ঢাকা সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

স্কলারশিপের নামে আধুনিক নীলচাষ

গবি সংবাদদাতা, আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৩:২২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

যে বৃক্ষকে বাঁচিয়ে রাখতে এ দেশের মাটি তার শেষ পুষ্টিটুকু দিয়েছে, বাবা-মা ঢেলেছেন রক্ত-ঘাম, সেই বৃক্ষ ফুল ফোটার মৌসুমে ডালপালা মেলেছে ভিনদেশের আকাশে।

নীলকরদের দিন শেষ হয়েছে, সত্য; কিন্তু মেধার নব্য-উপনিবেশবাদ থামেনি। এ যেন এক বসন্তের নীলচাষ—কৃষক তার সবটুকু দিয়ে ফসল ফলাল, কিন্তু তার আঙিনা পড়ে রইল রুক্ষ, খাঁ খাঁ রোদে। আর দিগন্তের ওপারে বসে অচেনা বণিকেরা মেতে উঠল নবান্নের উৎসবে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যেন এক আধুনিক নীলকুঠি, যেখানে শিক্ষা শেষে মেধা নিজের ইচ্ছাতেই তুলে দেয় তার বুদ্ধিবৃত্তিক ফসল। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়—রাষ্ট্র ও পরিবারের বিপুল বিনিয়োগে গড়ে ওঠা সেই মেধা শেষ পর্যন্ত ফল দেয় উন্নত বিশ্বের মাটিতে। নীলকরদের জোরজুলুমের দিন শেষ হলেও শুরু হয়েছে একবিংশ শতাব্দীর নতুন নীলচাষ। এখানে শ্রম আর রক্ত আমাদের, কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক ফসল ভোগ করে পৃথিবীর পরাশক্তিগুলো।

দাদন বনাম স্টাইপেন্ড

ঔপনিবেশিক নীলকরেরা কৃষককে সামান্য কিছু টাকা অগ্রিম দিয়ে সুদের শিকলে বাঁধত, যাকে বলা হতো ‘দাদন’। একবিংশ শতাব্দীতে এসে সেই দাদনপ্রথা বিলুপ্ত হয়নি, বরং রূপ বদলেছে। আজ তা রূপান্তরিত হয়েছে ই-মেইলে আসা ঝলমলে ‘অফার লেটার’-এ।

নীলকরদের চাবুকের জায়গায় আজ এসেছে ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তা, আর দাদনের জায়গায় এসেছে বিদেশের ফান্ডিং। বাবা-মা নিঃস্ব হয়ে সন্তানকে পড়াশোনা করাচ্ছেন, অথচ ডিগ্রি শেষে দেশীয় কর্মবাজার তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে বেকারত্ব কিংবা মামা-খালুর তোষামোদনির্ভর সংস্কৃতি।

অবহেলা আর ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তায় শুকিয়ে পড়া জীবনে ‘গবেষণা ভাতা’ তখন যেন এক পরম তৃপ্তির বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে।

আরও পড়ুন

চিন্তার আকাল

নীলকর সাহেবরা বাংলার খাদ্যনিরাপত্তাকে জিম্মি করে কৃষকদের নীল চাষে বাধ্য করেছিল। একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের রুগ্‌ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা যেন শিক্ষার্থীদের বাধ্য করছে চিন্তার চারাগাছ উপড়ে ফেলে বিসিএসের গাইড মুখস্থ করতে কিংবা দেশ ছাড়তে।

যে বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ওষুধ, কৃষিপ্রযুক্তি কিংবা দর্শনের নতুন ধারণার জন্ম নেওয়ার কথা ছিল, তা আজ অনেক ক্ষেত্রেই বিসিএস কোচিংয়ের কারখানায় রূপ নিয়েছে। খাদ্যশস্য ধ্বংসের সেই ঐতিহাসিক ভুলের মতোই রাষ্ট্র আজ নিজের হাতেই মৌলিক গবেষণার ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত করে এক বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্ভিক্ষ ডেকে আনছে।

নীলচাষের বিস্তারে একসময় বাংলার খাদ্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা ও সংকট তীব্র হয়েছিল। খাদ্যের জমি হারিয়ে দেশ যেমন একসময় হাহাকার দেখেছিল, তেমনি আজ চিন্তা ও উদ্ভাবনের উর্বর জমি হারিয়ে আমরা পতিত হচ্ছি এক করুণ বুদ্ধিবৃত্তিক খরায়।

রাষ্ট্র ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে নতুন কিছু সৃষ্টি করার শক্তি। পড়ে থাকছে কেবল এক শূন্য বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো। গবেষণাহীনতার এই চক্র বাংলাদেশকে প্রযুক্তি ও জ্ঞানের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন উন্নত বিশ্বের মুখাপেক্ষী করে রাখতে পারে।

রুগ্ণ পরিবেশ, বাধ্য দেশত্যাগ

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুম, গেস্টরুম আর তোষামোদনির্ভর পরিবেশ যেন একবিংশ শতকের নীলকুঠি। শত বছর আগে নীলকরদের চাবুক ও অত্যাচারের কেন্দ্রবিন্দু ছিল গ্রামীণ কুঠিবাড়িগুলো। আজ আমাদের অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুম, গেস্টরুম আর লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতির নিপীড়নমূলক পরিবেশ যেন সেই প্রাচীন কুঠিবাড়িরই আধুনিক সংস্করণ।

শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন রাজনৈতিক তোষামোদ ও ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির আখড়ায় পরিণত হয়, তখন মেধার মূল্য শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। রাষ্ট্র কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে মেধা তৈরি করলেও ক্যাম্পাসের এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশই সেই মেধাকে ভিনদেশে তাড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বাধ্য হয়ে দেশান্তর

নীলকরদের শোষণে অতিষ্ঠ হয়ে কৃষক যখন ভিটেমাটি ছাড়ত, তা ছিল বেঁচে থাকার তাগিদ, কোনো বিলাসিতা নয়। আজকের তরুণ গবেষকের দেশত্যাগও অনেক ক্ষেত্রে সেই একই তাগিদের ফসল।

যে রাষ্ট্র তার তরুণ গবেষককে উপযুক্ত ল্যাব, মেধার মূল্যায়ন ও নিরাপদ পরিবেশ দিতে পারে না, সেই রাষ্ট্র তরুণদের ওপর দেশত্যাগের দায় চাপাতে পারে না। বিদেশের মাটিতে পাড়ি দেওয়া কোনো শিক্ষার্থীর সব সময় বিলাসী সিদ্ধান্ত কিংবা দেশপ্রেমের অভাব নয়। অবমূল্যায়ন, গবেষণার সুযোগের সংকট ও ভবিষ্যতের চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে এটি অনেকের জন্য আত্মরক্ষার লড়াই।

নীলকুঠির অবসান

নীলকরদের বিদায় যেমন আন্দোলন ছাড়া হয়নি, তেমনি মেধার এভাবে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া থামাতেও প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার।

জাতীয় বাজেটে গবেষণার বরাদ্দ দৃশ্যমানভাবে বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশাসনিক নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা তোষামোদ নয়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, যোগ্যতা ও গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

মেধার উপযুক্ত সম্মান ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গেলে তরুণদের আর আত্মমর্যাদা বাঁচাতে বিদেশের বিমানে চড়তে হবে না। তরুণ গবেষকদের জন্য সম্মানজনক ফেলোশিপ ও রি-এন্ট্রি গ্রান্ট নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষে তারা নিজস্ব গবেষণাগার গড়ে দেশে ফিরে গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুফল অর্থনীতিতে যুক্ত করতে পারেন।

ক্যাম্পাসের বিষাক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ ভেঙে দিয়ে লাইব্রেরি ও ল্যাবকেন্দ্রিক সুস্থ একাডেমিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।

যাঁরা ইতোমধ্যে স্থায়ীভাবে বিদেশে আছেন, তাঁদের সবাইকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলেও তাঁদের মেধার সুফল দেশে আনা সম্ভব। ‘রিভার্স ব্রেইন ড্রেন’ নীতি চালু করে প্রবাসী গবেষক ও বিজ্ঞানীদের দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কাজ করার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। যৌথ গবেষণা ও আন্তর্জাতিক ফেলোশিপের সুযোগ বাড়ালে বিদেশে থাকা মেধাবীরাও দেশের প্রযুক্তি ও নীতিনির্ধারণে সরাসরি অবদান রাখতে পারবেন।

কেবল সরকারি তহবিলের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। বিশ্ববিদ্যালয় ও করপোরেট খাতের মধ্যে শক্তিশালী সেতুবন্ধ তৈরি করতে হবে। দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সমস্যার সমাধান যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে হবে এবং ব্যবসায়ীরা সেই উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করবে, তখন তরুণ গবেষকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত হবে।

এর মাধ্যমে তৈরি হতে পারে মেধা ধরে রাখার একটি টেকসই ইকোসিস্টেম।

কর্মক্ষেত্রে বয়স, রাজনৈতিক পরিচয় ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার চেয়ে যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। কাজের নিরাপত্তা, উপযুক্ত জীবনমান ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গেলে তরুণেরা নিজ মাতৃভূমিতে থেকেই দেশ গড়ার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বেন।

শত বছর আগে নীলচাষের নিষ্ঠুর শৃঙ্খল ভাঙতে বাংলার কৃষকেরা একজোট হয়েছিল। আজও সময় এসেছে মেধা পাচারের এই অলিখিত নীলচাষ থামানোর।

তরুণদের হাতে অবমূল্যায়ন কিংবা তোষামোদের চাবুক নয়, তুলে দিতে হবে গবেষণার স্বাধীনতা, নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা এবং মেধার উপযুক্ত সম্মান।

রাষ্ট্র যদি আজ জাগতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উর্বরতা ফিরিয়ে আনতে না পারে, তবে আমাদের মাটিতে জন্ম নেওয়া মেধা চিরকাল বিদেশের ফসল হয়েই থেকে যাবে। আর দেশের মাটি পড়ে থাকবে খাঁ খাঁ এক বুদ্ধিবৃত্তিক মরুভূমিতে।

কথা স্পষ্ট—মেধানিধন বন্ধ করতে হলে শিক্ষাঙ্গন ও কর্মক্ষেত্র থেকে স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক তোষামোদ ও অবমূল্যায়ন উপড়ে ফেলতে হবে। তরুণদের হাতে গবেষণার ক্ষমতা ও যোগ্যতার মর্যাদা দিন, তারা দেশের চেহারা বদলে দিতে পারবে।

আর তা না হলে সার-পানি দিয়ে মেধার ফলন আমরাই ঘটাব, কিন্তু তার সুমিষ্ট সুফল চিরকাল ভোগ করবে ভিনদেশের বণিকেরা।

নীলচাষের এই আত্মঘাতী খেলা বন্ধ করার সময় এখনই।


আরটিভি/জেএমএ

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অসহযোগ কর্মবিরতি চালিয়ে যাবে চুয়েটের তিন সমিতি
নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমের বহিরাগতদের সহায়তায় চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ক্যাম্পাসে প্রবেশের প্রতিবাদে পূর্ণ কর্মবিরতি ও সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তিন সমিতি।
দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অসহযোগ কর্মবিরতি চালিয়ে যাবে চুয়েটের তিন সমিতি
দেশে প্রথমবারের মতো হচ্ছে টেক্সটাইল ইনোভেশন এক্সপো
বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও পোশাকশিল্পে উদ্ভাবন, গবেষণা ও উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে দেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘টেক্সটাইল ইনোভেশন এক্সপো ২০২৬’।
দেশে প্রথমবারের মতো হচ্ছে টেক্সটাইল ইনোভেশন এক্সপো
কুমিল্লায় পাওয়া গেল জাবির সেই শিক্ষার্থীকে
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) ফেরদৌস আল হাসান। 
কুমিল্লায় পাওয়া গেল জাবির সেই শিক্ষার্থীকে
প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক পাচ্ছেন ঢাবির ৩২ শিক্ষার্থী
সোমবার (১২ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসসংযোগ দপ্তর থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক পাচ্ছেন ঢাবির ৩২ শিক্ষার্থী
মাভাবিপ্রবির দুই হলে নতুন প্রভোস্ট নিয়োগ
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) দুটি আবাসিক হলে নতুন প্রভোস্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। হল দুটিতে দায়িত্ব পেয়েছেন ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান মোগল ও টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন।
মাভাবিপ্রবির দুই হলে নতুন প্রভোস্ট নিয়োগ
আরও পড়ুন
যবিপ্রবিতে উচ্চশিক্ষায় দুই মাসব্যাপী সেমিনার সিরিজ উদ্বোধন 
ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষার সুযোগ, মাসে মিলবে ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা
যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতকে ফুল-ফান্ডেড স্কলারশিপ, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদেরও আবেদনের সুযোগ
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা: কলেজশিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির সুযোগ