ঢাকা মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

বিষে নীল সুন্দরবন, ধ্বংসের মুখে জলজ জীববৈচিত্র্য

শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৩৭ পিএম
ছবি: আরটিভি

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে নতুন করে দেখা দিয়েছে ‘বিষদস্যুদের’ দৌরাত্ম্য। অল্প সময়ে বেশি মাছ শিকারের আশায় সুন্দরবনের ছোট ছোট খালে কীটনাশক ও বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক প্রয়োগ করছে এক শ্রেণির অসাধু জেলে। বিষক্রিয়ায় মারা পড়ছে চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য জলজ প্রাণী। এতে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে সুন্দরবনের জলজ বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য।

শুধু মাছ শিকারেই থেমে নেই এই চক্র। সুন্দরবনের গভীরে টংঘর ও মাচা তৈরি করে আগুন জ্বালিয়ে বিষে ধরা ছোট চিংড়ি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে শুঁটকি। একই সঙ্গে বিষে মারা যাওয়া অন্যান্য মাছ গোপনে পৌঁছে যাচ্ছে বিভিন্ন হাট-বাজারের আড়তে। বিষাক্ত রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ থাকা মাছ না জেনেই কিনে খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ফলে পরিবেশের পাশাপাশি বাড়ছে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও।

সম্প্রতি সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ বিষ দিয়ে ধরা মাছ, চিংড়ি শুঁটকি, কীটনাশক, বিষাক্ত রাসায়নিক, নৌকা ও জাল জব্দ করেছে বন বিভাগ। ধ্বংস করা হয়েছে শুঁটকি তৈরির কয়েকটি টংঘর ও আস্তানা। তবে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত কাউকে আটক করতে না পারায় প্রশ্ন উঠেছে পুরো চক্রের নিয়ন্ত্রণ ও তৎপরতা নিয়ে।

বন বিভাগের দাবি, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ ধরার প্রবণতা অনেকটাই কমেছে। নিয়মিত অভিযান, ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি, ফুট প্যাট্রোলিং এবং বিভিন্ন শাখা খালের মুখে বেড়া দেওয়ার ফলে অপরাধীদের বনে প্রবেশ অনেকটা কঠিন হয়েছে। তবে এসব বাধা অতিক্রম করে কেউ কেউ গোপনে বনে প্রবেশ করে বিষ প্রয়োগের চেষ্টা করছে।

সুন্দরবন-সংলগ্ন জেলে ও বনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অসাধু জেলেরা জোয়ারের শুরুতে ছোট খালের মুখে কীটনাশক ও বিষাক্ত রাসায়নিক ঢেলে দেয়। বিষ পানিতে মিশে স্রোতের সঙ্গে খালের ভেতরে ছড়িয়ে পড়লে কিছুক্ষণের মধ্যেই চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ দুর্বল হয়ে পানিতে ভেসে ওঠে। পরে সেগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়া হয়। স্থানীয়দের দাবি, একবার কোনো খালে বিষ প্রয়োগ করা হলে দীর্ঘ সময় সেখানে মাছের উপস্থিতি কমে যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করা এক জেলে বলেন, মাছ কমে যাওয়ায় অনেকে অল্প সময়ে বেশি মাছ পাওয়ার জন্য বিষ ব্যবহার করছেন। তবে এর ফলে সুন্দরবনের মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও তিনি স্বীকার করেন।

স্থানীয় কয়েকজন জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, কিছু অসাধু ও প্রভাবশালী মৎস্য ব্যবসায়ী জেলেদের বিষ দিয়ে মাছ ধরতে উৎসাহিত করেন। এমনকি তারাই জেলেদের কাছে কীটনাশক ও বিষাক্ত রাসায়নিক সরবরাহ করেন। স্থানীয় বাজারের কিছু দোকানেও গোপনে এসব রাসায়নিক বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

তাদের ভাষ্য, বিষ প্রয়োগের কারণে সুন্দরবনের সিলন টেংরা, চিত্রা, রিঠা, কাইন মাগুর, বাটা, পারসে-সহ বিভিন্ন দেশীয় মাছের প্রজাতি হুমকির মুখে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সুন্দরবনের অনেক প্রজাতির মাছ হারিয়ে যেতে পারে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের সহযোগী অধ্যাপক ড. শেখ তারেক আরাফাত বলেন, সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা শুধু একটি অবৈধ পদ্ধতি নয়, এটি পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি। বিষ প্রয়োগের ফলে মাছের ডিম, রেণু, পোনা, চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুকসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী ও ক্ষুদ্র জীব ধ্বংস হতে পারে। এতে পানির স্বাভাবিক গুণগত মানও নষ্ট হয়

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, বিষাক্ত মাছ ও জলজ প্রাণী খাওয়ার মাধ্যমে ক্ষতিকর রাসায়নিক মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। এর ফলে তাৎক্ষণিকভাবে অসুস্থতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে স্নায়ুতন্ত্র, যকৃত ও কিডনির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিছু রাসায়নিক দীর্ঘদিন পানি, কাদা ও তলদেশের পলিতে থেকে গিয়ে বাস্তুতন্ত্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞের মতে, বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করতে বন বিভাগের নজরদারি ও আইন প্রয়োগ আরও জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে নিয়মিত পানি, মাটি ও জলজ প্রাণীর দেহে ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি পরীক্ষা করতে হবে। বনজীবীদের বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে সুন্দরবনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও কমানো সম্ভব।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বিষদস্যুসহ সব ধরনের বন অপরাধ দমনে বন বিভাগ নিয়মিত অভিযান ও টহল পরিচালনা করছে। স্মার্ট প্যাট্রোলিং, ফুট প্যাট্রোলিং ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে অন্যান্য বছরের তুলনায় চলতি বছর বন অপরাধ অনেকটাই কমেছে।

তিনি আরও বলেন, বন অপরাধ দমনে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য দিয়ে বন বিভাগকে সহায়তা করতে হবে। আর বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অপরাধীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। না হলে অল্প সময়ে বেশি মাছ পাওয়ার এই অবৈধ প্রবণতা ভবিষ্যতে সুন্দরবনের জলজ সম্পদের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

আরটিভি/টিআর

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
দিনদুপুরে ব্যাংকের দুই কর্মকর্তাকে পিটিয়ে ৩৪ লাখ টাকা ছিনতাই
নওগাঁর রাণীনগর উপজেলায় ইসলামী ব্যাংকের একটি এজেন্ট ব্যাংকিং শাখার দুই কর্মকর্তাকে মারধর করে ৩৪ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। 
দিনদুপুরে ব্যাংকের দুই কর্মকর্তাকে পিটিয়ে ৩৪ লাখ টাকা ছিনতাই
খেলনা ভেবে ককটেল হাতে নিতেই বিস্ফোরণ! গুরুতর আহত কিশোর
শরীয়তপুরের জাজিরায় বল সদৃশ ককটেল হাতে নেওয়ার পর আকস্মিক বিস্ফোরণে মো. কামরুল (১৪) নামে এক কিশোর গুরুতর আহত হয়েছে। 
খেলনা ভেবে ককটেল হাতে নিতেই বিস্ফোরণ! গুরুতর আহত কিশোর
সীমান্তে বিএসএফের অপচেষ্টা রুখে দিল বিজিবি
নওগাঁর সাপাহার সীমান্ত দিয়ে চার ব্যক্তিকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর (পুশ ইন) একটি বড় অপচেষ্টা প্রতিহত করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
সীমান্তে বিএসএফের অপচেষ্টা রুখে দিল বিজিবি
মানবেতর জীবন কাটছে একই পরিবারের চার প্রতিবন্ধীর
যে বয়সে হাতে বই-খাতা নিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, সহপাঠীদের সঙ্গে খেলাধুলা আর হাসি-আনন্দে দিন কাটানোর কথা, সেই বয়সেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি হয়ে আছে সিয়াম হোসেন (১০) ও রিয়া আক্তার (১২)। চার বছর আগেও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করে বিদ্যালয়ে যেত দুই ভাই-বোন। কিন্তু সামান্য জ্বরের পরই বদলে যায় তাদের জীবন। ধীরে ধীরে তারা হারিয়ে ফেলে স্বাভাবিকভাবে হাঁটা-চলার সক্ষমতা।
মানবেতর জীবন কাটছে একই পরিবারের চার প্রতিবন্ধীর
ফটিকছড়িতে পুকুরে ডুবে ২ বোনের মৃত্যু
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ধর্মপুরে পুকুরের পানিতে ডুবে দুই চাচাতো বোনের মৃত্যু হয়েছে।
ফটিকছড়িতে পুকুরে ডুবে ২ বোনের মৃত্যু
আরও পড়ুন
জোয়ারের সঙ্গে শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই করে টিকে থাকে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীরা
সুন্দরবনের গহীনে পাওয়া গেল ১৪ মোবাইল, ঘটনা কী?
সুন্দরবনে ড্রোন উড়িয়েও সন্ধান মেলেনি অপহৃত ২১ জেলের
জাহাজের ‘কাছে গিয়েও’ ফিরে এলো বনদস্যুরা, ঘটনা কী