
ফরিদপুরের সদরপুরে পরকীয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এক প্রবাসীর স্ত্রীকে মারধর করে জোরপূর্বক চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে দুই যুবকের বিরুদ্ধে। একই ঘটনায় রনি নামে এক যুবককে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নারীকে চুল কাটার এবং যুবককে বেঁধে নির্যাতনের দুটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
রোববার (১১ অক্টোবর) উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বেপারিডাঙ্গী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী নারী মুক্তা আক্তার (৩৫) ওই গ্রামের সৌদিপ্রবাসী রাজিব বেপারির স্ত্রী। অন্যদিকে নির্যাতনের শিকার যুবকের নাম রনি (৩০)।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তাকে একটি চেয়ারে বসিয়ে রেখে তার হাত ধরে আছেন এক যুবক। এ সময় আরেক যুবক কাঁচি দিয়ে তার চুল কেটে দিচ্ছেন। এ সময় মুক্তাকে চিৎকার করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে তাকে চড় মারার দৃশ্যও ভিডিওতে রয়েছে।
অন্য ভিডিওতে রাতে রনিকে একটি গাছের সঙ্গে রশি দিয়ে বেঁধে মারধর করতে দেখা যায়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অভিযুক্ত দুই যুবক সুমন হোসেন ও জয় হোসেন। তারা কৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ইউসুফ বেপারির নাতি।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, শনিবার (১০ অক্টোবর) বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে আসেন মুক্তা। ওই রাতে তার কক্ষে রনিকে প্রবেশ করতে দেখে পরিবারের সদস্যরা দুজনকে আটক করেন। পরদিন বিকেলে মুক্তাকে তার বাবার বাড়ির লোকজনের কাছে এবং রনিকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগে তাদের নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।
মুক্তার বাবা শেখ মুসা অভিযোগ করেন, পারিবারিক বিরোধের জেরে তার মেয়েকে নির্যাতন করা হয়েছে।
তার দাবি, মেয়ের শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। রনির কাছে তার পাঁচ হাজার টাকা পাওনা ছিল। সেই টাকা ফেরত দেওয়ার জন্যই রনি মুক্তার কাছে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের আটকে রেখে মারধর করা হয় এবং মেয়ের চুল কেটে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে তার মেয়ের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। বর্তমানে মুক্তা ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ঘটনায় তিন মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
মুক্তার মা নাসিমা বেগম বলেন, তার মেয়ের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা আইনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা উচিত ছিল। এভাবে মারধর করে প্রকাশ্যে চুল কেটে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।
মুঠোফোনে মুক্তা আক্তার জানান, তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে তাকে ফাঁসানো হয়েছে। শ্বশুর-শাশুড়ি মিলে পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। জোর করে চুল কেটে দেওয়ার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার চান তিনি।
তবে মুক্তার শ্বশুর সোহরাব বেপারি তার পুত্রবধূর বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও একাধিক পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ করেন। তার ভাষ্য, ঘটনার দিন মুক্তাকে রনির সঙ্গে হাতেনাতে আটক করা হয়। পরে স্থানীয় লোকজন রনিকে মারধর করেন এবং মুক্তার চুল কেটে দেন।
মুক্তার শাশুড়ি সাহানা বেগমও পুত্রবধূর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ করেন। তার দাবি, ছেলে বিদেশে থাকার সুযোগে মুক্তা মাদক সেবন ও অন্য পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিকবার নিষেধ করেও তাকে নির্বৃত্ত করা যায়নি।
অন্যদিকে রনি দাবি করেন, পাওনা টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য তিনি মুক্তার কাছে গিয়েছিলেন। সেখানে তাকে আটকে রেখে দড়ি দিয়ে বেঁধে মারধর করা হয়। মুক্তার সঙ্গে কোনো অবৈধ সম্পর্ক কিংবা মাদক সেবনের অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি।
রনির বাবা সৈয়দ শেখ জানান, তার ছেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়। ছেলেকে মারধরের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
রনির মা সিমা বেগম বলেন, ছেলেকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধরের খবর পেয়ে তারা তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। পরে তার প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। অভিযোগ থাকলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল।
অভিযুক্ত সুমন ও জয় হোসেনের দাদা ইউসুফ বেপারি জানান, ঘটনার খবর পেয়ে তিনি ওই বাড়িতে যান। পরদিন মুক্তার বাবা এলে তার মেয়েকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় এবং রনিকে তার বাবার কাছে হস্তান্তর করা হয়। মুক্তার বাড়িতে বিভিন্ন লোকের যাতায়াত নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। তবে চুল কাটার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত সুমন হোসেন ও জয় হোসেনের বাড়িতে গেলে তাদের পাওয়া যায়নি।
সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আল মামুন শাহ জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তারা ঘটনাটি জানতে পেরেছেন। তবে এ বিষয়ে বাদীপক্ষের কাছ থেকে এখনো কোনো অভিযোগ পাননি।
তিনি বলেন, কারও বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বেআইনি এবং এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
আরটিভি/এমএইচজে


