
দিনের ব্যস্ততা পেরিয়ে রাত নামতেই অন্য এক রূপে সেজে ওঠে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) ক্যাম্পাস।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে আলোকিত ক্যাম্পাসের এক প্রান্তে যখন গান, নাচ ও নানা সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে কড়ইতলা, ঠিক তখন অন্য প্রান্তে টিএসসির সামনে ল্যাম্পপোস্টের নিচে জমে ওঠে ক্রিকেট ম্যাচ।
একই রাতে সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার এমন সমান্তরাল আয়োজন যেন বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বহুমাত্রিকতারই এক জীবন্ত চিত্র।
এই আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল যবিপ্রবির সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘প্রবাহ’। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে উৎসাহিত করতে সংগঠনটির উদ্যোগে কড়ইতলার অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় এক প্রাণের মিলনমেলায়। মঞ্চে পরিবেশিত একের পর এক নাচ ও গান এবং দর্শকসারিতে শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস মিলিয়ে ক্যাম্পাসের পরিচিত রাতটি এক উৎসবে রূপ নেয়।
উল্লেখ্য, শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও সংগঠিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চলতি বছরের (২০২৬) ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রীয় সংগঠন হিসেবে ‘প্রবাহ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন’-এর অনুমোদন দেয়।
রাতের আলোয় কড়ইতলার সাংস্কৃতিক আয়োজনের দৃশ্যটি ছিল দারুণ আকর্ষণের। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে জড়ো হন অনুষ্ঠানস্থলে। কারও চোখ মঞ্চের পরিবেশনায়, আবার কারও হাতে থাকা মুঠোফোনে বন্দি হচ্ছিল প্রিয় মুহূর্তগুলো।
বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, হঠাৎ কোনো গানের সঙ্গে সুর মেলানো কিংবা পরিবেশনার তালে তালে হাততালি—সব মিলিয়ে তৈরি হয় বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত এক আবহ। কড়ইতলার চেনা জায়গাটি আলো, সুর ও মানুষের উপস্থিতিতে মুহূর্তের জন্য হয়ে ওঠে এক উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক মঞ্চ।
তবে আনন্দের এই জোয়ার শুধু কড়ইতলার মঞ্চেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কিছুটা দূরে টিএসসির সামনের রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের নরম আলোয় তখন চলছিল জমজমাট ক্রিকেট খেলা। কোনো নির্ধারিত মাঠ নয়, রাতের ফাঁকা রাস্তার ওপরই ব্যাট-বলের লড়াইয়ে মেতে ওঠেন শিক্ষার্থীরা। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে থাকা খেলোয়াড় আর চারপাশে দর্শকদের উল্লাস—সব মিলিয়ে ক্যাম্পাসের অন্য প্রান্তে তৈরি হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিবেশ।
একদিকে কড়ইতলায় সুরের আবেশ, অন্যদিকে টিএসসির সামনে ক্রিকেটের উন্মাদনা; দুটি ভিন্ন আবহ একই রাতে মিলেমিশে তৈরি করেছিল অনন্য এক ক্যাম্পাসচিত্র।
যবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের কাছে ক্যাম্পাসজীবন কেবল ক্লাস, পরীক্ষা, গবেষণা কিংবা ল্যাবরেটরির ব্যস্ততার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। সাংস্কৃতিক চর্চা, খেলাধুলা, সাহিত্য, বিতর্কসহ নানা সহশিক্ষা কার্যক্রমও তাদের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনেও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও ব্যান্ড শোতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। এসব আয়োজন শিক্ষার্থীদের একাডেমিক চাপের বাইরে নিজেদের প্রতিভা ও সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ করে দেয়।
সাংস্কৃতিক এই পরিসর তৈরিতে ‘প্রবাহ’-এর পথচলা খুব বেশি দীর্ঘ নয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যাত্রা শুরু করে সংগঠনটি। সূচলগ্ন থেকেই শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে আসছে তারা। কড়ইতলায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠান সেই চর্চাকে আরও বিস্তৃত করে শিক্ষার্থীদের প্রতিভা প্রকাশের এক দারুণ ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
আসলে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিগুলো প্রায়ই কোনো বড় আয়োজন থেকে নয়, বরং এমন ছোট ছোট মুহূর্ত থেকেই তৈরি হয়। রাতের কড়ইতলায় বন্ধুর সঙ্গে দাঁড়িয়ে গান শোনা, মঞ্চের পরিবেশনায় হাততালি দেওয়া কিংবা কিছুটা দূরে টিএসসির সামনে ল্যাম্পপোস্টের নিচে ক্রিকেটের টানটান উত্তেজনা—সময় পেরিয়ে এসব দৃশ্যই হয়ে ওঠে ফিরে দেখার মতো সোনালী স্মৃতি।
১৬ সেপ্টেম্বরের এই রাত তাই শুধু দিনপঞ্জির একটি সাধারণ তারিখ নয়; এটি যবিপ্রবির তরুণদের সৃজনশীলতা, বন্ধুত্ব, আনন্দ ও প্রাণচাঞ্চল্যের প্রতীক।
কড়ইতলার মঞ্চে সংস্কৃতির সুর আর টিএসসির সামনে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ব্যাট-বলের ছন্দ—একই ক্যাম্পাসে পাশাপাশি চলা এই দুটি ভিন্ন গল্প আবারও মনে করিয়ে দেয়, একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞানচর্চার স্থান নয়; এর আসল প্রাণস্পন্দন লুকিয়ে থাকে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন, সৃজনশীলতা, বন্ধুত্ব এবং একসঙ্গে গড়ে তোলা অসংখ্য অজস্র স্মৃতির মাঝে।
আরটিভি/এসএস




