
কখনো রাজমিস্ত্রীর সহযোগী কখনো হোটেল বা দোকানের কর্মচারী যখন যে কাজ পেয়েছেন তাই করেছেন। দিনে করেছেন দিন মজুরের কাজ আর রাতে হাতে তুলে নিয়েছেন বই। রাত কেটেছে পড়ার টেবিলে। ভোরের আলো ফুটতেই আবার কাজের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছেন নাজমুল। অভাব ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী।
পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে বাবাকেও দিনের পর দিন শ্রম দিতে হয়েছে। সীমিত আয়ের সেই পরিবারে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখাটাও ছিল একসময় বিলাসিতার মতো। তবে প্রতিকূলতা থামাতে পারেনি নাজমুলকে। নিজের মেধা, অধ্যবসায় ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্গী করে এবার তিনি পাড়ি জমাচ্ছেন সুইডেনে। দেশটির স্কোভদে ইউনিভার্সিটিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
বলছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বগুড়ার শেরপুর উপজেলার খামারকান্দি গ্রামের রিকশাচালক জনাব আয়নাল হকের বড় ছেলে মো. নাজমুল হাসানের কথা। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাজীবন শেষ করে একসময় জায়গা করে নেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভর্তি হন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান (Biochemistry and Molecular Biology) বিভাগে। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থী বর্তমানে মাস্টার্সের থিসিস করছেন। এখন পাড়ি দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন সুদূর সুইডেনে। দেশটির ইউনিভার্সিটি অব স্কোভদেতে ‘মাস্টার্স ইন বায়োসায়েন্স’ পড়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। পেয়েছেন শতভাগ টিউশন ফি মওকুফসহ পূর্ণ বৃত্তি।
পড়াশোনার পাশাপাশি নাজমুল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত আছেন। বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহ-মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প জানতে চাইলে নাজমুল হাসান আরটিভিকে বলেন, "আমি আমার বাবার পরিশ্রম দেখে বড় হয়েছি। দারিদ্র্য সবসময়ই আমার নিত্যসঙ্গী ছিল। ছোটবেলা থেকেই শিখেছি, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে কীভাবে এগিয়ে যেতে হয়, কীভাবে প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। আমার বাবা পায়ে রিকশা চালাতেন। বাবার সেই কষ্ট আমাকে ভীষণ নাড়া দিত। একই সঙ্গে তার পরিশ্রমই আমাকে অনুপ্রেরণা জোগাত। মনে হতো, বাবার কষ্ট আমাকে ঘোচাতে হবে। সেই সময় থেকেই নিজের জীবনে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি।"
তিনি বলেন, "শেরপুরের জলযোগ হোটেলে কাজ করেছি। এরপর আমাদের এখানকার ডক্টরস কমপ্লেক্সে একটি গার্মেন্টসের দোকানেও কাজ করেছি। পরে রাজমিস্ত্রির জোগাড়ির কাজও করেছি। সবসময় চেষ্টা করেছি, কীভাবে নিজেকে স্বাবলম্বী করা যায় এবং পরিবারের কাছ থেকে যতটা সম্ভব কম অর্থ নেওয়া যায়। নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে আমি সবকিছুর ওপরই পরিশ্রমকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। এমনও সময় গেছে, যখন কষ্টের কারণে ঠিকমতো কাপড়চোপড়ও কিনতে পারিনি।"
শতভাগ বৃত্তির আওতায় টিউশন ফি ও স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা থাকলেও বিমানভাড়া, আবাসন এবং শুরুতে জীবনযাপনের খরচ বহন করার মতো সামর্থ্য ছিল না পরিবারের। রিকশা চালিয়ে যে আয় করেন আয়নাল হক, তা দিয়ে সংসার চালানো এবং দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ বহন করাই কঠিন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পরও নাজমুলের সুইডেনযাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। একদিকে বহু বছরের পরিশ্রমে অর্জিত বৃত্তি, অন্যদিকে বিদেশযাত্রার প্রয়োজনীয় অর্থের সংকট, এই দুইয়ের টানাপোড়েনে থমকে যাওয়ার উপক্রম হয় তার স্বপ্ন। সেই সংকটের সময় পাশে দাঁড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গত বুধবার (১২ আগস্ট) বাবা আয়নাল হককে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন নাজমুল। তার সংগ্রাম, পড়াশোনা ও সুইডেনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি শুনেন প্রধানমন্ত্রী। তার আর্থিক সংকটের বিষয়টি জেনে তাকে আর্থিক অনুদান দেন। একইসঙ্গে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে নিজেকে দক্ষ বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যতে দেশের মানুষের জন্য কাজ করার পরামর্শ দেন।
নাজমুল বলেন, আমার বাবা একজন রিকশাচালক। বাবার উপার্জনের ওপর নির্ভর করেই আমার পড়াশোনা এগিয়েছে। সুইডেনে শতভাগ বৃত্তি পাওয়ার পরও বিমানভাড়া এবং সেখানে থাকা-খাওয়ার প্রাথমিক খরচ পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব হচ্ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতায় এখন অনিশ্চয়তা কেটে গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের অনুভূতি জানতে চাইলে নাজমুল বলেন, ছোটবেলা থেকেই তারেক রহমান আমার অনুপ্রেরণার একজন মানুষ। সরাসরি সাক্ষাৎ করে নিজের সংগ্রামের কথা বলা এবং তার কাছ থেকে পরামর্শ পাওয়া আমার জীবনের স্মরণীয় একটি ঘটনা। প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রণালয়ে আমরা যাই। আমি আমার বাবা সহ যাই। সেখানে গেলে তিনি আমার বিষয়টা দেখেন। আর্থিক বিষয়ে যে সমস্যা সেই বিষয়টা সলভ করেন।
তিনি বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞ। তিনি আমাকে আবার ফিরে এসে দেশের সেবা করতে বলেছেন। আমি বলেছি, ‘জি, ইনশাআল্লাহ, আপনার হাতকে আরও শক্তিশালী করতে আমি আবার ফিরে আসব।"
খামারকান্দির মেঠোপথ থেকে সুদূর সুইডেনের বিশ্ববিদ্যালয়, নাজমুলের এই যাত্রা শুধু বিদেশে উচ্চশিক্ষার গল্প নয়; এটি একজন রিকশাচালক বাবার ঘাম, মায়ের ত্যাগ আর সন্তানের অদম্য স্বপ্নের গল্প। যে রিকশার প্যাডেল ঘুরিয়ে আয়নাল হক বছরের পর বছর সংসারের চাকা সচল রেখেছেন, সেই আয়ের একটি অংশেই গড়ে উঠেছে ছেলের ভবিষ্যৎ। সীমিত সামর্থ্য আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নাজমুল থেমে থাকেননি। মেধা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ে এগিয়ে গেছেন নিজের স্বপ্নের পথে।
নাজমুলের সামনে এখন উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও নিজেকে দক্ষ বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তোলার নতুন লড়াই। নাজমুলের গল্প মনে করিয়ে দেয়, অভাবের পথ কঠিন করতে পারে, কিন্তু স্বপ্ন থামাতে পারে না।
আরটিভি/ এসকেডি


