
‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’—শত বছরের এই চেনা প্রবাদটি কেবল লোকসংস্কৃতির অংশই নয়, বরং দেশের কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
সবজিজোন-খ্যাত যশোরে কৃষির রূপান্তরে এখন বড় ভূমিকা রাখছে ঐতিহ্যের খেজুর গুড়। শীতের মাত্র চার মাসের মৌসুমে এ জেলায় বেচাকেনা হয় প্রায় দেড়শত কোটি টাকার রস ও গুড়। সম্প্রতি জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর এর চাহিদা ও বাজার আরও সম্প্রসারিত হয়েছে, যা জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করে তুলছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সর্বোচ্চ গুড় উৎপাদনকারী জেলা যশোরে গত পাঁচ বছরে খেজুর গুড়ের উৎপাদন বেড়েছে ১০ শতাংশ। জেলায় বর্তমানে ২৩ লাখ ৩০ হাজার ৬৯৫টি খেজুর গাছ রয়েছে, যার মধ্যে রস আহরণের উপযোগী গাছের সংখ্যা ৩ লাখ ৭ হাজার ১৩০টি। একটি গাছ থেকে মৌসুমে গড়ে ২০ কেজি রস পাওয়া যায়, যা থেকে তৈরি হয় প্রায় ৮ কেজি গুড়। সব মিলিয়ে জেলায় মৌসুমে প্রায় ৯৫ লাখ কেজি বা সাড়ে ৯ হাজার মেট্রিক টন গুড় উৎপাদিত হয়। বাজারমূল্যে যার পরিমাণ প্রায় ১৫০ কোটি টাকা।
যশোরের চৌগাছা উপজেলার পঞ্চাশোর্ধ্ব গাছি মিসকিন দফাদার জানান, পাঁচ বিঘা জমিতে ধান, পাট ও সবজি আবাদ করে লাভ থাকে না বললেই চলে। অথচ শীতের চার মাস খেজুর গাছ পরিচর্যা ও রস-গুড় বিক্রি করে তিনি ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট লাভ করেন। গত মৌসুমে তিনি ৮০ হাজার টাকার গুড় বিক্রি করেছেন।
একসময় গাছিদের পরবর্তী প্রজন্ম এই পেশায় আসতে না চাইলেও এখন ভালো দাম পাওয়ায় চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। চৌগাছার বড় খানপুর গ্রামের রুবেল হোসেন বাবা ইউসুফ আলীর ঐতিহ্য ধরে রেখে গত মৌসুমে ৬০ হাজার টাকার গুড় বিক্রি করেছেন নিজ বাড়ি থেকেই।
গ্রামের হাট-বাজার ছাড়িয়ে যশোরের খেজুর গুড়ের কদর এখন ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইন ও ই-কমার্সেও। জেলা থেকে সরাসরি দেশে-বিদেশে ভোক্তাদের ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে খাঁটি পাটালি। পাশাপাশি চিনির স্বাস্থ্যসম্মত বিকল্প হিসেবে শহরের বাসা-বাড়ি, রাস্তার ধারের পিঠার দোকান এমনকি চায়ের দোকানেও বাড়ছে খেজুর গুড়ের ব্যবহার।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি এই শিল্পে কিছু সংকটও দেখা দিয়েছে। নতুন গাছ না লাগানো, ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে গাছ কেটে ফেলা এবং তরুণদের মাঝে দক্ষ গাছির অভাব অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বাজারে অসাধু চক্রের চিনি ও কেমিক্যাল মিশিয়ে ভেজাল গুড় বিক্রির প্রবণতা আসল গুড়ের সুনাম নষ্ট করছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, যশোরের খেজুর গুড় সুস্বাদু ও নিরাপদ রাখতে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। নিরাপদ রস ও গুড় উৎপাদনে জোর দেওয়ায় গত পাঁচ বছরে উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি কৃষকরাও বাড়তির আয়ের মুখ দেখছেন।
আরটিভি/এসএস




