
লালমনিরহাটে পাটের মৌসুমে আশানুরূপ ফলন না পাওয়ায় চিন্তায় কৃষকেরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত উৎপাদন খরচ, সারের মূল্য বৃদ্ধি ও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রিত বাজার। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার শঙ্কায় চরম হতাশও তারা। ফলন ও দাম—দুই দিক থেকেই ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন জেলার পাটচাষিরা।
পাটচাষিরা জানান, গত কয়েক বছর পাটের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হয়েছে। কখনো কখনো পাট বিক্রি করে লাভের পরিবর্তে লোকসান গুনতে হয়েছে। এক সময়ের ‘সোনালি আঁশ’ তাদের কাছে ‘গলার ফাঁস’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন কয়েকজন কৃষক।
কৃষকদের আশঙ্কা, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাটের দাম না পেলে গত কয়েক বছরের মতো এবারও লোকসান গুনতে হবে। এতে আগামী মৌসুমে পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ কমে যেতে পারে।
জেলার আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা, পাটগ্রাম ও সদর উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল ও গ্রামে এবার ব্যাপকভাবে পাটের আবাদ হয়েছে। বিশেষ করে তিস্তা, ধরলা ও সানিয়াজান নদীর চরাঞ্চলের অনাবাদি ও বন্যাপ্রবণ জমিতে পাট চাষে আগ্রহ বেড়েছে। ধানসহ অন্যান্য ফসল ভালো হয় না—এমন জমিতেও এবার পাট চাষ করেছেন কৃষকেরা।
তবে আশানুরূপ ফলন না হওয়ায় এখন ভালো দাম পাওয়া নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকেরা পাট কাটার পর তা ডোবা, নালা, পুকুর ও খাল-বিলে পানিতে স্তূপ করে জাগ দিচ্ছেন। সাধারণত ২০ থেকে ২৫ দিন পর পাট পচে গেলে সেখান থেকে আঁশ ছাড়িয়ে রোদে শুকানো হয়। অনেক কৃষকের পাট এখনও পুরোপুরি পচেনি; তবে কয়েক দিনের মধ্যে আঁশ ছাড়ানোর কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছেন তারা।
কৃষকেরা জানান, মৌসুমের শুরুতে খরার কারণে পাটের জমিতে সেচ দিতে হয়েছে। পরে অতিবৃষ্টির কারণে অনেক জমিতে পানি জমে যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় রোগবালাইয়ের প্রকোপও ছিল তুলনামূলক বেশি। এসব কারণে পাটের গাছ আশানুরূপ বাড়েনি এবং ফলনও কম হয়েছে।
এবার ফলন কম হওয়ায় ন্যায্যমূল্য না পেলে গত কয়েক বছরের লোকসানের ক্ষত আরও গভীর হবে বলে আশঙ্কা তাদের।
পাটের বাজার নিয়েও কৃষকদের মধ্যে রয়েছে শঙ্কা। তাদের অভিযোগ, পাট কাটার মৌসুমে স্থানীয় ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীরা সিন্ডিকেট করে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। এতে কৃষকেরা উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে পাট বিক্রি করতে বাধ্য হন। পরে সেই পাটই বেশি দামে বিক্রি করে লাভবান হন মধ্যস্বত্বভোগীরা।
কৃষকেরা বলছেন, সরকারি উদ্যোগে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরাসরি তাদের কাছ থেকে পাট কেনার ব্যবস্থা করা হলে তারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। ধান ও গমের মতো পাটের ক্ষেত্রেও সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
আদিতমারী উপজেলার পাটচাষি সামাদ মিয়া বলেন, প্রকৃত পাটচাষিদের প্রশিক্ষণ, উন্নতমানের বীজ ও কৃষি উপকরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। প্রকৃত চাষিদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা দেওয়া হলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।
কালীগঞ্জ উপজেলার চলবলা ইউনিয়নের কৃষক নুর হাবিব বলেন, ‘পাটের জমিতে পানি জমে থাকায় এবার পাটের গাছ লম্বা হয়নি। ফলে পাটের আঁশও ভালো হয়নি। এবারও আমাদের লোকসানের মুখ দেখতে হবে।’
চরাঞ্চলের কৃষক সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা প্রতিবার আশা নিয়ে পাট চাষ করি, কিন্তু প্রতিবারই লোকসানের মুখ দেখি। অতিবৃষ্টির কারণে এবার পাটের গাছ আশানুরূপ বড় হয়নি, তাই ফলন কম হয়েছে। সরকার পাটের দাম নির্ধারণ করে দিলে কিছুটা ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারব।’
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. মতিউল আলম জানান, চলতি বছর জেলায় ৪ হাজার ৪৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ১০ হেক্টর। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৫ হেক্টর বেশি জমিতে পাট চাষ হয়েছে।
তিনি বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে এবার ফলন কিছুটা কম হয়েছে। তবে আগামী বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফলন ভালো হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আরটিভি/ এসকেডি


