
সবুজে মোড়ানো মাঠ। বাতাসে দুলছে আমন ধানের গাছ। ধানগাছে শীষ আসার অপেক্ষায় বুক বেঁধেছেন কৃষক। সেচ, সার, শ্রম আর পরিচর্যায় গড়ে তোলা সেই স্বপ্নের ফসল ঘরে তোলার দিন গুনছেন তারা। কিন্তু মাঠের সবুজের আড়ালে এখন দুশ্চিন্তার কালো ছায়া। রাতের আঁধারে হানা দিচ্ছে ইঁদুর। ধারালো দাঁতে কেটে ফেলছে ধানগাছের গোড়া। কৃষকের চোখের সামনে নষ্ট হচ্ছে সম্ভাবনাময় ফসল, আর দুলতে থাকা সোনালি স্বপ্নে ভর করছে অনিশ্চয়তা।
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলায় চলতি মৌসুমে আমন ধানের খেতে ইঁদুরের উপদ্রব কৃষকদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। বাড়তি খরচ করে সেচ দেওয়া, জমি তৈরি, চারা রোপণ ও পরিচর্যার পর এখন যখন ভালো ফলনের আশায় বুক বাঁধার কথা, তখনই ইঁদুরের আক্রমণে সেই আশায় পড়ছে ভাটা। জমির মালিকের সঙ্গে ফসল ভাগাভাগি করে নেওয়ার হিসাবেও এখন যেন তৃতীয় ভাগ বসিয়েছে ইঁদুর। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কণ্ঠে তাই আক্ষেপ, চোখেমুখে উদ্বেগ। তাদের দাবি, ইঁদুর দমনে কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে পাশে দাঁড়াক কৃষি বিভাগ।
ডাকাতিয়া নদীর পাড়ের কৃষিপ্রধান জনপদ ফরিদগঞ্জ। এ উপজেলার মানুষের জীবন-জীবিকার বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে কৃষি। প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। ফলে মাঠের ফসল ভালো হওয়া মানে শুধু কৃষকের মুখে হাসি ফোটা নয়, অনেক পরিবারের সারা বছরের খাদ্য ও জীবিকার নিশ্চয়তা।
এবারের আমন মৌসুমেও সেই প্রত্যাশা নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন কৃষকেরা। কেউ নিজের জমিতে, কেউবা অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেছেন। অনেকেই বাড়তি খরচ করে সেচ দিয়েছেন। পরিচর্যায় রেখেছেন বাড়তি মনোযোগ। ধানগাছের বেড়ে ওঠা দেখে তাদের মনে জেগেছিল ভালো ফলনের স্বপ্ন। কিন্তু কিছু এলাকায় পোকামাকড়ের আক্রমণের পাশাপাশি ইঁদুরের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় সেই স্বপ্ন এখন শংকার মুখে।
কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ফরিদগঞ্জ উপজেলায় ৮ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিআর-২২, বিআর-২৩, ব্রি ধান-৮৭, ব্রি ধান-৪৯, ব্রি ধান-৫১ ও হাইব্রিড জাতের ধান। বিস্তীর্ণ এই আবাদি জমির কোনো কোনো অংশে ইঁদুরের আক্রমণ কৃষকদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
হর্নি দুর্গাপুর গ্রামের কৃষক ছলেমানের চোখেমুখে এখন উৎকণ্ঠা। নিজের ২০ শতাংশ জমির পাশাপাশি আরও ১০ শতাংশ জমি বর্গা নিয়ে আমন আবাদ করেছেন তিনি। জমিতে ধানের ডগা বেরিয়েছে। ভালো ফলনের আশায় বাড়তি খরচ করে সেচও দিয়েছেন। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে ইঁদুরের আক্রমণে তার সেই আশায় ভাটা পড়েছে। ছলেমান বলেন, ধানের ডগা বেরিয়েছে। বাড়তি খরচ করে খেতে পানি দিচ্ছি। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে ইঁদুরের আক্রমণ দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ করেও কাজ হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছি।
একই দুশ্চিন্তা ইসলামপুর গ্রামের কৃষক ইউসুফ মিয়ারও। অন্যের ২০ শতাংশ জমি বর্গা নিয়ে আমন চাষ করেছেন তিনি। জমির মালিকের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, উৎপাদিত ধান দুই ভাগে ভাগ হওয়ার কথা। ধানগাছের বেড়ে ওঠা দেখে ভালো ফলনের আশাও করেছিলেন। কিন্তু ইঁদুরের আক্রমণ তার হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিচ্ছে।
ইউসুফ মিয়ার কণ্ঠে আক্ষেপ, জমির মালিক আর আমি দুই ভাগে ফসল ভাগ করে নিতাম। এখন মাঝখানে ইঁদুর তৃতীয় ভাগ বসিয়েছে। ইঁদুরের আক্রমণে অনেক ক্ষতি হচ্ছে। ইঁদুর দমনে কৃষি বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়াক।
কৃষকের এই কথায় যেন ফুটে ওঠে মাঠের বাস্তবতা। ফসলের পেছনে শ্রম দেন কৃষক, বিনিয়োগ করেন অর্থ; কিন্তু ফসল ঘরে তোলার আগেই ক্ষতির মুখে পড়লে সেই লোকসানের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বর্গাচাষিদের জন্য ক্ষতির বোঝা আরও উদ্বেগের, কারণ উৎপাদিত ফসলের ভাগ দিতে হয় জমির মালিককেও। কমলকান্দি গ্রামের কৃষক হারুনুর রশিদের দুশ্চিন্তার কারণও সেই ইঁদুর। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ধানগাছ থেকে শীষ বের হওয়ার সময়ই ইঁদুর গাছ কেটে ফেলে দিচ্ছে। প্রতিকূলতার মধ্যেও ভালো ফলনের আশায় জমিতে নিবিড় পরিচর্যা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু ইঁদুরের আক্রমণ তার সেই পরিশ্রমের ফল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
হারুনুর রশিদ বলেন, এ বছর ভালো ফলনের জন্য অনেক কষ্ট করে জমিতে ধানের পরিচর্যা করছি। কিন্তু ইঁদুরের আক্রমণে আমাদের স্বপ্ন ভেস্তে যেতে বসেছে। ইঁদুর দমনের দাবিতে কৃষি কর্মকর্তাদেরও দেখা মিলছে না। ইঁদুরের আক্রমণ ঠেকাতে কৃষকেরা বিভিন্ন উপায়ে চেষ্টা চালাচ্ছেন। কেউ কীটনাশক প্রয়োগ করছেন, কেউ আবার বাঁশের তৈরি ডোঙা ফাঁদ পেতে ইঁদুর নিধনের চেষ্টা করছেন। তবে তাদের অভিযোগ, এসব উদ্যোগে প্রত্যাশিত ফল মিলছে না। ফলে জমিতে ফসলের ক্ষতি ঠেকানো এবং অবশিষ্ট ধানগাছ রক্ষা করাই এখন তাদের বড় চ্যালেঞ্জ।
কৃষকের উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃষি বিভাগের জনবলসংকট। উপজেলা কৃষি বিভাগে অনুমোদিত জনবল ৪৬ জন থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৮ জন। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় জনবলের অর্ধেকেরও কম কর্মী নিয়ে চলছে কৃষিসেবা কার্যক্রম। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কল্লোল কিশোর সরকার জানান, জনবলসংকটের কারণে কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে গত কয়েক দিনের তুলনায় ইঁদুরের উপদ্রব অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এখনো কিছু এলাকায় ইঁদুরের উপস্থিতি রয়েছে।
ইঁদুরের উপদ্রব বাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, আগে এ সময়ে মাঠে বৃষ্টির পানি থাকত। জমিতে পানি থাকলে ইঁদুরের আনাগোনা তুলনামূলক কম হয়। এবার বৃষ্টি না হওয়ায় অনেক জমিতে পানি নেই। ফলে জমিতে ইঁদুরের উপদ্রব বেড়েছে। কৃষি কর্মকর্তা আরও জানান, ইঁদুর দমনে বিষটোপ প্রয়োগসহ বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে কৃষি বিভাগের কর্মীরা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। কৃষকেরা সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিলে ইঁদুরের উপদ্রব আরও কমানো সম্ভব হবে। ভালো ফলন নিশ্চিত করতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আমন মৌসুমের এই সময়ে ফরিদগঞ্জের কৃষকদের কাছে প্রতিটি ধানগাছই সম্ভাব্য খাদ্য, আয় আর পরিবারের নিরাপত্তার প্রতীক। একটি গাছ কেটে পড়া মানে শুধু জমির ক্ষতি নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কৃষকের শ্রম, বিনিয়োগ ও প্রত্যাশা। তাই ইঁদুরের আক্রমণ তাঁদের কাছে নিছক মাঠের সমস্যা নয়; এটি ফসল ঘরে তোলার নিশ্চয়তা নিয়েও বড় উদ্বেগ। একদিকে ইঁদুরের উপদ্রব, অন্যদিকে কৃষি বিভাগের সীমিত জনবল, দুইয়ের চাপে মাঠপর্যায়ে কৃষিসেবা কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কৃষকেরা চান, ক্ষতিগ্রস্ত জমি পরিদর্শন, ইঁদুর দমনে কার্যকর পরামর্শ এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের পাশে দাঁড়াক সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
ফরিদগঞ্জের মাঠে এখনো সবুজ ধানের গাছ দুলছে। কৃষকেরাও হাল ছাড়েননি। তাদের আশা, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ক্ষতি কমিয়ে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হবে। কিন্তু সেই আশাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে মাঠের সমস্যার দ্রুত সমাধান যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন কৃষকের দোরগোড়ায় কৃষিসেবা পৌঁছে দেওয়া। কারণ, আমনের মাঠে ইঁদুরের থাবা যতটা ভয় ধরাচ্ছে, তার চেয়ে বড় ভয়, সারা মৌসুমের পরিশ্রম শেষে কৃষকের ঘরে কাঙ্ক্ষিত ধান উঠবে তো?
আরটিভি/এসএস



