শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

গাজীপুরের শ্রীপুরে হাওলাতি টাকা সুদসহ আদায়ের পর প্রবাসীকে বিষপানে হত্যার অভিযোগ উঠেছে দেনাদার রফিকুল ইসলাম বাচ্চুর (৬০) ও তার স্বজনদের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ঘটেছে ৫ আগস্ট উপজেলার গোসিংগা ইউনিয়নের বাউনী গ্রামে।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাতে প্রবাসীর স্ত্রী বাবলি আক্তার শ্রীপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
নিহত মাহবুব আলম সুজন বাউনি গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে।
নিহতের স্ত্রী সুজনের স্ত্রী বাবলি আক্তারের দাবি, পুলিশের সরাসারি গাফিলতি এবং অবহেলায় আমার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে।
বাবলি বলেন, এখন আমার তিন বছরের বাচ্চা ঘুমের মধ্যেও তার বাবাকে বারবার ডাকে।
অভিযুক্তরা হলো একই গ্রামের মৃত উমর আলীর ছেলে রফিকুল ইসলাম বাচ্চু (৬০), তার স্ত্রী সুরাইয়া (৫৫), দুই ছেলে সাফিন (২২) ও সাকিল (২৫) এবং মোন্তাজ উদ্দিনের ছেলে আলমগীর (৩৫)।
জানা গেছে, প্রায় পাঁচ বছর আগে নিহতের পিতা নুরুল ইসলাম (৭২) ও মাতা মনোয়ারা (৬৫) একটি কার্টিজ পেপারে স্বাক্ষর করে রফিকুল ইসলাম বাচ্চুর স্ত্রী সুরাইয়ার কাছ থেকে মাসিক ৫ হাজার টাকা সুদে ৩০ হাজার টাকা হাওলাত নেয়। যথাসময়ে সুদসহ আমার শ্বশুর ওই টাকা পরিশোধ করে কার্টিজ পেপার ফেরত চাইলে সুরাইয়া (৫৫) জানায় ‘কার্টিজ পেপারটি হারিয়ে গেছে’। পরে তাদের কথা বিশ্বাস করে প্রবাসীর বাবা-মা বাড়িতে চলে আসে। কিন্তু গত ৬ মাস আগে অভিযুক্তরা পরস্পর যোগাসাজশে ওই কার্টিজ পেপার দেখিয়ে নুরুল ইসলামের ছেলে মাহবুব আলম সুজনের কাছে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা পাওনা দাবি করে তাদের বিরুদ্ধে গাজীপুরের আদালতে সিআর মামলা (নং-২০৪১/২৫) দায়ের করে। ওই মামলায় আদালত তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
মিথ্যা মামলার বিষয়ে অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসা করলে জানায় ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা না দিলে পুরো পরিবারকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে জানান প্রবাসী সুজনের স্ত্রী।
প্রবাসী সুজনের স্ত্রী বাবলি আক্তার বলেন, গত ৫ আগস্ট রাত ১০ টার দিকে বাচ্চু ছোট ছেলে সাফিন আমাদের বাড়িতে আসে। এ দিন রাতে টাকা লেনেদেনের বিষয়ে আমাদের সঙ্গে আপোষ মিমাংসার কথা বলে আমার শাশুড়ি, স্বামীসহ আমাকে তাদের বাড়িতে যেতে বলে। ওই রাতেই আমরা তিনজন তাদের বাড়িতে অলোচনার এক পর্যায়ে রফিকুল ইসলাম বাচ্চু তার স্ত্রী সুরাইয়াকে শরবত দিতে বলে। ওই শরবত আমার স্বামী পান করলেও আমি ও আমার শ্বাশুড়ি করিনি। কিন্তু আমার স্বামী শরবত পান করার সঙ্গে সঙ্গে বুকে জ্বালাপোড়া শুরু হয়। এ সময় বাচ্চু পরে আলোচনা করবে বলে আমাদেরকে বাড়িতে চলে যেতে বলে।
সুজনের স্ত্রী বাবলি বলেন, বাড়িতে আসার পর স্বামীর গলা দিয়ে খালি রক্ত আসে এবং ‘জিহ্বা, মুখ ও বুকের ভেতর সব পুইড়া গেছে গা’ বলতেছে। এ সময় শ্রীপুর থানা পুলিশ বাড়িতে এসে আমার স্বামী ও শ্বশুর গ্রেপ্তার করে।
তিনি আরও বলেন, এ সময় আমার স্বামী পুলিশকে জানায় বাচ্চুর স্ত্রী সুরাইয়া আমাকে শরবতের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে পান করিয়েছে। তিনি দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে ওয়াশ করার জন্য পুলিশকে বারবার অনুরোধ করার পরও তাকে (স্বামী) হাসপাতালে না নিয়ে থানায় নিয়ে যায়।
তিনি বলেন, পরে থানার গারদে (হাজত খানায়) অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকলে পুলিশ তাকে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক পেট ওয়াশ করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে গাজীপুর শহীদ তাজ উদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন। সেখান থেকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। ওই হাসপাতালে স্বামীকে ভর্তি করতে না পেরে ধানমন্ডি সুপারম্যাক্স হেলথ কেয়ার লিমিটেডে নিয়ে গেলে কত্যর্বরত চিকিৎসক বলেন— আমার স্বামীকে বাঁচানো যাবে না।
বাবলি বলেন, পরে বাড়ি ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু ১৩ আগস্ট আমার স্বামীকে বাড়িতে নিয়ে আসার পথে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং স্বামীকে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরী বিভাগে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষনা করেন।
নিহত মাহবুব আলম সুজনের বাবা নূরুল ইসলাম বলেন, এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে সালিশ বসে। সেখানে মাতবররা তাকে ডেকে নিয়ে বলেন— আমার ছেলে মাহবুব সুরাইয়ার ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে তার কাছ থেকে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়েছে। আমি ৩০ হাজার টাকা সুদে নিয়েছি। এ কথা বললে মাতবরেরা বলেন আপনি মিথ্যা বলছেন, আপনার স্বাক্ষর রয়েছে, এই নেন স্ট্যাম্প।
তিনি আরও বলেন, ৩০ হাজার টাকার স্ট্যাম্প কি করে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা হয়? এক পাতার স্ট্যাম্প কি করে তিন পাতার হয়? মাতবরদের সব সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে তিনি সালিশ বৈঠকে ৫৫ হাজার টাকা নগদ পরিশোধ করেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত সুরাইয়া বেগম বলেন, মাহবুব বিদেশ থাকা অবস্থায় বিকাশের মাধ্যমে তার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। টাকা না দেওয়ায় তিনি আদালতে মামলা করেছেন। শরবতের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাওয়ানোর বিষয়টি সঠিক নয়।
মাহবুবকে কীটনাশক খাওয়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সাবরিনা বলেন, ৫ আগস্ট (বুধবার) দিবাগত রাত দুইটার দিকে মাহবুবকে তার হাসপাতালে আনা হয়। কীটনাশক খাওয়ানোর কারণে রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল। স্বজনদের মুচলেকার পর ওয়াশ করে গাজীপুর শহীদ তাজ উদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
শ্রীপুর থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) এমদাদ হোসেন বলেন, প্রতারণা মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি মাহবুবসহ তার বাবা-মাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বয়স বিবেচনায় তার মা বৃদ্ধ মহিলাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। অসুস্থ আসামিকে নিয়ে সারারাত সিএনজি দিয়ে ঘুরানোর বিষয়ে তিনি বলেন সিএনজি চালক পথ ভুল করায় একটু সময় বেশি লেগেছে। থানায় আনার অনেক পর মাহবুব অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহামম্দ শাহিনুর আলম বলেন, গ্রেপ্তার করে থানায় আনার পর আসামী মাহবুব সুস্থ ছিল। অসুস্থ হলে মানবিক কারণে একজনের জিম্মায় চিকিৎসার জন্য দেওয়া হয়েছে। তাকে কীটনাশক খাওয়ানো হয়েছিল কি না এটি আসামি মাহবুব পুলিশকে বলেনি। থানায় অসুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ময়না তদন্ত ছাড়া কীটনাশক পানে একজন আসামির দাফন হলো কী করে এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি কোন সদোত্তর দিতে পারেননি। তবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে মাহবুব আলমের স্ত্রী বাদী হয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় অবস্থা নেওয়া হবে।
আরটিভি/এমএম


