
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বরগুনার আমতলী পৌরসভার কেন্দ্রীয় লেকের সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ওয়াকওয়ের আরসিসি ডেক প্ল্যাটফর্মের একটি অংশ ধসে পড়েছে।
রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুরে শ্রমিকরা নির্মাণকাজ করার সময় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ও অনিয়মের কারণে নির্মাণাধীন অংশ ধসে পড়েছে। ঘটনার দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
জানা গেছে, আমতলী পৌরসভার কেন্দ্রীয় লেকের সৌন্দর্যবর্ধনে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২ কোটি ৫৬ লাখ ৯৮ হাজার ৩২৩ টাকা ব্যয়ে এলজিসিআরআরপি প্রকল্পের আওতায় কাজ হাতে নেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে আমতলী পৌর মেয়র মো. মতিয়ার রহমান এ কাজের দরপত্র আহ্বান করেন।
অভিযোগ রয়েছে, অতি গোপনে ঝালকাঠির ইসলাম ব্রাদার্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজটি দেওয়া হয়। তবে নামে ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হলেও প্রকল্পের সমুদয় কাজ সাবেক মেয়র মতিয়ার রহমানই করাচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
২০২৪ সালের ৩০ জুলাই কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু হয়নি। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মেয়র মতিয়ার রহমান স্ব-পরিবারে এলাকা ছেড়ে চলে যান বলে জানান স্থানীয়রা। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৫ অক্টোবর তৎকালীন আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আশরাফুল আলম প্রকল্পের কাজের উদ্বোধন করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজের শুরুতেই প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তৎকালীন ইউএনও প্রকল্পের ব্যয় পর্যালোচনা করে তা কমিয়ে আনেন। এতে ঠিকাদার ক্ষুব্ধ হয়ে কাজ বন্ধ করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর পুনরায় কাজ শুরু হলে নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়রা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানালেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ঠিকাদারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় ইচ্ছেমতো কাজ করা হয়েছে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামান খাঁন এবং সদ্য বিদায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ জাফর আরিফ চৌধুরীকে জানানো হলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেননি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
এরই মধ্যে রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুরে লেকের পানির ওপর পিলারের মাধ্যমে নির্মাণাধীন ওয়াকওয়ের আরসিসি ডেক প্ল্যাটফর্মের একটি অংশ ধসে পড়ে। এতে নির্মাণকাজের মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন সেখানে জড়ো হন। পরে ঠিকাদারের লোকজন ধসে যাওয়া অংশটি পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেন বলে জানা গেছে।
এ সময় সাংবাদিকরা ধসে পড়া আরসিসি ডেক প্ল্যাটফর্মের ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে ঠিকাদার মতিয়ার রহমানের ম্যানেজার শ্যামল চন্দ্র, ব্যক্তিগত সহকারী পান্নু মোল্লা ও তাদের সহযোগীরা ছবি তুলতে বাধা দেন এবং অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ করেছেন সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম, নাসরিন শিপু, মিথুন কর্মকার ও রাসেল।
স্থানীয় শাহীন, নুরুল ইসলাম ও সাইদুজ্জামান বলেন, শুরু থেকেই ঠিকাদার নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে কাজ করছেন। এ নিয়ে আমরা কয়েকবার ইউএনওকে জানিয়েছি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখন নির্মাণাধীন আরসিসি ডেক প্ল্যাটফর্মের অংশ ধসে পড়ায় কাজের মান নিয়ে আমাদের অভিযোগের সত্যতা সামনে এসেছে। দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইসলাম ব্রাদার্সের মালিক মো. খাইরুল আজাদ বলেন, লাইসেন্স দিয়েছি, এটা সত্য। কিন্তু কাজ করেন সাবেক মেয়র মতিয়ার রহমান। ওইখানে আমার কিছুই নেই। আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না।
অভিযোগের বিষয়ে আমতলী উপজেলা নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মো. মতিয়ার রহমানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
আমতলী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মশিউর রহমান আরসিসি ডেক প্ল্যাটফর্মের একটি অংশ ধসে পড়ার কথা স্বীকার করে বলেন, মূল পিলার বা পাইলিংয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। সেন্টারিংয়ের কাঠ বা ঠেলা (সাপোর্ট) খুলে যাওয়ার কারণে ঢালাইয়ের অংশটি কিছুটা ধসে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, যে অংশটিতে সমস্যা হয়েছে, সেটির কাজ আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।
আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরটিভি/এমএম




