
এক বছরও পার হয়নি বাবা মারা গেছেন। সেই পিতৃহারা শোক কাটতে না কাটতেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকেও হারালো তারা। রাতে যে ভাইয়ের সঙ্গে স্বাভাবিক ফোনালাপ হলো, সকালেই এলো তার মৃত্যুর খবর। নাটোরের মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন শরীয়তপুরের জাজিরার ব্যবসায়ী জুয়েল মাদবর। তার এই আকস্মিক প্রয়াণে পুরো পরিবারটি এখন চরম দিশেহারা ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাতেও বড় ভাই শাহজাহান মাদবরের সঙ্গে কথা হয়েছিল জুয়েলের। ব্যবসার কাজে কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন—সবই জানিয়েছিলেন তিনি। বড় ভাই জানতে চেয়েছিলেন নাটোর যাবেন কী উপায়ে। জবাবে জুয়েল বলেছিলেন, সবাই একসঙ্গে পদ্মা সেতুর গোড়া থেকে বাসে উঠবেন। কিন্তু সেই ফোনালাপের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় আসে নির্মম দুঃসংবাদ—নাটোরে সড়ক দুর্ঘটনায় জুয়েল আর নেই।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোরে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া এলাকার নাটোর-পাবনা মহাসড়কের সরকারপাড়ায় যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় জুয়েল মাদবরসহ জাজিরার পাঁচ ব্যবসায়ী নিহত হন। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আহত হয়েছেন আরও অনেকে।
নিহত জুয়েল মাদবরের বড় ভাই শাহজাহান মাদবর চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন, গত রাতে জুয়েল ফোন করে বলল ভুট্টা কিনতে নাটোর যাবে। কীভাবে যাবি জানতে চাইলে বলল, সবাই মিলে পদ্মা সেতুর গোড়া থেকে বাসে উঠবে। সকালে ফোন পেয়ে শুনি ভাই আর নাটোরে মারা গেছে! রাতে যে ভাইয়ের সঙ্গে কথা হলো, সকালে শুনলাম সে আর নেই—এই বাস্তবতা কীভাবে মেনে নেব?
জীবিকার তাগিদে নাটোরের তাহেরপুর থেকে ভুট্টা কিনে ফেরাই ছিল জুয়েলের উদ্দেশ্য। কিন্তু সেই যাত্রা আর শেষ হলো না। বাড়িতে জীবিত ফেরার বদলে পৌঁছাল তার মৃত্যুর সংবাদ।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে আদর করে গেছেন চার বছরের মেয়ে রিদিতা ও দুই বছরের ছেলে সাইফানকে। কথা দিয়েছিলেন, ফেরার পথে তাদের জন্য চকলেট নিয়ে আসবেন। ছোট্ট দুই শিশুর কাছে বাবার সেই প্রতিশ্রুতিই ছিল আনন্দের অপেক্ষা। তারা এখনো অবুঝ। বাবার ফেরা না-ফেরার সমীকরণ বোঝার বয়স তাদের হয়নি। মা ও স্বজনদের কাছে অবুঝ শিশুরা বারবার প্রশ্ন করছে, ‘বাবা কই, মা কখন আসবে?’
পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় এক বছর আগে জুয়েলের বাবা মারা যান। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম জুয়েলকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে পুরো পরিবারটি। গত দুই দশক ধরে জাজিরার কাজিরহাট এলাকায় ভুসামাল ও রড-সিমেন্টের ব্যবসা করে আসছিলেন জুয়েল। তার ওপরই নির্ভরশীল ছিল পুরো সংসারের চাকা ও দুই শিশুর ভবিষ্যৎ।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় জুয়েল মাদবর ছাড়াও জাজিরা উপজেলার আরও চার ব্যবসায়ী প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতরা হলেন—ডুবিসায়বর মোল্যাকান্দি এলাকার সালাল মোল্যা (জাহান উদ্দিন মোল্যার ছেলে), ডুবিসায়বর কাজিরহাট এলাকার সোহাগ শিকদার (ইউনুস শিকদারের ছেলে), কাজিরহাট এলাকার ভুসামাল ব্যবসায়ী সামাদ ফকির এবং পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া এলাকার হলুদ ব্যবসায়ী শাহিন বেপারী (রাজ্জাক বেপারীর ছেলে)।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তারা সবাই দীর্ঘদিন ধরে কাজিরহাট বাজারসহ আশপাশের এলাকায় সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করছিলেন। রাজশাহী ও নাটোরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন ও ধনিয়াসহ কৃষিপণ্য কেনার পরিকল্পনা নিয়ে তারা একসঙ্গে রওয়ানা হয়েছিলেন।
দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া এক যাত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, যাত্রাবিরতির পর বাসটির গতি অনিয়ন্ত্রিত ছিল। চালক তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকায় যাত্রীরা তাকে সতর্ক করে গতি কমানোর অনুরোধ জানালেও তা রক্ষা হয়নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে।
একসঙ্গে পাঁচজন স্থানীয় উদ্যমী ব্যবসায়ীকে হারিয়ে জাজিরা জুড়ে এখন শোকের মাতম। পরিবারগুলোর কান্না আর আহাজারিতে কাজিরহাট এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
আরটিভি/টিআর


