
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নয়, জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থানও। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, স্থাপত্য নান্দনিকতা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের কারণে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে ক্যাম্পাসটি। বিশ্ববিদ্যালয়টি ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার ও ঢাকা থেকে ১০০ কিমি দূরে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার নামাপাড়া-বটতলায় অবস্থিত।
২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যাপীঠটি প্রায় ৫৭ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। জাতীয় কবির স্মৃতিধন্য এই ক্যাম্পাসের প্রতিটি স্থাপনায় রয়েছে আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের ছাপ, যা প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থীকে আকর্ষণ করে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।
ইতিহাস: ১৯৯০-এর দশকে বৃহত্তর ময়মনসিংহ সাংস্কৃতিক ফোরাম ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির সভাপতি ছিলেন ড. আশরাফ সিদ্দিকী, সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদা আলী এবং কোষাধ্যক্ষ বদিউজ্জামান। ফোরামটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থদাতা ও জমিদাতা—এই দুই ধরনের সহযোগী সংগ্রহ করে; অর্থদাতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রী রাশেদ মোশাররফসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও বিদ্যানুরাগী ব্যক্তি।
২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)-এর বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রকল্প অনুমোদন পায়। পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০০৫ সালের ১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং ২০০৬ সালের ২৫ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। একই বছরের ৩ জুন প্রথম ব্যাচের ক্লাস শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ছিলেন ড. মোহাম্মদ শামসুর রহমান এবং বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ম উপাচার্য। প্রথম ব্যাচে চারটি বিভাগে মোট ১৮৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়।
নামকরণ: বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালের বটতলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। জানা যায়, শৈশবে কবি এই বটগাছের নিচে বসে বাঁশি বাজাতেন এবং নিকটবর্তী দরিরামপুর হাইস্কুলে পড়াশোনা করতেন। তার সেই স্মৃতিবিজড়িত এলাকাকে ঘিরেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি এবং জাতীয় কবির নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য স্থাপনা দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এর মধ্যে রয়েছে কবি নজরুল ভাস্কর্য, জয় বাংলা ভাস্কর্য, চির উন্নত মম শির স্মৃতিস্তম্ভ ও কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার। এসব স্থাপনা ক্যাম্পাসের নান্দনিকতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ ধর্মীয় কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। নান্দনিক নকশায় নির্মিত এই মসজিদটি ক্যাম্পাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের অদূরেই অবস্থিত নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র দর্শনার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানে কবির ব্যবহৃত কিছু সামগ্রী, স্মৃতিচিহ্ন এবং তার জীবনের বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। কবির শৈশবের সঙ্গে জড়িত এই স্থানটি প্রতিদিন বহু দর্শনার্থীকে আকর্ষণ করে।
অ্যাকাডেমিক পরিচিতি: বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৬টি অনুষদের অধীনে ২৫টি বিভাগে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য, দর্শন ও জীবনাদর্শের গবেষণা, সংরক্ষণ ও প্রচারের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ বিশ্ববিদ্যালয়টির অন্যতম বিশেষায়িত গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
ঋতুভিত্তিক সৌন্দর্য: প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় যেন এক অনন্য আশ্রয়। ঋতুর পালাবদলে প্রতিবারই নতুন রূপে ধরা দেয় এই ক্যাম্পাস। বর্ষার সজীব সবুজ, শীতের কুয়াশায় মোড়ানো নির্জন সকাল, আর বসন্তে কৃষ্ণচূড়া ও জারুলের রঙিন ছোঁয়ায় পুরো ক্যাম্পাস যেন হয়ে ওঠে এক জীবন্ত ক্যানভাস। ছায়াঘেরা পথ, উন্মুক্ত সবুজ প্রান্তর এবং পাখির কলতানে মুখর পরিবেশ শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থী—সবার কাছেই এনে দেয় নির্মল প্রশান্তির অনুভূতি।
প্রাকৃতিক পরিবেশ ও আড্ডা: বিশ্ববিদ্যালয়ের 'বটতলা', 'চারুদ্বীপ', 'সিঙ্গারা হাউজ' ও 'ফিল্ম জোন' এলাকাগুলো আড্ডার জন্য ক্যাম্পাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্থান। এখানকার শান্ত ও ছায়াঘেরা পরিবেশ দর্শনার্থীদের স্বস্তি দেয়।
সাংস্কৃতিক পরিবেশ: বিশ্ববিদ্যালয়ের সিগনেচার উৎসব 'কুয়াশা উৎসব', জাতীয় দিবস উদযাপন, বসন্ত উৎসব, পিঠা উৎসব, নজরুলজয়ন্তী, রবীন্দ্রজয়ন্তী, বাংলা নববর্ষ উদযাপন এবং নবীনবরণসহ বছরজুড়ে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখর থাকে পুরো ক্যাম্পাস। এসব আয়োজন শুধু শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দর্শনার্থীদেরও আকৃষ্ট করে।
খাবার ও প্রয়োজনীয় সতর্কতা: দর্শনার্থীদের জন্য ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়া এবং আশেপাশের ছোট দোকানগুলোতে সুলভ মূল্যে খাবার ও নাস্তা পাওয়া যায়। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, এটি একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তাই ক্যাম্পাসের ভেতরে চলাচলের সময় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, যত্রতত্র ময়লা না ফেলা এবং ক্লাস চলাকালীন উচ্চশব্দ পরিহার করা আবশ্যক। এছাড়া ক্যাম্পাসে রাত যাপনের কোনো বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেই, তাই পর্যটকদের ময়মনসিংহ জেলা শহরের আবাসিক হোটেলগুলো ব্যবহার করতে হয়।
যাতায়াত ব্যবস্থা: ঢাকা থেকে ময়মনসিংহগামী বাসে ত্রিশাল উপজেলার বাসস্ট্যান্ডে নেমে অটোরিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। এছাড়া ময়মনসিংহ শহর থেকে নিয়মিত বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য স্থানীয় যানবাহনে সহজেই ক্যাম্পাসে যাতায়াত করা যায়।
শিক্ষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় আজ শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, দেশজুড়ে ভ্রমণপিপাসু মানুষ ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের কাছেও একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে পরিচিত।
আরটিভি/এসএস


