
দেশের জন্য বাবা জীবন দিয়েছেন। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও আমরা শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি পাইনি। নিজের একটা ঘরও হয়নি। কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন শহীদ সুরোজ আলীর ছেলে মো. ইসমাইল। তার মতোই দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে স্বজন হারানোর বেদনা, অভাব-অনটন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপেক্ষায় দিন কাটছে নওগাঁর মান্দা উপজেলার পাকুড়িয়ার গ্রামে ১২৮ শহীদ পরিবারের।
শহীদ পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ৫৫ বছরে সরকারি সহায়তা বলতে তারা পেয়েছেন দুই বার নামমাত্র কিছু কম্বল এবং একবার ৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা। এর বাইরে নিয়মিত কোনো বিশেষ সহযোগিতা কিংবা শহীদ পরিবারের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি তারা পাননি। ফলে দেশের জন্য জীবন দেওয়া স্বজনদের পরিবারগুলোর অনেকেই এখনো চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।
জানা গেছে, ১৯৭১ সালের ২৮ আগস্ট। মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়াল দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞে প্রাণ হারান পাকুড়িয়া ও আশপাশের এলাকার ১২৮ জন নিরীহ মানুষ। মুহূর্তের মধ্যে রক্তে রঞ্জিত হয় পাকুড়িয়া এলাকা। স্বজন হারিয়ে অসংখ্য পরিবারে নেমে আসে শোক ও দুর্দশা। সেই বেদনার ৫৫ বছর পরও শহীদ পরিবারগুলোর অনেকেই পাননি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কিংবা কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা।
সরেজমিনে পাকুড়িয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় দুই বিঘা জমির ওপর ১২৮ শহীদের গণকবর ও বধ্যভূমির স্মৃতি সংরক্ষিত রয়েছে। অথচ যাদের আত্মত্যাগে দেশ স্বাধীন হয়েছে, তাদের স্বজনদের অনেকের জীবন এখনো অভাব-অনটনে কাটছে। কেউ ছোট্ট সেলুন খুলে জীবিকা নির্বাহ করছেন, কেউ টিনের ঘরে ভাড়া থাকছেন। আবার কেউ খাসজমিতে ঘর তুলে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন। বয়স্ক ও অসুস্থ শহীদ পরিবারের সদস্যদের কেউ কেউ অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও নিতে পারছেন না।
প্রত্যক্ষদর্শী প্রবীণ মো. মমতাজ বলেন, ১৯৭১ সালে ২৮ আগস্ট পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তার বাবাকে লক্ষ্য করে বন্দুক তাক করেছিল। তখন তার বাবা প্রাণভিক্ষা চেয়ে বলেছিলেন, আমি তো মুক্তিযোদ্ধা নই। কিন্তু হানাদাররা তার কথায় কর্ণপাত করেনি। মুহূর্তের মধ্যেই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর একে একে তার চাচা ও পাশে বসে থাকা সমবয়সী এক তরুণের ওপরও গুলি চালানো হয়। তারাও ঘটনাস্থলেই মারা যান।
মমতাজ বলেন, তাকেও লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছিল। তবে দ্রুত মাটিতে মাথা নিচু করে ফেলায় প্রাণে বেঁচে যান তিনি। ওই ঘটনার পর পুরো এলাকায় নেমে এসেছিল বিভীষিকা ও হাহাকার। শহীদদের পরিবারগুলো স্বজন হারিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। অনেক পরিবার জীবিকা নির্বাহের জন্য ভিক্ষাবৃত্তির মতো পথও বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, ৫৫ বছর ধরে তেমন কোনো সরকারি সাহায্য-সহানুভূতি পাইনি। কয়েকবার একটি-দুটি কম্বল আর একবার ৫ হাজার টাকা ছাড়া তেমন কোনো সহায়তা দেওয়া হয়নি। শহীদ পরিবার হিসেবে আমাদের স্বজনদের সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
শহীদ সুরোজ আলীর ছেলে মো.ইসমাইল বলেন, ১৯৭১ সালের গণহত্যায় যে ১২৮ জন শহীদ হয়েছিলেন, সেই তালিকায় ২২ নম্বরে আমার বাবার নাম আছে। আমার বাবা এই দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। বাবা শহীদ হওয়ার পর আমার মা মানুষের কাছে চেয়েচিন্তে আমাকে বড় করেছেন।
তিনি আরও বলেন, এখন আমার বয়স ৬৫ বছর পার হয়েছে। কিন্তু এতদিনেও আমাদের নিজেদের একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়নি। এখনো মানুষের টিনের বাড়িতে ভাড়া থাকি। এই ভাড়া বাড়িতে থেকেই কোনোমতে অভাব-অনটনের মধ্যে দিন পার করছি। আজ পর্যন্ত কোনো সরকারি সাহায্য বা সহযোগিতা পাইনি।
শহীদ পরিবারের নাতি মো. মামুন বলেন, আমার নানা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই দেখছি, আমার বাবা-চাচারা কত কষ্ট করে সংসার চালিয়েছেন। আমি বর্তমানে ছোট্ট একটি সেলুন নিয়ে বসে থাকি। আমরা শহীদের রক্ত বহন করছি, কিন্তু আজ পর্যন্ত শহীদ পরিবার হিসেবে কোনো স্বীকৃতি বা সহযোগিতা পাইনি।
তিনি আরও বলেন, আমরা বড় কিছু চাই না। শুধু চাই, আমাদের দাদার নামটি সরকারি তালিকায় সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হোক এবং শহীদ পরিবারের মর্যাদাটুকু দেওয়া হোক।
পাকুড়িয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. উজির উদ্দিন প্রামাণিক বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময় ওপারে (ভারতে) ছিলাম। সেখান থেকেই জানতে পারি উপজলেলার পাকুড়িয়ায় গ্রামে ১২৮ জন মানুষকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করেছে।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর শহীদ পরিবারের সদস্যদের ডেকে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় প্রতিটি শহীদ পরিবারের জন্য ৫ হাজার টাকা করে অনুমোদন করা হয় এবং তাদের হাতে ওই টাকা তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু এরপর থেকে আর কোনো আর্থিক বা সামাজিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, আজও শহীদ পরিবারের মানুষ খুব কষ্টের মধ্যে দিনযাপন করছেন। অনেকে কঠোর পরিশ্রম করে জীবন চালাচ্ছেন। তাদের অনেকের থাকার মতো ভালো ঘরবাড়িও নেই।
নওগাঁর স্থানীয় সংগঠন একুশে পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক এম. এম. রাসেল বলেন, একুশে পরিষদ নওগাঁর পক্ষ থেকে পাকুড়িয়া গণহত্যা দিবসের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কারা শহীদ হয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কাজ করে ইতিহাস নথিবদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিবছর ২৮ আগস্ট শহীদ পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে দিবসটি পালন করা হয়।
তিনি বলেন, শহীদ পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। মানবিক দৃষ্টিতে বিষয়টি বিবেচনা করে তাদের আর্থিক সহায়তা, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং সুরক্ষায় সরকারি প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন।
ভারশোঁ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান সুমন বলেন, পাকুড়িয়ার ১২৮ শহীদ পরিবারের মধ্যে যারা বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে প্রাপ্য ভাতা পেতে তাদের সহযোগিতা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, তবে শহীদ পরিবারের প্রধান দাবি হলো, বীর মুক্তিযোদ্ধারা যেভাবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন, ঠিক সেভাবেই ১২৮ শহীদ পরিবারের স্বজনদেরও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। বিষয়টি ইতোমধ্যে সংসদ সদস্য মহান সংসদে উত্থাপন করেছেন।
তিনি আরও বলেন, এমপি মহোদয় অচিরেই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীকে পাকুড়িয়া শহীদ বাজারে এনে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার উদ্যোগ নেবেন বলে তারা আশা করছেন। বর্তমান সরকারের মাধ্যমে শহীদ পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
এদিকে পাকুড়িয়ার ১২৮ শহীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়টি জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন নওগাঁ-৪ (মান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ডা. ইকরামুল বারী টিপু।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৮ আগস্ট বিকেলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মান্দা উপজেলার পাকুড়িয়া ও বিলউথরাইল এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে ধরে এনে পাকুড়িয়া ইউনাইটেড উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জড়ো করে। পরে সেখানে ব্রাশফায়ার চালানো হলে ১২৮ জন নিরীহ মানুষ শহীদ হন। এ ঘটনায় শত শত মানুষ আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
এমপি টিপু বলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরও এই ১২৮ শহীদকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বা স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত তাদের নাম শহীদ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।
এ ছাড়া শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে বধ্যভূমির ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানকে সরকারি করার দাবি জানান তিনি। আহত ও পঙ্গুত্ব বরণকারী ব্যক্তি এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থান ও আর্থিক সহযোগিতার জন্য এলাকায় কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
এ বিষয়ে মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা.আতিয়া খাতুন বলেন, আমি গত ৮ সেপ্টেম্বরে মান্দা উপজেলায় প্রথম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মদিবস শুরু করেছি। আপনাদের মাধ্যমেই জানতে পারলাম, মান্দা উপজেলার ভারশোঁ ইউনিয়নের পাকুড়িয়া নামক স্থানে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ১২৮ জন নিহত ও শহীদ হয়েছেন এবং সেখানে ১২৮ জনের একটি গণকবর রয়েছে।
তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমি নিজে সেখানে গিয়ে সরেজমিনে দেখব এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
আরটিভি/এমএম


