ঢাকা মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

গভীর রাতে মন্দির থেকে প্রতিমার স্বর্ণালংকার উধাও

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬, ০৩:২৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

সাতক্ষীরার প্রায় ২৩০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় মন্দির কমপ্লেক্সে চুরির ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়ভাবে ‘মায়ের বাড়ি’ নামে পরিচিত এই মন্দিরটি জেলার প্রাচীন ধর্মীয় ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। মঙ্গলবার (১০ মার্চ) গভীর রাতে শহরের পুরাতন সাতক্ষীরা এলাকায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় মন্দিরে এ চুরির ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, রাতের কোনো এক সময় দুর্বৃত্তরা মন্দির কমপ্লেক্সের একাধিক কক্ষের তালা কেটে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে প্রতিমার স্বর্ণালংকার, রুপা এবং দানবাক্সের নগদ অর্থ নিয়ে যায়। মন্দির কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ১৮ লাখ টাকার সম্পদ চুরি হয়েছে।

সাতক্ষীরা জেলা মন্দির সমিতির সাধারণ সম্পাদক নিত্যানন্দ আমিন জানান, চোরেরা মন্দির কমপ্লেক্সের কালীমন্দির, অন্নপূর্ণা মন্দির, রাধাগোবিন্দ মন্দির ও জগন্নাথ মন্দিরের তালা কেটে ভেতরে ঢোকে। এরপর প্রতিমার বিভিন্ন স্বর্ণালংকার ও দানবাক্সের অর্থ চুরি করে নিয়ে যায়।

চুরি হওয়া সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে চার ভরি ওজনের দুই জোড়া স্বর্ণের বালা, এক ভরি ওজনের দুই জোড়া শাঁখা, চার আনা ওজনের এক জোড়া কানের দুল, আট আনা ওজনের একটি ‘মায়ের জিভ’, আট আনা ওজনের একটি চেইন, দশ আনা ওজনের একটি নথ, চার আনা ওজনের দুই জোড়া পেটি, প্রায় পাঁচ ভরি রুপা, দানবাক্সের নগদ সাত হাজার টাকা এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী।

মন্দির সমিতির কার্যনির্বাহী সদস্য ও শিক্ষক দীপাসিন্ধু তরফদার বলেন, দুই দিন আগে শহরের কাটিয়া মন্দিরেও চুরির ঘটনা ঘটেছে। বারবার মন্দিরে চুরির ঘটনায় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। আমরা দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তার এবং মন্দিরের নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানাই।

মন্দিরের কর্মকর্তা অসীম দাশ সোনা জানান, মন্দিরের সিসিটিভি ফুটেজে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি প্রশাসনের কাছে দ্রুত চোরদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

সাতক্ষীরা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. শাহীনুর চৌধুরী বলেন, আমরা খবর পেয়েছি এবং ঘটনাস্থলে আমাদের টিম কাজ করছে। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।


আরটিভি/এসকে

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
ঝিনাইদহে প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বড় বায়সা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পুকুর ইজারায় নিয়ম না মানা, আয়-ব্যয়ের হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করে তছরুপ, মুভমেন্ট রেজিস্টার না থাকা, অনলাইন ও শ্রেণিভিত্তিক রেজিস্টার খাতায় শিক্ষার্থীর সংখ্যার অমিল, একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীকে একই কক্ষে পাঠদান, নিয়মিত পাঠদান ও শ্রেণি পর্যবেক্ষণ না করা, স্লিপের অর্থ ভুয়া বিল-ভাউচারে উত্তোলন এবং ভারতীয় সনদ ব্যবহার করে চাকরিতে যোগদানের অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদের বিরুদ্ধে। বিদ্যালয়টিতে প্রকৃত শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোট ৪৪ জন হলেও মাসিক রিটার্নে দেখানো হয়েছে ৫৯ জন। মূলত কাগজে-কলমে ভুয়া ১৫ জন শিক্ষার্থী দেখানো হলেও বাস্তবে বিদ্যালয়ে তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। অর্থাৎ প্রায় ৯ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন করে মোট পাঁচজন শিক্ষক রয়েছেন বিদ্যালয়টিতে। জানা গেছে, বিদ্যালয়টির প্রাক্-প্রাথমিক শ্রেণিতে আটজন থাকলেও রিটার্নে দেখানো হয়েছে ১৪ জন। প্রথম শ্রেণিতে রিটার্নে ও বাস্তবে ১৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাঁচজন থাকলেও রিটার্নে সাতজন দেখানো হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণিতে রিটার্নে ১০ জন দেখানো হলেও বাস্তবে আছে আটজন। চতুর্থ শ্রেণিতে রিটার্নে নয়জন দেখানো হলেও আছে সাতজন। সর্বশেষ পঞ্চম শ্রেণিতে রিটার্নে উল্লেখ আছে ছয়জন, কিন্তু বাস্তবে মাত্র তিনজন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রাক্-প্রাথমিক শ্রেণির ইয়ামিন এবং প্রথম শ্রেণির ইয়াসিন ও রমজান নামের দুই শিক্ষার্থী এ বিদ্যালয় থেকে মাদ্রাসায় গিয়ে ভর্তি হলেও সরকারি বিদ্যালয়ের উপবৃত্তির তালিকা থেকে তাদের নাম এখনো বাদ দেওয়া হয়নি। সরকারি বিধি উপেক্ষা করে শিক্ষার্থী কম থাকলেও বেশি দেখিয়ে এবং নানা অনিয়মের মাধ্যমে বিদ্যালয়টি প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদ পরিচালনা করে আসলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যালয়টিতে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পিয়ার মোহাম্মদ ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯০ সালে যোগদান করেন। চাকরিতে যোগদানের সময় তিনি পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাশের সনদ ব্যবহার করেছেন বলে জানা গেছে। পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৯৮৮ সালে আলিম এবং ১৯৯০ সালে ফাজিল পরীক্ষার সনদের কপি জমা দিয়েছিলেন তিনি। বাংলাদেশের সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে তার ব্যবহৃত ভারতীয় সনদের সত্যতা এবং তা যথাযথ নিয়ম অনুসারে ও বৈধভাবে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো বিদেশি ডিগ্রিধারী চাকরিপ্রার্থী যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ (ইউজিসি বা শিক্ষা বোর্ড) থেকে সমতা সনদ বা ‘ইকুইভ্যালেন্সি সার্টিফিকেট’ জমা দিতে পারেন, তবে তিনি সরকারি চাকরির জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। এ ক্ষেত্রে পিয়ার মোহাম্মদ সমতা সনদ জমা দিয়েছেন কি না, তাও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ২০২৪ সালের পুকুর ইজারা বাবদ পাওয়া অর্থের যথাযথ হিসাব না থাকা এবং একইভাবে ২০২৬ সালে পুকুর ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রেও যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করে পছন্দের ব্যক্তিকে ইজারা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ইজারা দেওয়ার পর বিষয়টি বৈধতা দেওয়ার জন্য পরবর্তী সময়ে ব্যাকডেটে রেজুলেশন তৈরি করে অর্থ ব্যাংকে জমা রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট রেজুলেশন, ব্যাংক হিসাব, ইজারা-সংক্রান্ত কাগজপত্র ও অর্থ জমার সময় যাচাই করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। বিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্লিপের টাকা খরচ দেখিয়ে বিভিন্ন ভুয়া বিল-ভাউচারে প্রধান শিক্ষক নিজের হাতে লিখে টাকা উত্তোলন করেছেন বলে অভিযোগ। ওইসব বিল-ভাউচার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কালীগঞ্জে অবস্থিত তুষার ইলেকট্রিক থেকে পেপার ও প্রিন্টার মেশিনের টোনার কেনা হয়েছে। অথচ ওই দোকানে এ ধরনের মালামাল বিক্রি হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি বিদ্যালয়ে এক ছাত্রীকে জড়িয়ে সহকারী শিক্ষক শাহ আলমকে কর্মরত অবস্থায় মারধরের ঘটনায় তিনি সাময়িক বরখাস্ত হন এবং ওই পরিবারের একজন তাঁর নামে থানায় মামলা করেন। উক্ত ঘটনায় শাহ আলম নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং জামিনে মুক্ত হয়ে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আদালতে দ্রুত সিআর ৫২/২০২৬ নম্বর মামলা দায়ের করেন। ঝিনাইদহের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলাটি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে তদন্ত করে ১৪ ডিসেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। বিদ্যালয়ের নানা অনিয়ম এবং চাকরিতে যোগদানের সময় ভারতীয় সনদ ব্যবহারের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, বিদ্যালয় টিকিয়ে রাখতে অল্প কয়েকজন শিক্ষার্থী বেশি দেখানো হয়েছে। স্লিপের টাকা নিয়ম মেনে খরচ করা হয়েছে। পুকুর ইজারা দেওয়া এবং সেখান থেকে আয় হওয়া অর্থ ব্যয়ে কোনো অনিয়ম করা হয়নি। বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে আমার শিক্ষাগত যোগ্যতার ভারতীয় সনদ যথাযথ নিয়ম মেনেই ব্যবহার করা হয়েছে। ইতিপূর্বে তা কর্তৃপক্ষ একাধিকবার যাচাই-বাছাই করলেও কোনো ত্রুটি পায়নি। সহকারী শিক্ষক শাহ আলম ও একজন শিক্ষার্থীকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রেক্ষিতেই শাহ আলম কোর্টে মামলা করেছেন, যে বিষয়টি ইতিমধ্যে আমি জেনেছি। আশা করছি, কয়েক দিনের মধ্যে ওই বিষয়েও সুষ্ঠু মীমাংসা হয়ে যাবে। কালীগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রোকনুজ্জামানের কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বড় বায়সা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়ে যেসব অভিযোগের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হবে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা, রিটার্ন, পুকুর ইজারা, আয়-ব্যয়ের হিসাব, স্লিপের অর্থ ব্যয় এবং অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয় সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে দেখা হবে। কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তদন্তের বিষয়টিও যথাযথভাবে সম্পন্ন করা হবে। ঝিনাইদহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী-সংক্রান্ত তথ্য, আর্থিক লেনদেন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে নিয়ম মেনে চলা বাধ্যতামূলক। বড় বায়সা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলো যাচাই করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া প্রধান শিক্ষকের শিক্ষাগত সনদ ও চাকরিতে যোগদানের সময় ব্যবহৃত কাগজপত্র নিয়েও যদি কোনো প্রশ্ন থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে প্রকৃত বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। আরটিভি/টিআর
ঝিনাইদহে প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় হত্যা মামলার প্রধান আসামি ধরা
সাতক্ষীরার চাঞ্চল্যকর কলেজ ছাত্র জাকারিয়া খাঁন হত্যা মামলার প্রধান আসামি সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও কিশোর গ্যাং লিডার নাহিদ হাসানকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় তার অপর এক সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় হত্যা মামলার প্রধান আসামি ধরা
লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে রোপা আমনের আবাদ, কৃষকের মুখে হাসি
অনুকূল আবহাওয়া ও খাল পুনঃখনন কর্মসূচির ফলে খুলনা অঞ্চলের চার জেলায় চলতি মৌসুমে রোপা আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে। নিচু এলাকার জলাবদ্ধতা দূর হওয়া এবং সুষম বৃষ্টিপাতের কারণে কৃষকরা এবার অধিক পরিমাণে রোপা আমনের চাষ করেছেন বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে রোপা আমনের আবাদ, কৃষকের মুখে হাসি
জোয়ারের সঙ্গে শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই করে টিকে থাকে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীরা
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীকে দিনে দুবার নিয়ম করে ধেয়ে আসা জোয়ারের নোনা পানির সঙ্গে লড়াই করেই টিকে থাকতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং একের পর এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের কারণে এই প্রাণীদের, বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্ব এখন চরম সংকটে। জোয়ারের পানির অস্বাভাবিক উচ্চতা এবং বনের স্থলভাগ ক্রমে সংকুচিত হতে থাকায় বনের জীববৈচিত্র্যকে প্রতিদিন বেঁচে থাকার এক অসম সংগ্রামে নামতে হচ্ছে। স্রোতের প্রথম ধাক্কা জোয়ারের পানি যখন তীব্র বেগে বনের ভেতরের সরু খাল ও খাঁড়ি দিয়ে ঢুকতে শুরু করে, তখন বনের শান্ত পরিবেশ নিমেষেই অশান্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের ভাষায় ‘প্রথম পালি’র ধাক্কায় সবচেয়ে বিপদে পড়ে চিত্রা হরিণের সদ্যজাত ছানা ও বন্যশূকরের দল। বড় প্রাণীদের মতো সাঁতরে নিজেদের ধরে রাখার সামর্থ্য তাদের নেই। তীব্র স্রোত তাদের ভাসিয়ে নেয় মূল নদীতে, যেখানে ওত পেতে থাকে ক্ষুধার্ত নোনা পানির কুমির। দিনের চেয়ে অমাবস্যা-পূর্ণিমার রাতে জোয়ারের রূপ আরও মারাত্মক। বনের বানর, তক্ষক বা বুনো পাখি যখন অন্ধকারে গাছের ডালে ঘুমিয়ে থাকে, তখন হুড়মুড় করে পানি চলে আসে। রাতের অন্ধকারে পানির গভীরতা ও স্রোতের তীব্রতা আন্দাজ করতে না পেরে অনেক সময় বন্যপ্রাণী ও পাখির বাসা পানির নিচে চলে যায়। রাতে উঁচু স্থানে আশ্রয় নেওয়ার লড়াই তাই দিনের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক। বাঘের জলযুদ্ধ ও হরিণের জীবনবাজি জোয়ারের সময় সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার দক্ষ সাঁতারু হয়ে ওঠে। জোয়ারের স্রোতের বিপরীতে মাইলের পর মাইল সাঁতরে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যাতায়াত সুন্দরবনের বাঘের নিত্যদিনের রুটিন। গবেষকেরা বনের গাছে গাছে ক্যামেরা ট্র্যাপসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখেছেন, জোয়ারের সময় বাঘ কীভাবে স্রোতের বিপরীতে সাঁতরায় এবং হরিণ কীভাবে দলবদ্ধভাবে উঁচু স্থানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। পানি বাড়তে শুরু করলেই চিত্রা হরিণ ও বন্যশূকরের দল বনের তুলনামূলক উঁচু জায়গা বা কৃত্রিম মাটির ঢিবির দিকে ছুটতে থাকে। এসব ঢিবি ‘কেল্লা’ নামে পরিচিত। সাধারণ জোয়ারে প্রাণীদের তেমন সমস্যা না হলেও অমাবস্যা-পূর্ণিমার ‘জো’ কিংবা বঙ্গোপসাগরের লঘুচাপের কারণে যখন স্বাভাবিকের চেয়ে তিন থেকে পাঁচ ফুট উঁচুতে পানি আছড়ে পড়ে, তখন পুরো সুন্দরবন ডুবে যায়। তখন হরিণ, বন্যশূকর ও বাঘের প্রধান ভরসা এই কেল্লা। পানি বাড়লে শত শত হরিণ ও বন্যপ্রাণী কেল্লায় গাদাগাদি করে আশ্রয় নেয়। তবে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি প্রাণী চলে আসায় এবং খাবারের অভাবে সেখানেও শুরু হয় বেঁচে থাকার নীরব লড়াই। টেরিটরি দখলের যুদ্ধ ও শত্রুর সঙ্গে সহাবস্থান সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের নিজেদের মধ্যে টিকে থাকার লড়াইও নির্মম। প্রতিটি বাঘ প্রস্রাব ও গাছের ছাল আঁচড়ে নিজের একটি নির্দিষ্ট টেরিটরি বা এলাকা চিহ্নিত করে রাখে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাঘের এই এলাকা সংকুচিত হয়ে পড়ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে এক বাঘের এলাকায় অন্য বাঘ ঢুকে পড়ায় প্রায়ই রক্তক্ষয়ী লড়াই হয়। এই ভ্রাতৃঘাতী লড়াইয়ে অনেক সময় প্রবীণ বা দুর্বল বাঘ মারা যায় অথবা এলাকাছাড়া হয়ে লোকালয়ের কাছে চলে আসে। এদিকে জোয়ারের পানি যখন বনের মাটি ছাড়িয়ে গাছের কাণ্ড ছুঁয়ে ফেলে, তখন মাটির গর্তে থাকা বিষধর সাপ, যেমন কিং কোবরা, বাঁচার জন্য গাছের মগডালে আশ্রয় নেয়। একই গাছে হয়তো আশ্রয় নিয়েছে কোনো বানর বা পাখি। জীবনের এমন চরম সংকটে শিকার ও শিকারিকে একই গাছের ডালে পাশাপাশি বসে পানি নেমে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়। জোয়ারের পর মিঠা পানির হাহাকার জোয়ারের পানি নেমে যাওয়ার পর বন্যপ্রাণীর সবচেয়ে বড় লড়াই শুরু হয় মিঠা পানির খোঁজে। সুন্দরবনের নদী-খালের পানি প্রচণ্ড নোনা। প্রাণীদের তৃষ্ণা মেটানোর একমাত্র উপায় বনের ভেতরের প্রাকৃতিক বা মানুষের খনন করা কিছু মিঠা পানির পুকুর। কিন্তু বড় জোয়ার বা জলোচ্ছ্বাসের সময় নোনা পানি ঢুকে পুকুরগুলো নোনা হয়ে যায়। ফলে তৃষ্ণায় ছটফট করলেও প্রাণীরা পানি পান করতে পারে না। বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত তীব্র তৃষ্ণা নিয়েই তাদের ধুঁকে ধুঁকে বাঁচতে হয়। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত এই সংকটের পাশাপাশি স্থানীয় কাঠুরে ও গোলপাতা সংগ্রহকারী, যারা বাওয়ালি নামে পরিচিত এবং জেলেরা যখন অতিরিক্ত মাত্রায় বনের ভেতরের খালের গভীরে বিচরণ করেন, তখন প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিঘ্ন ঘটে। ভয় পেয়ে হরিণ বা বাঘ এমন এলাকায় চলে যায়, যেখানে জোয়ারের পানির গভীরতা বেশি। এতে তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে। গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের তথ্য সুন্দরবনের এই রূঢ় জীবনযুদ্ধ কোনো কাল্পনিক গল্প নয়। দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানীদের গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের জরিপে এর বাস্তব চিত্র বারবার উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণায় (শারীফ এ মুকুল ও সহযোগীরা, ২০১৯) বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বর্তমান ধারা চলতে থাকলে ২০৭০ সালের মধ্যে সুন্দরবনে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের বসবাসের উপযোগী কোনো স্থান অবশিষ্ট থাকবে না। এর আগে ২০১০ সালে ডব্লিউডব্লিউএফের নেতৃত্বে কোলবি লাউকস ও সহযোগীদের গবেষণায় (ক্লাইমেটিক চেঞ্জ জার্নাল) হিসাব করা হয়, ২০০০ সালের তুলনায় সমুদ্রপৃষ্ঠ ২৮ সেন্টিমিটার বাড়লে সুন্দরবনে বাঘের অবশিষ্ট আবাসস্থল ৯৬ শতাংশ কমে যাবে এবং প্রজননক্ষম বাঘের সংখ্যা ২০টির নিচে নেমে আসবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ বিশেষজ্ঞ ড. মো. আবদুল আজিজের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের বাঘের খাদ্যের জৈবভরের প্রায় ৭৮ শতাংশ জোগান দেয় চিত্রা হরিণ। যেসব অঞ্চলে চিত্রা হরিণের ঘনত্ব বেশি, সেসব অঞ্চলেই বাঘের ঘনত্বও সবচেয়ে বেশি। গবেষকদের মতে, শিকার, আবাসস্থল হ্রাস বা পরিবেশগত কারণে হরিণের সংখ্যা কমলে বাঘের টিকে থাকা সরাসরি ঝুঁকিতে পড়বে। সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় রিমালের সময় সুন্দরবন প্রায় ৩৬ ঘণ্টা জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসের পানির নিচে ছিল। জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ৮ থেকে ১২ ফুট বলে জানিয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যম। পরবর্তী উদ্ধার অভিযানে বন বিভাগ ৯৬টি মৃত হরিণ উদ্ধার করে। অন্য একটি প্রতিবেদনে সাত দিনে ১৩৪টি হরিণ উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। একই জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের ভেতরের ৮০টি মিঠা পানির পুকুর নোনা পানিতে প্লাবিত হয়। এতে বন্যপ্রাণী ও বনকর্মীরা সুপেয় পানির তীব্র সংকটে পড়েন। সুন্দরবনের পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা মারাত্মকভাবে বাড়ায় প্রধান গাছ সুন্দরী পুষ্টিহীনতা ও শীর্ষমরা রোগে আক্রান্ত হয়ে ক্রমে কমে যাচ্ছে। এতে হরিণের প্রধান খাদ্য উপাদান কমছে, যা বাঘের খাদ্যশৃঙ্খলকেও চরম সংকটে ফেলছে। সংকট উত্তরণে করণীয় সুন্দরবনের বিপন্ন জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং বন্যপ্রাণীকে জোয়ার ও নোনা পানির আগ্রাসন থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে কিছু বাস্তবমুখী ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বনের ভেতরে তৈরি কৃত্রিম মাটির ঢিবি বা কেল্লার উচ্চতা বাড়াতে হবে, যাতে অস্বাভাবিক জলোচ্ছ্বাসেও সেগুলো ডুবে না যায়। কেল্লার চারপাশে লবণসহিষ্ণু এবং হরিণের খাদ্য উপযোগী ঘাস ও গাছের চারা লাগাতে হবে। বনের গভীর অংশে নতুন কেল্লাও নির্মাণ করতে হবে। বন্যপ্রাণীকে বাঁচানোর সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি সুপেয় মিঠা পানির জোগান ধরে রাখা। পুকুরগুলোর পাড় আরও উঁচু ও টেকসই করতে হবে, যাতে জলোচ্ছ্বাসের নোনা পানি ঢুকতে না পারে। পুকুরের মুখে আধুনিক স্লুইস গেট বসানো যেতে পারে, যা জোয়ারের সময় বন্ধ থাকবে এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে সাহায্য করবে। হরিণ ও বাঘের চোরাশিকার নির্মূলে বন বিভাগের টহল আরও জোরদার করতে হবে। দুর্গম ও সংবেদনশীল এলাকায় ক্যামেরা ট্র্যাপের পাশাপাশি ড্রোনের সাহায্যে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো দরকার, যাতে চোরাশিকারিরা ফাঁদ পাততে না পারে। জলোচ্ছ্বাসে মিঠা পানির পুকুর নোনা হলে প্রাণীরা পানি ও আশ্রয়ের খোঁজে লোকালয়ে চলে আসে এবং মানুষের হাতে মারা পড়ে। এটি ঠেকাতে বনের সংবেদনশীল সীমানায় শক্তিশালী নাইলনের বেড়া দেওয়া প্রয়োজন, যা প্রাণীদের লোকালয়ে প্রবেশে বাধা দেবে এবং বাঘ-মানুষের দ্বন্দ্ব কমাবে। কোর জোন বা বন্যপ্রাণীর প্রধান প্রজনন এলাকায় মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। পর্যটনও এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে লঞ্চ বা স্পিডবোটের শব্দে ভয় পেয়ে বাঘ বা হরিণ গভীর পানিতে ঝাঁপ না দেয়। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালো ভূমিকা রেখে যেতে হবে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান সামান্য হলেও দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। তিনি জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান। ভাষণে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সুন্দরবনে মিঠা পানির প্রবাহ বাড়াতে এবং বড় জলাধারের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণে সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করেছে। সুন্দরবন-সংলগ্ন নদীগুলোরও পলি অপসারণ বা ড্রেজিং প্রয়োজন, যাতে নদীর পানি ধারণক্ষমতা বাড়ে এবং জোয়ারের পানি বনে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি করতে না পারে। আরটিভি/টিআর
জোয়ারের সঙ্গে শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই করে টিকে থাকে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীরা
কথা আছে বলে মোটরসাইকেল থামান নারী, অতঃপর...
পঞ্চগড়ের বোদায় কথা আছে বলে এক নারী মোটরসাইকেল থামানোর পর চালককে মারধর, টাকা ও মোটরসাইকেল লুটের অভিযোগ উঠেছে পাঁচ যুবদল নেতার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় করা মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
কথা আছে বলে মোটরসাইকেল থামান নারী, অতঃপর...
আরও পড়ুন
ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় হত্যা মামলার প্রধান আসামি ধরা
জবির কেন্দ্রীয় মন্দিরের আহ্বায়ক অজয়, সদস্য সচিব জয়
সাতক্ষীরায় ১৯ হাজার টন বোরো চাল সংগ্রহ
অন্যের ঝগড়া থামাতে গিয়ে প্রাণ গেল যুবকের