
তারা কখনও ‘জিনের বাদশা’, কখনও তান্ত্রিক-কবিরাজ আবার কখনও আবার কখনও পরিচিতজনের পরিচয়ে বিশ্বাস অর্জন করে প্রতারণা- এভাবেই মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে কথিত দুই জিনের বাদশাতে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে ফরিদপুর পিবিআই কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম। ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর রাজবাড়ী সদর থানায় দায়ের করা একটি মামলার সূত্র ধরে চক্রটিকে শনাক্ত করা হয় বলে তিনি জানান। মামলাটি করেন রাজবাড়ী সদর থানার বিনোদপুর এলাকার চাল ব্যবসায়ী রশিদুল ইসলাম।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে সুমন (২৬) নামে একজন প্রতিবন্ধী যুবককে (একটি পা নেই) ব্যবহার করা হতো বিকাশের দোকান থেকে টাকা সংগ্রহ করার জন্য। যিনি ক্রেচারে ভর করে সারাদেশে ছুটে টাকা সংগ্রহ করতেন। দীর্ঘ ৮ মাসের অনুসন্ধানে গোয়েন্দা নজরদারিতে সুমনকে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসে তাদের প্রতারণার বহুমুখী ফাঁদের তথ্য।
সুমন ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন থানার ফুলকাচিয়া গ্রামের মৃত মোসলেম হাওলাদারের ছেলে। ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চালানোর পাশাপাশি অনলাইন প্রতারণা, জুয়াসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন।
সুমনকে গ্রেপ্তারের পর চক্রের প্রধান সদস্য একই থানার মূলপাইততন গ্রামের রমজান মিয়ার ছেলে মো. রাজিবকে (২৮) গ্রেপ্তারের করা হয়।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) একই থানার কুঞ্জেরহাট বাজারের আশপাশ থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের সাথে আরও তিনজন সক্রিয় সদস্য রয়েছেন বলে পিবিআই জানিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত তুলে ধরে পিবিআই পুলিশ সুপার জানান, ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ চক্রটির ফাঁদে পড়েন রশিদুল ইসলাম। বিজয় বাবু নামে তার পরিচিত এক ব্যবসায়ীর মোবাইল নম্বর ক্লোন করে চক্রটি। এরপর তাকে ফোন করে জরুরি টাকার প্রয়োজন জানিয়ে সুলভ মূল্যে ৩৩ টন চাল বিক্রির কথা জানান চক্রটির এক সদস্য। যা বিকেল ৪টার মধ্যে পৌঁছে যাবে বলে জানানো হয়। বিজয় বাবুর সঙ্গে পূর্বে ব্যাবসায়িক লেনদেন থাকায় প্রস্তাব মেনে নেন রশিদুল।
এরপর চক্রটির দেওয়া বিকাশ ও নগদ নম্বরে ওইদিন দুপুরে প্রথমে ৫০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দিতেন। আরও কয়েক দফায় আটটি নম্বরের নগদ ও বিকাশে মোট ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলে বিজয় বাবুর অফিসে গিয়ে যোগাযোগ করেন। তখন জানতে পারেন-বিজয় বাবুর সঙ্গে ঘটনাটি নিয়ে তার কখনও কথা হয়নি এবং বুঝতে পারেন প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
এরপর রাজবাড়ী সদর থানায় মামলা করেন তিনি। ওই মামলায় ৮ মাস তদন্ত করে কোনো আসামি গ্রেপ্তার না করেই ঘটনাটি তুলে ধরে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। এরপর আদালতের নির্দেশে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব দেওয়া হয় ফরিদপুর পিবিআইকে। মামলাটি তদন্ত করেন উপপরিদর্শক (এসআই) মাজিদুল হক খান।
পুলিশ সুপারের ভাষ্যমতে, সারাদেশেই চক্রটির নেটওয়ার্ক রয়েছে। তাদের চক্রে পাঁচজন সদস্য রয়েছেন। যাদের মধ্যে সুমন বিভিন্ন বিকাশ ক্যাশ আউট পয়েন্ট থেকে প্রতারণার টাকা সংগ্রহ করতেন। অন্যরা ভুক্তভোগীদের তথ্য ও মোবাইল নম্বর এবং বিকাশ নম্বরের তথ্য সংগ্রহ করতেন।
মামলার তদন্তকালে গোয়েন্দা তথ্য, তথ্য প্রযুক্তি, নির্ভরযোগ্য সোর্সের মাধ্যমে সুমনের তথ্য বেরিয়ে আসে। এরপর তার গতিবিধি লক্ষ্য করা হয় এবং হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তাদের নানামুখী প্রতারণার কথা স্বীকার করেছেন। যাদের প্রতারণার কৌশল ছিল বিচিত্র।
গ্রেপ্তাদের বরাত দিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, কখনো ‘জিনের বাদশাহ’ পরিচয়ে গভীর রাতে, বিশেষ করে নারীদের ফোন করত চক্রের সদস্যরা। মোবাইলের পাশে অদ্ভুত শব্দ করে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করত। এরপর ভুক্তভোগীর মনে মূল্যবান জিনিসপত্র হারানো কিংবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আতঙ্ক তৈরি করে সেই বিপদ থেকে মুক্তির উপায়ের আশ্বাস দিত। পরে ভয় ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে হাতিয়ে নিত টাকা।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তান্ত্রিক ও স্বনামধন্য কবিরাজ পরিচয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে কঠিন ও গোপন রোগের সমাধান, প্রেমে সফলতা, দাম্পত্য জীবনে সুখসহ নানা সমস্যার সমাধানের প্রলোভন দেখাত বলে পুলিশ সুপার উল্লেখ করেন।
পুলিশ সুপার বলেন, গ্রেপ্তার দুজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া জড়িত অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানান পুলিশ সুপার।
আরটিভি/এমএ




