
সুন্দরবনে অবমুক্ত করার এক মাস পেরিয়ে গেলেও সন্ধান মেলেনি চিকিৎসা শেষে বনে ফিরিয়ে দেওয়া সেই বাঘিনীর। তার গতিবিধি নজরদারিতে বসানো ৪০টি স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাপ ক্যামেরার কোনোটিতেই এখন পর্যন্ত ধরা পড়েনি বাঘিনীটির ছবি। বরং ক্যামেরায় ধরা পড়েছে অন্য তিনটি বাঘের উপস্থিতি। এসব ছবির কোনো বাঘের সঙ্গেই অবমুক্ত করা বাঘিনীর মিল পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় বাঘিনীটির বর্তমান অবস্থান ও শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশ সচেতন মহলে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন— বাঘিনীটি কি নিরাপদে বনে টিকে আছে, নাকি খাদ্যসংকট কিংবা অন্য কোনো কারণে বিপদে পড়েছে? আবার শিকারিদের পাতা ফাঁদে ফের আটকা পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী টহল ফাঁড়ির আওতাধীন শরকির খালসংলগ্ন এলাকায় হরিণ শিকারিদের পাতা ছিটকা ফাঁদে আটকা পড়ে বাঘিনীটি। দীর্ঘ সময় ফাঁদে আটকে থাকায় তার সামনের বাঁ পায়ে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে ক্ষতস্থানে পচনও ধরে।
পরে বন বিভাগের সদস্যরা বাঘিনীটিকে ফাঁদ থেকে উদ্ধার করে খুলনার বয়রায় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যান। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের তত্ত্বাবধানে প্রায় ছয় মাস চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যার পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে বাঘিনীটি।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন শেষে গত ১২ জুলাই উদ্ধারস্থল থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে পূর্ব সুন্দরবনের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রসংলগ্ন বনাঞ্চলে বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করা হয়। বন বিভাগ জানিয়েছিল, অবমুক্ত করার পর তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণে প্রায় ১৫০ মিটার এলাকায় বাঘিনীটির পায়ের ছাপ পাওয়া যায়।
তবে অবমুক্তির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, খাঁচা থেকে বেরিয়ে বনে প্রবেশের সময় বাঘিনীটি কিছুটা অস্বাভাবিকভাবে চলছিল। হাঁটার সময় তার শরীর ডানে-বাঁয়ে হেলে পড়ছিল এবং শক্তভাবে দাঁড়াতেও কিছুটা অসুবিধা হচ্ছিল বলে ভিডিওতে প্রতীয়মান হয়। কয়েকবার পেছনের দিকেও ফিরে তাকাতে দেখা যায় তাকে।
এরপর এক মাস ধরে নিয়মিত নজরদারি চালিয়েও ট্র্যাপ ক্যামেরায় বাঘিনীটির কোনো ছবি না পাওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকার পর বন্য পরিবেশে ফিরে সে স্বাভাবিকভাবে শিকার করে টিকে থাকতে পারছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ অবমুক্তির আগে জানিয়েছিলেন, বাঘিনীটির শারীরিক সক্ষমতা এবং স্বাভাবিক শিকার ধরার প্রবৃত্তি বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা করা হয়েছে। পুনর্বাসন কেন্দ্রে ছয় মাস সাত দিন চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের পর তার শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনা করেই বনে অবমুক্ত করা হয়।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করার পর বন বিভাগের তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণে প্রায় দেড়শ মিটার এলাকায় তার পায়ের ছাপ পাওয়া যায়। শুরুতে কিছুটা দুর্বল ও অস্বাভাবিক মনে হলেও পরবর্তী সময়ে পাওয়া স্পষ্ট পায়ের ছাপ দেখে তাকে স্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছিল।
তিনি জানান, বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করার আগেই আন্ধারমানিক এলাকায় প্রায় আট কিলোমিটারজুড়ে ২০টি স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাপ ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে শ্যালনদীর পূর্বপাড় ও জয়মনি এলাকায় আরও ২০টি ক্যামেরা বসানো হয়। বন বিভাগ নিয়মিত এসব ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করছে।
ডিএফও বলেন, এসব ক্যামেরায় এখন পর্যন্ত তিনটি ভিন্ন বাঘের ছবি ধরা পড়েছে। তবে ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে অবমুক্ত করা বাঘিনীটির কোনো ছবি পাওয়া যায়নি। ক্যামেরায় ছবি না পাওয়াকে বাঘিনীটির মৃত্যুর প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একটি বাঘ সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় বিচরণ করতে পারে। সে কারণে বাঘিনীটি নিজের বিচরণ এলাকা পরিবর্তন করে অন্যদিকে চলে গিয়ে থাকতে পারে। ফলে নির্ধারিত ক্যামেরার আওতায় না আসাটাও স্বাভাবিক।
তবুও দীর্ঘ এক মাস ধরে ৪০টি ট্র্যাপ ক্যামেরায় বাঘিনীটির কোনো উপস্থিতি ধরা না পড়ায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। এখন সবার অপেক্ষা সুন্দরবনের গভীরে কোথায় আছে সেই বাঘিনী, আর কবে মিলবে তার অস্তিত্বের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ?
আরটিভি/এমএইচজে


