সাংবাদিকতার গতিপথ রুদ্ধ করতে না পারে কিংবা গতিপথ পাল্টে দিতে না পারে। গণমানুষের জন্যই হোক পেশাদার গণমাধ্যম, এটাই সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হতে হবে। লেখক: সাংবাদিক; প্রধান সমন্বয়ক, মিডিয়া মনিটর। ইমেইল: [email protected] আরটিভি/ ডিসিএনই  
 কেমন চাই গণমাধ্যমের সংস্কার
মানুষকে মশা-মাছি ভেবে মাড়িয়ে যেতে চায় ভারত?
নানা অসম আচরণ ও বন্ধুত্বের চাদরে ঢাকা বৈষম্যের ভিত্তিতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের যে এক বিকট পরিবর্তন এসেছে তা এখন দৃশ্যমান।  তবে দেশে দেশে সংঘাত বা রাজনৈতিক দর্শন, সব কিছুই পরিচালিত হয় মানুষের মাধ্যমেই, সমাধানেও কাজ করতে হয় মানুষকে। আর ‘মানুষ’ শব্দটি এলেই উঠে আসে ভদ্রতা, সভ্যতা ও নম্রতার প্রসঙ্গ। কিন্তু ভারতের ক্ষমতাসীন দলের নেতা শুভেন্দু অধিকারী তোয়াক্কা করেন না এ সমস্ত মানবীয় গুণের, বাকযন্ত্র যেহেতু আছে তাই যা খুশি তা বলতে পারাই যেন গৌরবের তার জন্য। স্বার্থে কিঞ্চিৎ আঘাত আসলেই মানুষকেও ‘মশা-মাছি’ বলে মন্তব্য করতে দুবার ভাবেন না তিনি, শুধু যে মশা মাছি ভেবেই তিনি ক্ষান্ত হয়েছেন তা নয় বরং মারিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেছেন, সভ্যতার এই সময়ে এসে মানুষকে মশা-মাছি ভেবে মারিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা যেন কেবলই ছেলে খেলা তার কাছে। শুধু তাই নয় যেভাবে বুক ফুলিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে নিয়ে কটূক্তি করেছেন তিনি, সেটি ভালো করে লক্ষ করলে মনে হবে পৃথিবীতে ‘ভদ্রতা’ বলতে কোন শব্দ ছিলোই না কখনো। চরম অভদ্রতাই যেন চির গৌরবের। তবে ব্যাপারটি শুভেন্দুর দোষ হিসেবে দেখার আগে তার বোকামো বা অজ্ঞতা হিসেবে দেখা উচিত, কেন না বর্তমান বিশ্বে কোন কিছুই আর ঘর কেন্দ্রিক নয়, গ্লোবালাইজেশনের এই সময়ে যে কোন কিছুই আলোচিত-সমালোচিত হতে পারে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, সেই সূত্র ধরেই বলা যায় ভারতের সরকারি দলের একজন নেতার এ ধরনের মানবতা বিরোধী শিষ্টাচার বহির্ভূত বক্তব্য সহসাই সমালোচনায় ফেলতে পারে পুরো ভারতকে। ফলে অন্তত ভদ্রতার কথা ভেবে হলেও ভারতেই শিক্ষিত নাগরিক সমাজের উচিত হবে শুভেন্দু অধিকারীর অভদ্র আচরণের প্রতিবাদ করা অথবা নিন্দা প্রদর্শন। তাতে করে এই অভদ্রতার দায় দেশ হিসেবে হয়ত ভারতকে গ্রহণ নাও করতে হতে পারে, বরং তা একান্তই বর্তাবে শুভেন্দুর ওপর, এবং তার পারিবারিক শিক্ষার ওপর। মূলত ২৪ ডিসেম্বর বিকেলে জনসম্মুখে এক বক্তব্যে শুভেন্দু বলেন  ‘বাংলাদেশীরা তো মশা-মাছির মতো, আমরা চাইলে তাদের মারিয়ে যেতে পারি যে কোন সময়, শুধু তাই নয় কলকাতায় প্রতিদিন যা আবর্জনা হয়, কার্গো বিমানে নিয়ে ফেললে ঢাকা পড়ে যাবে বাংলাদেশ।’ লেখক: অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আরটিভি/এএইচ
মানুষকে মশা-মাছি ভেবে মাড়িয়ে যেতে চায় ভারত?
হকার মাইকিংয়ে অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী, মুক্তি মিলবে কি
বাংলাদেশের সবচেয়ে জনবহুল শহর রাজধানী ঢাকা। যে শহরে বসবাস করে প্রায় ২ কোটি মানুষ। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের এ শহরে কেউ করেন চাকরি, কেউ পড়ালেখা, কেউ আবার ব্যবসা। প্রকৃত অর্থে থেমে নেই কেউ। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই চলমান এ শহরকে ‘অদ্ভুত শহর’ নামেও আখ্যা দেন অনেকে। মূলত, এ শহরে বসবাসকারীদের মধ্যে তিন শ্রেণির মানুষের সংখ্যা বেশি। এর মধ্যে—উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত। যদিও প্রত্যেকেই ব্যস্ত থাকেন আপন কর্মে। জীবিকার তাগিদে সকাল থেকে রাত অব্দি ছুঁটে চলেন এ মানুষগুলো। প্রত্যেকেরই রয়েছে ভিন্ন রকমের কর্ম। আজ কথা বলতে চাই ‘ইদুর মারেন’, ‘তেলাপোকা মারেন’, ‘মাজায় ব্যথা, হাঁটুতে ব্যথা’ প্রভৃতি পেশা নিয়ে।   সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আপনি যেখানেই থাকেন না কেন, কোনো-না কোনো সময় মনের অজান্তে হলেও এ শব্দগুলো আপনার কানে আসবেই। সেটি আপনি অফিসে বসেই হোক আর বাসায় শুয়ে থেকে হোক, শুনবেনই। শোনতে আপনি বাধ্য। কোনো রেহাই নেই আমাদের। তীব্র যানজটের এ শহরে বাসে বসে থাকেন বা পার্কে হাঁটেন কথা একটাই—‘ইদুর মারেন, তেলাপোকা মারেন’, ‘মাজায় ব্যথা, হাঁটুতে ব্যথা’ ইত্যাদি। এ যেন আমাদের পিছু ছাড়ছে না। কিছুতেই না! আচ্ছা একটু মনে করে দেখুন তো, আপনি কারও সাথে একান্ত নীরবে মোবাইলে কথা বলছেন, আপনি সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ করছেন বা কোনো কন্টেন্ট তৈরি করছেন। এমন সময় আপনার প্রয়োজন হবে একটা নিরিবিলি পরিবেশ। কিন্তু আপনার কাজ শুরু করার পরই হঠাৎ বাতাসে একটি শব্দ ভেসে আসলো- ‘ইঁদুর মারেন, তেলাপোকা মারেন’ বা ‘কাগো...জ, পেয়া...জ, ছা...ই’ ইত্যাদি। ঠিক সে সময় আপনার অনুভূতিটা কেমন হবে? রাজধানী ঢাকা, যেখানে- পরিবেশ দূষণ, বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণসহ এমন কোনো দূষণ নেই যা আপনি পাবেন না! মূলত, প্রয়োজনের তাগিদে শত দূষণ সহ্য করেও ঠিকে থাকতে হচ্ছে আমাদের। ফেরার পথ বন্ধ অনেকের। তাই ইচ্ছে না থাকা সত্যেও ইটপাথরের এ শহরে নিজেকে মানিয়ে নিতে হচ্ছে। আজ যাদের নিয়ে কথা বলছি- তারা মূলত, নিম্নভিত্ত বা নিম্ন আয়ের মানুষ। সহজ ভাষায় যাদের ‘হকার’ বলা হয়। যদিও হকারদের মাঝে রয়েছে বিভিন্ন শেণিবিন্যাস। রাজধানীর ফুটপাতে যারা ব্যবসা করেন তাদেরকেও হকার বলা হয়। এ ছাড়াও বিভিন্ন রকমের হকার রয়েছে। কিছুদিন পূর্বে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান বলেছিলেন, রাজধানীতে সকল প্রকার যানবাহনের হর্ন বাজানো বন্ধ করবেন। মূলত, শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্যই এ উদ্যোগের কথা জানিয়েছিলেন তিনি। যদিও তার সে উদ্যোগ বাস্তবায়নের কোনো পদক্ষেপ পরবর্তীতে আর চোখে পড়েনি। রাজধানীতে শব্দ দূষণের যে কয়েকটি বিশেষ কারণ রয়েছে, তার মধ্যে ‘হকার মাইকিং’ অন্যতম। শহরের বিভিন্ন স্থানে, অলিতে-গলিতে হ্যান্ডমাইক বা ভ্যানে স্থাপিত মাইকে পণ্যের প্রচারাণা চালিয়ে ব্যপক শব্দ দূষণ করা হচ্ছে। যদিও এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে দেখা যায় না পরিবেশবিদদের। তবে, অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে ‘হকার মাইকিং’ খুবই বিরক্তিকর। দেশের দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে সরকারের যারা দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের উচিত হবে রাজধানীর কোটি কোটি মানুষের বিরক্তি ও সুস্থতার কথা বিবেচনায় ‘হকার মাইকিং’ বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ কর। তবে, অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে- কোনো অবস্থাতেই যেন হকারদের ব্যবসা বন্ধ বা তাদের আয়-রুজিতে কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয়। লেখক: সাংবাদিক আরটিভি/ ডিসিএনই
হকার মাইকিংয়ে অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী, মুক্তি মিলবে কি
একাত্তরের ডিসেম্বর ও বড়দিনের স্মৃতি 
ডিসেম্বর মাস এলেই মাথায় ভর করে বছরের শেষ সময়ের যত হিসাব। সারা বছরে করা ভালো কাজ গুলো পাশে রেখে ভুল গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষন করি। নিজেই নিজেকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় কিয়ে নিজেই বিচারকের ভূমিকা পালন করি। কারণ খুঁজি বিগত দিনে কেন ভুল হয়েছে। সেসাথে আগামীতে ভুল না যেন হয় সে বিষয় পরিকল্পনা করি। কাজ গুলো যখন করি তখনই মনে পড়ে একাত্তরের স্মৃতি কথা। বিশেষভাবে ডিসেম্বর মাস ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। ডিসেম্বর মাস আমরা ছিলাম বাড়ি ছাড়া। যুদ্ধ ভয়াবহতার কারণে জীবন বাচাতে রিফিউজি হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছি। যুদ্ধ তখন তুঙ্গে। রেডিওতে প্রতি সন্ধ্যায় বড়দের সাথে আশ্রয় নেয়া বাড়ির আঙ্গিনায় পাটি বিছিয়ে সেখানে বসে রেডিওতে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুনি। নিজের চোখেও কয়েকবার বোম্বিং এর দৃশ্য দেখেছি। যেকারণে আতংকে দিন কাটে। শুধু তাই নয়, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে সারাদিন বড়দের ভাবতে দেখি। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির পূর্ব দিকের ঢালুতে বসে রোদ পোহাচ্ছিলাম। এমন সময় মাথার উপর দিয়ে কালছা সবুজ রঙের একটা হেলিকপ্টার উড়ে যায়। দৌড়ে বাড়ি এসে বললাম হেলিকপ্টার উড়ে যাবার কথা। ভেবেছিলাম এটা পাকিস্তানের কোনো হেলিকপ্টার হবে হয়তো, তাই। বাড়ি এসে বললে পর বড়রা বললেন, এটা ভারতের হেলিকপ্টার। সামনে হয়তো ভালো কোনো সংবাদ অপেক্ষা করছে। তাদের কথায় সেদিন আমরা উল্লসিত হয়েছিলাম। এর কিছুদিন পর বাড়ির এক জ্যাঠাতো ভাই সিপ্রিয়ান তার এক সঙ্গীকে নিয়ে আমরা কেমন আছি জানার জন্য আমাদের খোঁজ নিতে আশ্রিত বাড়িতে দেখা করতে এলেন। ষনেক রাত পর্যন্ত বাড়ির বাইরে বিলের ধারে বসে ভাই সিপ্রিয়ানের সাথে গল্প করেছি। বিভিন্ন এলাকায় তাদের যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা বলেন। তারাই প্রথম জানায়, কয়েকদিনের মধ্যেই দেশ স্বাধীন হবার কথা। আমরা যে আবার নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে পারবো, সে নিশ্চয়তা দিয়ে বলেন, বেশীদিন আর এখানে এভাবে কষ্ট করতে হবে না। বড়দিন যে বাড়িতে করা হবে সেই কথাও বলে বিদায় নেন। দেশের ভিতর পাকিস্তানি সেনাদের সাথে বাঙালি রাজাকারেরা মিলে যখন তান্ডব শুরু করে অর্থাৎ যুদ্ধ পুরো দৃশ্যমান তখন আমরা বাধ্য হয়ে জীবন রক্ষার্থে বাড়ী ছেড়ে উত্তর দিকে কৌচান এলাকায় আশ্রয় নেই। সেখেনে আমাদের দিনগুলো কষ্টের মধ্যেও যেমন ছিল আনন্দের তেমনই ভয়ের। সারাক্ষণ আমাদের অদৃশ্য এক ভয়ে দিন কেটেছে। পুরো ডিসেম্বর মাসের প্রতিটি দিনের কথা আমার এখনও মনে আছে। আমার স্মৃতি যদি বিট্রে না করে থাকে তাহলে বলতে পারি, ডিসেম্বর মাসের ১৫ তারিখ রাতে রেডিওর সংবাদ শুনে আনন্দে বাড়ির সকলকে লাফাতে দেখেছিরেডিওতে পাকিস্তানি সৈনিকদের পরাজয়ের কথা বলা হয়। বলা হয় আত্মসমর্পণ করার কথা। একথা শোনার পর সবার মাঝে যে প্রতিক্রিয়া দেখেছি এখনে যেন আমার চোখে তা স্পষ্ট। সেদিন আমাদের ঘুম যেন আসছিল না। তবুও ঘুমিয়েছি। পরেরদিন খুব সকালে সবার ঘুম ভেঙ্গে গেলে বাড়ি ফেরার আনন্দসবাই নিজেদের কাপড় লতা গোছাতে শুরু করে। কেউ কেউ আটা রুটি চা বানিয়ে খেতে দেয়। আনন্দ উত্তেজনা তখন এতোটাই ছিলো যে কেউ আর খেতে পারছিল না। তারপরেও না খেলে সমস্যা হবে মনে করে খেয়ে নেয়। এরপর সকাল দশটার দিকে বাড়ির কর্তা হিসাবে বাবা বিলের ধারে দাঁড়িয়ে আশেপাশে অন্য বাড়িতে থাকা বাড়ির অন্য পরিবারের লোকদের ডাকাডাকি করে জড়ো করলেন।সবাই জড়ো হলে একসাথে রওনা হয় বাড়ির উদ্দেশ্যে। সবার মাথায় নিজেদের কাপড় লতা, হাড়ি পাতিল, কাথা কম্বল বাধা বোঝা। বাড়ি পৌঁছতে দুপুর গড়িয়ে যায়কাছাকাছি যাবার পর দূর থেকে ভিটা বাড়ি দেখা গেলেও ভিটা ছিল ঘর শূন্য। সব পুড়ে ছাই। বাড়ির ভিটায় পা রেখে বাবা মা খুব কান্না কাটি করলেন। কিছুসময় পর পোড়া ঘরের ছাই সরিয়ে ধর্মীয় মূর্তি, কাপ পিরিচ পেয়ে সেসব আলাদা করে রাখা হয়। আমি আর ছোট বোন খেলার সামগ্রী খুঁজছিলাম। ছাইয়ের আড়ালে থাকা ভাঙা কসচের টুকরা দিয়ে পা কেটে যেতে পারে মনে করে বাবা আমাদের বিরত করলেন। সেদিন ঘরের পোড়া টিন কোনোভাবে একটার সাথে আরেকটা আড়াআড়ি দাঁড় করিয়ে সেখানেই রাত কাটাই। পরের দিন বাঁশ বাগান থেকে বাঁশ কেটে এনে পোড়া টিন দিয়ে ছাপড়া ঘড় বানানো হয়। তার নিচে ঢালাও বিছানা করে রাত যাপন করতে শুরু করি। বিছানা করা হয় খের (ধান গাছ) দিয়ে। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরর আগের দিন গুলো ছিলো এক রকম ভয় আর আতঙ্কের। পরবর্তী দিন গুলো ছিল আনন্দ আর সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্য় নিয়ে। বয়সের কারণে সব মনে না থাকলেও যেটুকুই মনে আছে সবটাই এখনও স্পষ্ট। কিছু দিন পরেই ২৫ শে ডিসেম্বর বড়দিন। ভালো কাপড় লতা বলতে কিছু নেই। যা কিছু ছিল সবটাই মানুষের দেয়া। তখনও কোনো রিলিফ পাইনি। কষ্টে আমাদের দিন কাটে। মা তার বাবার বাড়ি বোনের বাড়ি থেকে চেয়ে চেয়ে শীতের কাপড়, কাথা কম্বল, বালিশ নিয়ে আসে। সেসময় মাকে মামার বাড়ি, মাসির বাড়ি গিয়ে মুখ ছোট করে অসহায়ের মতো সাহায্য চাওয়ার দৃশ্য এখনও ভুলতে পারি না। এ যে ভোলার নয়। মামা মাসির ছেলে মেয়েদের মধ্যে কয়েকজন আমার বয়সীও আছে। তাদের কাপড়ও নিয়ে ব্যবহার করেছি। তাদের কাছ থেকে কাপড়, বালিশ আর খেলার পুতুল পেয়ে কি যে খুশি হয়েছিলাম তা মনে করলে এখনও ভিতর লাফায়। বালিশ আর পুতুল নিয়ে ছোট বোনের সাথে ঝগড়াও হতো মাঝে মধ্যে। দেখতে দেখতে বড়দিন চলে এলো। মামার বাড়ি থেকে আনা আমার জন্য শার্ট প্যান্ট ধুয়ে শোকানো হলো। সেগুলো খুব যত্ন করে ভাজ করে বালিশের নীচে রেখে দিলাম আয়রনের মতো ভাজ হবার জন্য। বড়দিনের দিন সকালে সেই শার্ট প্যান্ট পড়ে গির্জায় যাই বড়দিনের মিশায় অংশ নিতে। তখন বড়দিনের অর্থ বা তাৎপর্য বুঝি না। তবে ঘটনা সবই এখনও মনে আছে। লেখক : জাপান প্রবাসী সাংবাদিক   আরটিভি/ ডিসিএনই
একাত্তরের ডিসেম্বর ও বড়দিনের স্মৃতি 
ভারতীয় গণমাধ্যমের ‘আকাশ-কুসুম’ অপপ্রচার
ঘোড়া উড়ে গেছে আকাশে, কুকুর ও ছাগল মানুষের মতই কথা বলছে কিংবা দৈত্য গিলে নিয়েছে আস্ত মানুষ - উক্তিগুলি যে রূপকথার গল্পের অংশ  তা শনাক্ত করতে হয়ত খুব বেশি সময় লাগবে না আপনাদের। তবে সেই একই রকম কথা যদি ভারতীয় মূলধারার গণমাধ্যমগুলো বলে তবে কি অবাক হবেন খুব বেশি?  না, অবাক হওয়ার কিছু নেই। ভারতের সাংবাদিকতা বিশ্বব্যাপি আগে থেকেই যথেষ্ট সমালোচিত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা কারণে হাস্যরসের খোরাক। কখনো দেখা গেছে সাংবাদিক কথা বলছেন রাজনৈতিক দলে কর্মী হয়ে, কখনো বা সংবাদ উপস্থাপনকে বানিয়ে ফেলেছেন টিভিসি বা সিরিয়াল নাটকের অংশ, কখনো আবার উপস্থাপক নিজেই  হয়ে যাচ্ছেন আলোচক, আবার আবেগে ঢলে পড়ছেন এদিক ওদিক। এ ধরণের কোন ধরণের আচরণই আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতায় গ্রহণযোগ্য নয়, কিন্তু ভারত এদিক থেকে অনড়। আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার ধার ধারে না দেশটির গণমাধ্যমগুলো, যত যাই হউক তারা রূপকথার গল্পের ভিত্তিতেই করে যাবেন নিউজ রিপোর্ট। ইদানিং ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে যেসব সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে তা সত্যিই অনবদ্য। প্রফেশনাল ফেরি টেলস রাইটার ছাড়া   এ ধরনের গল্প লেখা সত্যিই অসম্ভব প্রায়। হয়ত মানের দিক থেকে তারা গুছিঁয়ে আনতে পারছেন না পুরো গল্প বা রিপোর্টটি, তবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন আপ্রাণ।  কিন্তু লক্ষ্যে অনেকটাই সফল দেশটির পোর্টালগুলো। ইতোমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় সংবাদের নামে রূপকথার গল্প প্রচার করে পাচ্ছেন হাজার হাজার ‘হা হা রিয়্যাক্ট’। অর্থাৎ মূলধারার গণমাধ্যম হলেও তারা যে মানুষ হাসাতে কোন অংশেই পিছিয়ে নেই তা বেশ পরিষ্কার। এসব সংবাদ পরিবেশনের ভিত্তিতে অনেক গবেষক বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে- ভারত, বিদ্বেষ বা ঘৃণা থেকে নয় বরং ভয় থেকেই করছে এ ধরনের প্রতিবেদন। কারণ দেশটির সাথে নানা কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পর্ক ভালো নয়। তার উপর আওয়ামী সরকার পতনের পর থেকে বাংলাদেশও খুব বেশি পরোয়া করছে না তাদের। যেটি ভারতের জন্য একটি ভীতির কারণ। তবে ভীতি থাকলেও নানা কারণে তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সরাসরি কিছু করবে না। ফলে গণমাধ্যমগুলো এ ধরনের প্রচারণার মধ্য দিয়েই বহি:প্রকাশ করছে তাদের ভয়ের। যদিও ভারতীয় সাংবাদিকতা দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতীয় সাংবাদিকতার প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়ছে। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে, যা প্রমাণ ও উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। সাংবাদিকদের স্বাধীনতা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। তবে, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের (RSF) ২০২৩ সালের প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারত ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৬১তম স্থানে রয়েছে। এই অবনমন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সাংবাদিকদের হুমকি, গ্রেপ্তার এবং আইনগত চাপের ঘটনা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যা স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে তারা পক্ষপাতভিত্তিক সাংবাদিকতার বাইরে চাইলেও যেতে পারে না। বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, ভারতীয় সাংবাদিকতা ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। বিবিসি এবং আলজাজিরার মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর রিপোর্টে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে দেখানো হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন সরকারের কার্যক্রম এবং বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন নিয়ে ভারতে সাংবাদিকতার ভূমিকা যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সামাজিক মাধ্যম এবং ইন্টারনেটের যুগে ভুয়া খবরের ব্যাপক প্রসার ঘটছে। ভারতীয় মিডিয়া হাউসগুলোকে মাঝে মাঝে এই ভুয়া খবরের উৎস বা প্রচারক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের সাংবাদিকতার প্রতি আস্থার অভাব তৈরি করেছে। ভারতের কিছু মিডিয়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং বিতর্কিত বিষয়গুলোতে পক্ষপাতমূলক কভারেজ করে থাকে বলে অভিযোগ ওঠে। এটি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নজরে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০১৯ সালে কাশ্মীর ইস্যুতে মিডিয়ার ভূমিকা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দারুণভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। এমনকি ২০২৪ এর শেষভাগে এসে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই আচরণ প্রদর্শন করেছে তারা। লেখক: অনলাইন এক্টিভিস্ট আরটিভি/ডিসিএনই  
ভারতীয় গণমাধ্যমের ‘আকাশ-কুসুম’ অপপ্রচার
আরও পড়ুন
দেড় দশক পর বিজয়ের উৎসবে একসঙ্গে তারা চারজন
কাজ করতে না পারায় আয়ের সুযোগ ছিল না: বেবী নাজনীন
নির্বাচনে অংশ গ্রহণ নিয়ে মুখ খুললেন বেবী নাজনীন
আট বছর পর দেশে ফিরে যা বললেন বেবী নাজনীন