
এই স্বপ্নকে সামনে রেখে একদল তরুণের সম্মিলিত উদ্যোগে গড়ে উঠেছে গ্রিনফিল্ড একাডেমি।শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়; শিক্ষা হলো একটি শিশুর চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, আত্মবিশ্বাস, মানবিকতা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে ধীরে ধীরে বিকশিত করার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

এই উপলব্ধি থেকেই মানসম্মত, আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষার প্রত্যয় নিয়ে ২০২৫ সালে যাত্রা শুরু করে গ্রিনফিল্ড একাডেমি।কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের নন্দীপুর গ্রামে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে একটি সম্ভাবনাময় আধুনিক শিক্ষাঙ্গন হিসেবে পরিচিতি তৈরি করেছে।কেন গ্রিনফিল্ড একাডেমি?গ্রিনফিল্ড একাডেমি প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে একটি সামাজিক স্বপ্ন এবং দীর্ঘদিনের উপলব্ধি। উচ্চশিক্ষিত ও স্বপ্নবাজ কয়েকজন মানুষ লক্ষ্য করেছেন গ্রামীণ জনপদে মেধাবী ও সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীর কোনো অভাব নেই; কিন্তু তাদের জন্য মানসম্মত, আধুনিক ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষার সুযোগ এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত।
তাহলে কি একটি শিশুর জন্মস্থান তার শিক্ষার মান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার সীমা নির্ধারণ করবে?গ্রিনফিল্ড একাডেমির উদ্যোক্তারা মনে করেন, কখনোই নয়।এই বিশ্বাস থেকেই তাদের উদ্যোগ গ্রামের শিশুরাও যেন আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পায়, নিজেদের প্রতিভা বিকশিত করতে পারে এবং ভবিষ্যতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।তবে লক্ষ্য শুধু একটি নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠা করা নয়। প্রচলিত শিক্ষা কাঠামোর মধ্যেই পাঠদান পদ্ধতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এনে শ্রেণিকক্ষকে আরও কার্যকর, আনন্দময় ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক করে তোলাই তাঁদের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

শিক্ষাকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখার দর্শনগ্রিনফিল্ড একাডেমির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এটি কেবল ব্যবসায়িক চিন্তা থেকে প্রতিষ্ঠিত কোনো উদ্যোগ নয়। একদল তরুণ স্বপ্নবাজ বন্ধু নিজেদের এলাকার আগামী প্রজন্মের জন্য কিছু করার প্রত্যয় নিয়ে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।প্রতিষ্ঠানটির মূল দর্শন হলো শিক্ষাকে ব্যবসা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে দেখা।এই চিন্তা থেকেই গ্রিনফিল্ড একাডেমিকে একটি অলাভজনক সামাজিক ও শিক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় নেওয়া হয়েছে।
উদ্যোক্তাদের বিশ্বাস, একটি শিশুর জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারলে তার প্রভাব শুধু একটি পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না; ধীরে ধীরে তা একটি কমিউনিটি এবং বৃহত্তর সমাজেও ছড়িয়ে পড়ে।কী ধরনের মানুষ তৈরি করতে চায় গ্রিনফিল্ড?গ্রিনফিল্ড একাডেমির লক্ষ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা শিক্ষার্থী তৈরি করা নয়। বরং এমন মানুষ তৈরি করা, যে জ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি হবে আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল, সৃজনশীল, মানবিক, শৃঙ্খলাবোধসম্পন্ন ও ভবিষ্যৎ-উপযোগী।প্রতিষ্ঠানটির মিশন হলো প্রতিটি শিশুর মধ্যে নতুন শুরুর অনুপ্রেরণা জাগানো এবং উচ্চমানের দ্বিভাষিক শিক্ষার মাধ্যমে তার সুপ্ত প্রতিভা ও পূর্ণ সম্ভাবনাকে বিকশিত করা।অন্যদিকে ভিশন হলো কৌতূহল, সৃজনশীলতা, বিকাশ এবং আজীবন শেখার মানসিকতাকে উৎসাহিত করে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা, যারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে এবং দায়িত্বশীল বিশ্বনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষাই মূল দর্শনগ্রিনফিল্ড একাডেমির শিক্ষা কার্যক্রমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো Child-centered Learning।
এখানে শিশুকে শুধু পাঠ্যবই ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তার স্বাভাবিক কৌতূহল, আগ্রহ, সৃজনশীলতা ও শেখার নিজস্ব গতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের জন্য Montessori Method of Learning-এর বিভিন্ন কার্যকর উপাদান ব্যবহার করা হয়। পর্যবেক্ষণ, অনুশীলন, অংশগ্রহণ, হাতে-কলমে কাজ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখার সুযোগ তৈরি করা হয়।এখানে শিক্ষক শুধু তথ্য প্রদানকারী নন; বরং শিক্ষার্থীর শেখার পথকে সহজ ও কার্যকর করার একজন Facilitator। আর শিক্ষার্থী কেবল শ্রোতা নয় সে শেখার প্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশগ্রহণকারী।

শিক্ষক,শিক্ষার্থী-অভিভাবক: একটি ত্রিমাত্রিক অংশীদারিত্বএকটি শিশুর পূর্ণ বিকাশ শুধু বিদ্যালয়ের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য গ্রিনফিল্ড একাডেমি গুরুত্ব দেয় Teacher–Student–Parent Triangular Partnership-কে।শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শিশুর শেখার পরিবেশ তৈরি করবেন, শিক্ষার্থী সক্রিয়ভাবে শেখার অংশ নেবে এবং অভিভাবক বাড়িতে তার শেখা, আচরণ ও মানসিক বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখবেন এই সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি শিশুকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।ছোট ক্লাস, বেশি মনোযোগবর্তমানে PG থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ১৪০ জন শিক্ষার্থী গ্রিনফিল্ড একাডেমিতে অধ্যয়ন করছে। তাদের পাঠদানে নিয়োজিত রয়েছেন ১৪ জন প্রশিক্ষিত শিক্ষক।প্রতিটি শিশুর প্রতি পর্যাপ্ত মনোযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতি শ্রেণিতে সর্বোচ্চ ২০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি নেওয়ার নীতি অনুসরণ করা হয়।প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাস, একটি শিশুকে শুধু শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত রাখাই যথেষ্ট নয়; তার শেখার অগ্রগতি, দুর্বলতা, আগ্রহ ও প্রয়োজন সম্পর্কে শিক্ষককে জানতে হবে এবং সে অনুযায়ী সহায়তা দিতে হবে।দ্বিভাষিক শিক্ষার সমন্বিত পরিবেশশিক্ষার্থীদের বয়স, শ্রেণি ও প্রয়োজন বিবেচনায় বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষার সমন্বয়ে শিক্ষার সুযোগ রাখা হয়েছে।
PG থেকে KG: English Versionপ্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণি: Bangla Versionএর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগ, কথোপকথন ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। লক্ষ্য হলো শিশুর মাতৃভাষায় একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায়ও কার্যকর যোগাযোগের সক্ষমতা গড়ে তোলা।নিয়মিত পাঠদানের বাইরে অতিরিক্ত সহায়তাগ্রিনফিল্ড একাডেমিতে শেখার প্রক্রিয়া শুধু নির্ধারিত ক্লাসেই সীমাবদ্ধ নয়।প্রতিদিন সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে অ্যাসেম্বলির মাধ্যমে একাডেমির কার্যক্রম শুরু হয়। অ্যাসেম্বলির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সময়ানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা, আত্মবিশ্বাস, দলগত চেতনা ও নেতৃত্বের গুণ বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হয়।নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন ও দুর্বলতা বিবেচনায় বিদ্যালয়ের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে অতিরিক্ত দুটি পিরিয়ডে Extra Class নেওয়া হয়। এর জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো অতিরিক্ত ফি নেওয়া হয় না।ফলে নির্ধারিত পাঠের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা পুনরাবৃত্তি, অনুশীলন এবং প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত সহায়তার সুযোগ পায়।‘No Backbencher’কেউ পিছিয়ে থাকবে নাগ্রিনফিল্ড একাডেমির অন্যতম

উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হলো “No Backbencher Policy”।এর মূল দর্শন কোনো শিক্ষার্থী যেন শ্রেণিকক্ষে অবহেলিত বা পিছিয়ে না থাকে।কারণ সব শিশুর শেখার গতি এক নয়। কেউ দ্রুত শেখে, কেউ একটু বেশি সময় নেয়; কেউ বই পড়ে ভালো শেখে, কেউ কাজ করে বা দেখে দ্রুত শেখে। তাই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রয়োজন ও সক্ষমতাকে বিবেচনায় নিয়ে তাকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।এখানে শিক্ষার সাফল্য শুধু পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে বিচার করা হয় না। আত্মবিশ্বাস, আচরণ, যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা, শৃঙ্খলা ও সামাজিক মূল্যবোধকেও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখা হয়।শুধু একাডেমিক শিক্ষা নয়, Future Skillsপরিবর্তনশীল পৃথিবীতে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দিয়ে ভবিষ্যৎ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধীরে ধীরে Critical Thinking, Creativity, Communication, Collaboration, Problem-solving এবং Digital Literacy-এর মতো ভবিষ্যৎ দক্ষতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।একই সঙ্গে Public Speaking, English Communication, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, খেলাধুলা ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বহুমাত্রিক বিকাশের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
শিক্ষকের উন্নয়নও শিক্ষার অংশগ্রিনফিল্ড একাডেমি মনে করে, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে মানসম্মত শিক্ষক তৈরি ও ধরে রাখা অপরিহার্য।তাই শিক্ষক প্রশিক্ষণ, নতুন Teaching Methodology, শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ, Feedback এবং নিয়মিত একাডেমিক সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষকদের দক্ষতা ও পাঠদান পদ্ধতির উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়।কারণ একজন ভালো শিক্ষক শুধু একটি বিষয় শেখান না; তিনি একজন শিশুর চিন্তার জগৎকে প্রভাবিত করেন।একটি স্কুল নয়, একটি Community গড়ার স্বপ্নগ্রিনফিল্ড একাডেমির স্বপ্ন শুধু একটি ভালো স্কুল তৈরি করা নয়। তারা এমন একটি শিক্ষাবান্ধব কমিউনিটি গড়ে তুলতে চায়, যেখানে বিদ্যালয়, পরিবার ও সমাজ একসঙ্গে শিশুদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে ভূমিকা রাখবে।উদ্যোক্তাদের বিশ্বাস, একটি ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তার চারপাশের সমাজেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তাই শিক্ষার মাধ্যমে স্থানীয় কমিউনিটির মানোন্নয়ন এবং দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক অবদান রাখার প্রত্যয়ও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

২৯ আগস্ট: গ্রিনফিল্ড একাডেমি ডেগ্রিনফিল্ড একাডেমির পথচলায় ২৯ আগস্ট একটি বিশেষ দিন। এই দিনটিকে প্রতিষ্ঠানটি “Greenfield Academy Day” হিসেবে উদযাপন করতে যাচ্ছে।এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন নয়; বরং একটি স্বপ্নের যাত্রা, অর্জন, আত্মসমালোচনা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনাকে উদযাপনের দিন।এই দিনটি উদ্যোক্তা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শুভানুধ্যায়ীদের জন্য একই সঙ্গে ফিরে দেখা ও সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি উপলক্ষ।সামনে আরও বড় স্বপ্নগ্রিনফিল্ড একাডেমির পথচলা এখনও শুরুর পর্যায়ে। সামনে আরও অনেক চ্যালেঞ্জ, পরিকল্পনা ও সম্ভাবনা রয়েছে।তবে লক্ষ্যটি পরিষ্কার গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের জন্য এমন একটি শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তারা নিজেদের স্বপ্ন দেখতে শিখবে, নিজের সক্ষমতাকে চিনবে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস অর্জন করবে।একদল তরুণ স্বপ্নবাজ বন্ধুর উদ্যোগে শুরু হওয়া এই পথচলায় এখন যুক্ত হয়েছে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রত্যাশা।গ্রিনফিল্ড একাডেমির স্বপ্ন শহরের মানসম্মত শিক্ষা গ্রামের মাটিতে পৌঁছে দেওয়া।
লক্ষ্যশুধু ভালো ফলাফল নয়, ভালো মানুষ তৈরি করা।বিশ্বাস একটি ভালো স্কুল একটি শিশুকে বদলাতে পারে, আর একটি প্রজন্মকে বদলে দিতে পারে একটি সমাজকে।সেই বিশ্বাস ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই এগিয়ে চলেছে গ্রিনফিল্ড একাডেমিনন্দীপুর, বনগ্রাম, কটিয়াদি, কিশোরগঞ্জ নতুন শুরু, বিকাশের পথ, সম্ভাবনার ভবিষ্যৎ।
আরটিভি/এসকে




