
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আইসিটি বিভাগে প্রভাষক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে তথ্য যাচাই-বাছাই করার লক্ষ্যে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সমাধানের লক্ষে গঠিত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির কার্যপরিধির সীমাবদ্ধতা নিয়েই এবার প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিয়োগ প্রার্থীর শুধু ফলাফলের হেরফের কিনা যাছাই করার নির্দেশনা পেয়েছেন বলে জানান কমিটির আহ্বায়ক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. রোকসানা বেগম মিলি।
এতে নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো অধিকাংশই প্রশাসন কৌশলে তদন্তের বাইরে রেখেছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। একাধিক প্রার্থী জানান, “আমরা এখনও তদন্ত কমিটির ওপর আস্থা রাখছি। শুধু ফলাফল যাচাই-বাছাই করার নির্দেশনা মূলত হাত পা বেঁধে দেওয়ার মতো।”
এর আগে আইসিটি বিভাগের অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী ফিরোজা নাজনীনের নিয়োগকে ঘিরে গণমাধ্যমে একের পর এক অভিযোগ এসেছে গত কয়েক সপ্তাহে। বিভাগীয় কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হওয়া, নিয়োগ বোর্ডের ঠিক আগের দিন প্রার্থীর স্বামীর বোর্ড-বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী ফারহানের সঙ্গে সাক্ষাৎ, এবং পরীক্ষা কমিটির দায়িত্বে থাকাকালীন একাডেমিক অনিয়মের মাধ্যমে স্ত্রীর ফল বাড়িয়ে দেওয়া–ইত্যাদি অসংগতি ওঠে আসে। তথ্য সংগ্রহে যাওয়া সাংবাদিকদের সঙ্গে বিভাগীয় সভাপতির গড়িমসি, এক সাংবাদিককে বিকাশে টাকা পাঠিয়ে প্রভাবিত করার চেষ্টা এবং কটাক্ষের অভিযোগও উঠে আসে গণমাধ্যমে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, প্রথম বর্ষে অকৃতকার্য হওয়া ফিরোজা নাজনীন রিটেক পরীক্ষা দিয়ে ও মানোন্নয়নের মাধ্যমে ৩.৩৮ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক শুরু করেন। কিন্তু তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের পরীক্ষা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে তাঁর স্বামী ড. জাহিদুল বসার পরই ফলাফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। তৃতীয় বর্ষে একটি মানোন্নয়নসহ সিজিপিএ দাঁড়ায় ৩.৬৪-এ, চতুর্থ বর্ষে তা বেড়ে হয় ৩.৮৪, আর মাস্টার্সেও তিনি পান ৩.৬৪। একই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া তুলনামূলক ভালো ফলধারী কয়েকজন প্রার্থী বাদ পড়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গত ২৯ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭৪তম সিন্ডিকেট সভায় ফিরোজা নাজনীনের নিয়োগের সুপারিশ চূড়ান্ত হয়েছিল। এরপর গণমাধ্যমে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসলে ব্যাপক সমালোচনার স্বীকার হয়ে নিয়োগপত্র স্থগিত করে প্রশাসন। সিন্ডিকেট সভায় সদস্যদের আপত্তির মুখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
অভিযোগের মুখে গত ২১ জুলাই তিন সদস্যের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে প্রশাসন। কমিটির আহ্বায়ক করা হয় সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. বেগম রোকসানা মিলিকে, সদস্যসচিব একাডেমিক শাখার কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম, আর সদস্য পদে রাখা হয় থিওলজি অনুষদের ডিন ও সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. সেকান্দার আলীকে।
তবে কমিটি গঠনের অফিস আদেশ ঘেঁটে দেখা যায়, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল হকের স্বাক্ষরিত সেই আদেশে শুধু ফিরোজা নাজনীনের বিএসসি ও এমএসসির একাডেমিক ফলাফল যাচাইয়ের নির্দেশনাই দেওয়া হয়েছে। নিয়োগ বোর্ডের আগে বিশেষজ্ঞের সঙ্গে সাক্ষাৎ কিংবা পরীক্ষা কমিটির দায়িত্বে থেকে ফল বৃদ্ধির মতো স্পর্শকাতর অভিযোগগুলো তদন্তের পরিধিতেই রাখা হয়নি। এতে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে ক্যাম্পাসে।
বিষয়টি নিয়ে কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. বেগম রোকসানা মিলি বলেন, “আমাকে যে চিঠি ইস্যু করেছে ওখানে শুধু প্রার্থীর একাডেমিক ফলাফল পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রশাসন নির্দিষ্ট একটি বিষয়েই সীমাবদ্ধ রাখতে বলেছে। তাই চাইলেও অন্য অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখার সুযোগ নেই আমার হাতে। দ্রুত রিপোর্ট জমা দিব।”
এ প্রসঙ্গে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত মূল অভিযোগগুলোই যদি তদন্তের বাইরে থেকে যায়, তাহলে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসবে কি না–সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে।
আরটিভি/ এসকেডি




