জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার ৯৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট খরচ বাবদ গত জুন মাসে প্রায় ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় মন্ত্রণালয়। সেই টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা বলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তারা ফেরত নিয়ে নিজেদের পকেটে রাখার অভিযোগ উঠেছে।
এই ঘটনায় বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) দুদকে অভিযোগ দিয়েছেন শিক্ষকরা।
শিক্ষকদের অভিযোগ, ইসলামপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহানারা খাতুন যোগদানের পর থেকেই অফিস পরিচালনায় স্বেচ্ছাচারিতা ও আর্থিক অনিয়ম করে আসছেন। বিদ্যালয়ে সরকারি বরাদ্দের টাকা নিয়ে নয়ছয়, প্রেষণ, পরীক্ষা পরিচালনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে ঘুষ-দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছেন তিনি।
জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইসলামপুর উপজেলার ৯৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট খরচ বাবদ গত জুন মাসে সাড়ে ১০ হাজার করে টাকা বরাদ্দ আসে। সেই টাকা জুন মাসে সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। এরপর জুলাই মাসে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা বলে সংশ্লিষ্ট গুচ্ছের তিনজন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে ওই টাকা ফেরত নেওয়া হয়। কিন্তু সেই টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত না দিয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তারা নিজেদের পকেটে রেখে দেন। বিষয়টি জানাজানি হলে ক্ষুদ্ধ শিক্ষকরা প্রতিকার চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করেন। পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্য সুলতান মাহমুদ বাবুর কাছেও বিচার প্রার্থী হন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৯৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১৮ থেকে ২০টিতে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। বাকিগুলোত সংযোগ নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা।
মরাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমুন্নাহার বলেন, তার বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট খরচ বাবদ গত জুন মাসে ১০ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জুলাই মাসে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল হামিদ সরকারের রাজস্ব খাতে জমা দেওয়ার কথা বলে তার গুচ্ছের সব প্রতিষ্ঠানের পুরো টাকা ফেরত নিয়েছেন।
পূর্বকান্দারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাকের ভাষ্য, প্রতি মাসে তার প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট বাবদ এক হাজার টাকা খরচ হয়। গত জুনের শেষ দিকে ইন্টারনেট খরচ বাবদ তাকে ১০ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু গত ১১ জুলাই সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা হারুন-অর-রশীদ রাজস্ব খাতে জমা দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে পুরো টাকা ফেরত নেন।
ধনতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাইনুল হক, বেলগাছা ঘোনাপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রুহুল আমীন ও আলাই পূর্বপাড়ার প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন জানান, সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে ১০ হাজার ৫০০ টাকা করে ফেরত নেন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা দিপা রানী গোপ।
বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমাজের ইসলামপুর উপজেলা শাখার সভাপতি সৈয়দ মাসুদুর রহমান রাজা বলেন, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৯৬টি বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট খরচ বাবদ ১২ হাজার টাকা করে বরাদ্দ আসে। আয়কর ও ভ্যাট বাদে বিল-ভাউচার নিয়ে সাড়ে ১০ হাজার টাকা প্রতিটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছে হস্তান্তর করেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে শিক্ষকদের দেওয়া টাকা গত জুলাই মাসে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ফেরত নেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহানারা খাতুন। আইএসপি নামে একটি বেসরকারি
সংস্থাকে ইন্টারনেট সংযোগের কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
বাঘরদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম বলেন, ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা আইএসপি কর্তৃপক্ষ সংযোগ দিতে টালবাহানা ও কালক্ষেপণ করে। যে কারণে বিকল্পভাবে নিজের ব্যক্তিগত টাকায় ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন করে ব্যবহার করছেন তারা।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিইও) হারুন-অর-রশীদ, আব্দুল হামিদ ও দিপা রানী গোপের সঙ্গে। তারা জানান, শিক্ষকদের কাছ থেকে ফেরত নেওয়া টাকার একটা অংশ ইন্টারনেট কোম্পানিকে দেওয়া হবে। এর চেয়ে বেশি কিছু জানাতে অপাগতা প্রকাশ করেন তারা।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহানারা খাতুন দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নেই। তবে ৯৬টি বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট বাবদ শিক্ষকদের দেওয়া টাকা ফেরত নেওয়ার বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।
জামালপুর জেলা প্রাথমিক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আলী আহসানের ভাষ্য, সরকারি বরাদ্দের টাকা সরাসরি উপজেলায় আসে। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নিজেই তা খরচ করেন। সরকারি টাকা তছরুপসহ অফিস কর্মকর্তাদের কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুর্নীতি দমন কমিশন সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. কামরুজ্জামান বলেন, শিক্ষকদের অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আরটিভি/এমএম




