
কাঁচির চেনা খটখট শব্দ নেই, নেই কোনো চিরুনি বা আধুনিক সরঞ্জাম। হাতের একমাত্র সম্বল একটি ধারালো ব্লেড। ডান হাতে ব্লেড আর বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলীকে পরম দক্ষতায় চিরুনি বানিয়ে গত ৩৫ বছর ধরে একের পর এক মানুষের চুল কেটে যাচ্ছেন আবেদ তেলি। বিনিময়ে কোনো টাকা নেন না, চান না কোনো পারিশ্রমিক। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার রনজিতেশ্বর গ্রামের দরিদ্র ও অসচ্ছল মানুষের কাছে তিনি কেবল একজন নরসুন্দর নন; বরং এক পরম নির্ভরতার ঠিকানা।
নাম আবেদ তেলি। নিজের জীবনটাই যেখানে অভাব-অনটনের সমীকরণে বাঁধা, সেখানে অন্যের মুখে হাসি ফোটানোই তার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ। পেশায় ছোট এক দোকানদার আবেদ তেলি বাইসাইকেলে চেপে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফলগাছে ওষুধ দেওয়ার কাজ করেন। এই সামান্য আয়েই টেনেটুনে চলে তার নিজের সংসার। তবে নিজের সীমিত সাধ্যের মধ্যেও মানুষের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে সময় ও শ্রম দেওয়াকে তিনি আত্মতৃপ্তির এক স্বর্গীয় মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
প্রতিদিনই কোনো না কোনো মানুষের চুল কেটে দেন আবেদ তেলি। বিশেষ করে অর্থের অভাবে যাদের সেলুনে যাওয়ার সামর্থ্য নেই, তাদের মূল ভরসা তিনি। কারও চুল একটু বড় হয়ে গেলেই নিজে থেকে ডেকে এনে চুল কেটে দেওয়ার পরামর্শ দেন। শুধু চুল কাটাই নয়, মানুষকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, নিয়মিত নখ কাটা ও পরিপাটি জীবনযাপনের বিষয়েও নিরলসভাবে সচেতন করে যাচ্ছেন এই গুণী মানুষটি।
এই নিঃস্বার্থ সেবার নেপথ্যে রয়েছে ৪৫ বছর আগের এক হৃদয়বিদারক গল্প। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া সমাজে যেখানে স্বার্থ ছাড়া কিছু ভাবাই কঠিন, সেখানে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার রনজিতেশ্বর গ্রামের আবেদ তেলি এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
মানুষের পাশে দাঁড়াতে কোটি টাকার প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন কেবল একটি মহৎ ও উদার হৃদয়ের। আবেদ তেলির এই মানবসেবা নজর কেড়েছে সর্বস্তরের মানুষের। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। তার এই মানবিক উদ্যোগ সমাজের অন্যদেরও ভালো কাজে উৎসাহিত করতে পারে। আবেদ তেলির মতো মানুষের এমন উদ্যোগ সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব বাড়াতে সাহায্য করবে। প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষের জন্য তার এই সেবা অনন্য উদাহরণ।
আবেদ আলি তেলি বলেন, ‘প্রায় ৪৫ বছর আগে গ্রামের এক হতদরিদ্র ছেলে টাকার অভাবে চুল কাটাতে পারছিল না। বিনা টাকায় প্রথম ব্লেড দিয়ে তার চুল কেটে দিই। তারপর থেকে সময়-সুযোগ পেলেই বিনা পারিশ্রমিকে নিজ গ্রাম ও অন্য গ্রামের লোকজনের চুল কেটে দিচ্ছি।’
স্থানীয় বাসিন্দা ও কুড়িগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘নিজে অভাবের মধ্যে থেকেও অন্যের উপকার করার যে মানসিকতা আবেদ তেলির রয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।’
স্থানীয় বাসিন্দা আকবর আলী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। তার এই মানবিক উদ্যোগ সমাজের অন্যদেরও ভালো কাজে উৎসাহিত করতে পারে।’
রাজারহাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এস এম হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আবেদ তেলি ব্লেড দিয়ে মানুষের চুল কাটেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, অসহায় ও দরিদ্রদের বিনা মূল্যে চুল কেটে দেন। আবার যারা যেভাবে শৌখিনতা পছন্দ করেন, তিনি সেভাবেই তাদের চুল কেটে দেন। তার এই সেবার পরিধি বাড়াতে সরকারি সহযোগিতার জন্য আমাদের কাছে আবেদন করলে তাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।’
আরটিভি/এমএইচজে


