
বয়স মাত্র ১৪ বছর। পড়াশোনা করছে সপ্তম শ্রেণিতে। এই বয়সেই কাদামাটি দিয়ে প্রতিমা তৈরি করে সবার নজর কেড়েছে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার মানিকদাহ ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের বিপন পোদ্দার। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিজের মেধা, আগ্রহ ও সৃজনশীলতা দিয়ে একের পর এক প্রতিমা তৈরি করছে সে। ছোটবেলার শখ থেকে শুরু হওয়া এই কাজ এখন তার জীবনের বিশেষ ভালো লাগায় পরিণত হয়েছে। প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি পূজা-অর্চনা ও মন্ত্র পাঠেও তার রয়েছে বিশেষ দক্ষতা।
বিপনের প্রতিমা তৈরির হাতেখড়ি মাত্র সাত বছর বয়সে। ছোটবেলা থেকেই কাদামাটি নিয়ে খেলতে পছন্দ করত সে। খেলতে খেলতেই একদিন নিজের হাতে তৈরি করে ফেলে একটি প্রতিমা। তার তৈরি প্রতিমা দেখে প্রশংসা করেন পরিবারের সদস্যরা। সেই প্রশংসা ও উৎসাহই তাকে প্রতিমা তৈরিতে আরও আগ্রহী করে তোলে। এরপর ধীরে ধীরে নিজের চেষ্টায় তৈরি করতে থাকে বিভিন্ন দেবদেবীর প্রতিমা।
প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই পূজা-অর্চনার প্রতিও আগ্রহ জন্মে বিপনের। নিজে নিজেই শিখে নেয় পূজার নিয়মকানুন ও বিভিন্ন মন্ত্র পাঠ। পরে পরিবারের সদস্য ও পাড়ার লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে মন্দিরে পূজা করতে শুরু করে সে। তার উচ্চারিত মন্ত্রগুলোও বেশ নির্ভুল বলে জানান স্থানীয়রা। এখনো বেশিরভাগ সময় মন্দিরে পূজা-অর্চনার দায়িত্ব পালন করে বিপন। অল্প বয়সেই প্রতিমা নির্মাণ ও পূজার কাজে তার এমন পারদর্শিতা অবাক করে পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসীকে।
প্রথম দিকে ছোট ছোট প্রতিমা তৈরি করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে তার দক্ষতা ও কাজের পরিধি। একপর্যায়ে বাড়ির উঠানের এক কোণে নিজেই তৈরি করে ছোট্ট একটি মন্দির। সেখানে নিজের হাতে গড়া প্রতিমা স্থাপন করে শুরু করে পূজা-অর্চনা। তবে প্রতিমার আকার বড় হতে থাকায় একসময় ছোট মন্দিরে আর জায়গা হচ্ছিল না। পরে ঠাকুমা আলো রানী পোদ্দারের সহযোগিতায় তৈরি করা হয় বড় একটি মন্দির। এর নাম দেওয়া হয় ‘রাজাপুর পোদ্দার পাড়া মন্দির’।
মন্দিরের প্রতিমা তৈরির দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেয় বিপন। মাটি দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরি থেকে শুরু করে রং করা, কাপড় পরানো ও গহনা দিয়ে সাজানো—সব কাজই করে নিজের হাতে। কোনো প্রশিক্ষিত কারিগরের কাছে না শিখেও নিজের চেষ্টায় প্রতিমা তৈরির এই দক্ষতা অর্জন করেছে সে। তার তৈরি প্রতিমা দেখতে আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ মন্দিরে আসেন। প্রতিমার নিখুঁত গড়ন ও সাজসজ্জা দেখে প্রশংসা করেন তারা। এতে প্রতিমা তৈরির প্রতি বিপনের আগ্রহ আরও বেড়েছে।
এবার রাজাপুর পোদ্দার পাড়া মন্দিরে পাঁচ দিনব্যাপী কাত্যায়নী পূজার আয়োজন ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করছে বিপন। এ পূজার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিমাগুলো ইতোমধ্যে তৈরি করে ফেলেছে সে। এখন চলছে প্রতিমায় রং করা, কাপড় পরানো ও গহনা দিয়ে সাজানোর প্রস্তুতি। নির্ধারিত সময়ের আগেই সব কাজ শেষ হবে বলে আশা করছেন পরিবারের সদস্য ও পূজার আয়োজকেরা। তাদের প্রত্যাশা, বিপনের হাতে তৈরি প্রতিমা এবারের পূজায় দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করবে।
বিপন পোদ্দার বলে, ‘লেখাপড়ার পাশাপাশি নিজের ভালো লাগা থেকেই আমি প্রতিমা তৈরি করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন পূজার জন্য অনেক প্রতিমা বানিয়েছি। আগে ছোট প্রতিমা তৈরি করতাম, এখন বড় প্রতিমা তৈরি করি। প্রতিমা বানাতে আমার খুব ভালো লাগে। ভবিষ্যতে আরও বড় ও সুন্দর প্রতিমা তৈরির ইচ্ছা আছে।’
বিপনের বাবা বিকাশ পোদ্দার বলেন, ‘সাধারণত পাল সম্প্রদায়ের মানুষ প্রতিমা তৈরির কাজ করেন। তাদের ছোট-বড় অনেকেই এ কাজে দক্ষ। কিন্তু আমার ছেলে পাল সম্প্রদায়ের না হয়েও নিজের প্রতিভা ও আগ্রহ থেকে যেভাবে প্রতিমা তৈরি করছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার তৈরি প্রতিমাগুলো দেখতে খুব সুন্দর হয়। আমরা তার এই প্রতিভা দেখে আনন্দিত।
মা রিতা রানী পোদ্দার বলেন, আমার ছেলে কখনো প্রতিমা তৈরির কোনো প্রশিক্ষণ নেয়নি। নিজের মেধা ও আগ্রহ কাজে লাগিয়ে ছোটবেলা থেকেই প্রতিমা তৈরি করে যাচ্ছে। দিন দিন তার কাজ আরও ভালো হচ্ছে। সরকারি বা কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে সহযোগিতা পেলে সে আরও ভালোভাবে প্রতিমা তৈরির কাজ করতে পারত। আমরা চাই, তার এই প্রতিভা বিকশিত হোক।
ঠাকুমা আলো রানী পোদ্দার বলেন, ছোটবেলা থেকেই বিপনকে আমি সব ধরনের সহযোগিতা করে আসছি। প্রতিমা তৈরির প্রতি তার আগ্রহ দেখে ভালো লাগত। পরে যখন বড় মন্দির তৈরির প্রয়োজন হয়, তখন আমিই উদ্যোগ নিয়ে সহযোগিতা করি। মন্দিরের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিসও সংগ্রহ করে দিয়েছি। ওর এই কাজের প্রতি আমার সব সময়ই সমর্থন রয়েছে।
আরেক ঠাকুমা সাধনা রানী পোদ্দার বলেন, বিপন ছোট বয়সেই যে প্রতিভার পরিচয় দিয়েছে, তা আমাদের গর্বের বিষয়। নিজের চেষ্টায় সে এত সুন্দর প্রতিমা তৈরি করছে। আমরা চাই, তার কাজ আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ুক। এ জন্য ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুলের কাছে বিপনের প্রতিভা বিকাশে সহযোগিতার আহ্বান জানাই। আগামী কাত্যায়নী পূজায় তার পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমরা সংসদ সদস্যের সহযোগিতা কামনা করছি।
মন্দিরের পুরোহিত পরিমল চক্রবর্তী বলেন, বিপন আমাদের পাড়ার গর্ব। তার তৈরি প্রতিমা দিয়ে পূজার আয়োজন করতে পারায় আমাদের খরচও অনেক কমে গেছে। অন্য জায়গা থেকে প্রতিমা তৈরি করাতে হলে কারিগরকে টাকা দিতে হতো। কিন্তু বিপন বিনা পারিশ্রমিকে প্রতিমা তৈরি করে দেয়। এত অল্প বয়সে তার এমন দক্ষতা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। আমরা তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।
মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক অরুণ পোদ্দার বলেন, এ বছর কাত্যায়নী পূজায় বিপনের তৈরি প্রতিমা দিয়েই পূজা হবে। তার হাতে তৈরি প্রতিমাগুলো দেখতে খুব সুন্দর হয়েছে। পূজার সময় দর্শনার্থীরা প্রতিমাগুলো দেখার সুযোগ পাবেন। আমরা সবাইকে রাজাপুর পোদ্দার পাড়া মন্দিরে এসে বিপনের হাতের কাজ দেখার আমন্ত্রণ জানাই। তার মতো প্রতিভাবান কিশোরের পাশে সবাই দাঁড়ালে সে ভবিষ্যতে আরও ভালো কাজ করতে পারবে।
পরিবারের সদস্য ও মন্দিরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যাশা, যথাযথ উৎসাহ ও সহযোগিতা পেলে বিপনের প্রতিভা আরও বিকশিত হবে। পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিমা তৈরির এই আগ্রহ একদিন তাকে আরও বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ করে দেবে— এমনটাই আশা তাদের।
আরটিভি/এমএইচজে




