
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের এক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ ও সংগঠনটির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে এক শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় মারধরের অভিযোগ উঠেছে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। পরে ওই শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ ফাঁড়ির মাধ্যমে তাকে হাটহাজারী থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। তবে ছাত্রলীগের সঙ্গে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছেন ওই শিক্ষার্থী।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এফ রহমান হলে এ ঘটনা ঘটে। পরে তাকে প্রক্টর কার্যালয়ে নেওয়া হয়। বিকেল ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ ফাঁড়ির মাধ্যমে তাকে হাটহাজারী থানায় পাঠায় প্রক্টর কার্যালয়।
ওই শিক্ষার্থীর নাম মুনতাছির মারজু। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং এ এফ রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।
এ এফ রহমান হল সংসদের যোগাযোগ ও আবাসনবিষয়ক সম্পাদক এবং হল শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মো. মাইন উদ্দিন ওয়াসি বলেন, সকালে ফেসবুকে ছাত্রলীগ নেতা আবরার শাহরিয়ারের একটি পোস্টে মুনতাছিরের প্রতিক্রিয়া দেখে তাদের সন্দেহ হয়। ওই পোস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিবির নেতার মোটরসাইকেলে চলাচলের ছবি এবং ওই মোটরসাইকেলের চাবি ছাত্রলীগের হাতে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
মাইন উদ্দিনের ভাষ্য, বিষয়টি নিয়ে মুনতাছিরের সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে তাঁর ফোন দেখতে চাওয়া হয়। মুনতাছির নিজেই ফোন দেন বলে দাবি তার। ফোনে আবরার শাহরিয়ারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের হোয়াটসঅ্যাপ যোগাযোগ এবং মেসেঞ্জারে ভোরে পাঠানো একটি বার্তা দেখতে পান তাঁরা। পরে বিষয়টি হলের দায়িত্বশীলদের জানানো হয়। একপর্যায়ে চাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক মোনায়েম শরীফ তাকে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যান।
ঘটনার সময় উপস্থিত রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাহিন আহমেদ বলেন, তিনি মুনতাছিরকে আগে থেকেই চিনতেন। কয়েকজন শিক্ষার্থীর সন্দেহের ভিত্তিতে ছাত্রলীগের সঙ্গে মুনতাছিরের কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা নিয়ে তারা কথা বলেন। শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে মুনতাছিরের একটি পোস্ট দেখার পর তাকে হলের ছাত্র সংসদ কক্ষে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
শাহিনের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তারা মুনতাছিরের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেননি। পরে মোনায়েম শরীফ তাঁকে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় পেছন থেকে ‘দুই-একজন’ তাকে চড়-থাপ্পড় মারেন।
চাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের ছাত্র অধিকার সম্পাদক মোনায়েম শরীফ বলেন, শেখ হাসিনার জন্মদিন ঘিরে ছাত্রলীগের কোনো কর্মসূচি থাকতে পারে—এমন আশঙ্কায় আগের রাতে ক্যাম্পাসে সতর্কতা ছিল। সে সময় ক্যাম্পাসে তাঁদের চলাচলের একটি ছবি তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন।
মোনায়েমের অভিযোগ, ওই পোস্টের স্ক্রিনশট নিয়ে ছাত্রলীগ নেতা আবরার শাহরিয়ার তাকে পরোক্ষভাবে হুমকি দেন। এ ছাড়া তারা যে মোটরসাইকেলে চলাচল করেছিলেন, সেই মোটরসাইকেলের চাবি ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে রয়েছে বলেও জানতে পারেন তিনি।
মোনায়েম বলেন, মুনতাছির ওই পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। পাশাপাশি শেখ হাসিনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে তার একটি পোস্টও সামনে আসে। পরে হলের শিক্ষার্থীরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় তার ফোনে আবরার শাহরিয়ারের সঙ্গে কথোপকথন পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন মোনায়েম। ওই কথোপকথনে ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, বিষয়টি জানার পর মুনতাছিরকে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও কথোপকথন দেখার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে।
মুনতাছিরকে বিশ্ববিদ্যালয় ও হল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের দাবি জানিয়ে মোনায়েম বলেন, নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্ত করে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য কেউ থাকলে তাদের বিষয়েও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
তবে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মুনতাছির মারজু।
তিনি বলেন, ছাত্রলীগের কোনো কমিটিতে আমার নাম নেই এবং আমি কখনো ছাত্রলীগ করিনি। আবরার শাহরিয়ারের সঙ্গে জুলাইয়ের আগে থেকে আমার যোগাযোগ ছিল। বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য আমার সঙ্গে কথা হতো। ক্যাম্পাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। কোনো রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে আমি অংশ নিইনি।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে মারধর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন মুনতাছির। তার দাবি, একপর্যায়ে কয়েকজন তার পিঠে আঘাত করেন এবং তাকে কয়েকটি চড়-থাপ্পড় দেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কামরুল হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীরা মুনতাছিরকে আটক করে তার ফোনে থাকা বিভিন্ন কথোপকথনের বিষয় প্রশাসনকে জানান। প্রশাসনও বিষয়টি দেখেছে। বিষয়টি ফৌজদারি ও আইনগত হওয়ায় পুলিশকে জানানো হয়। পরবর্তী আইনগত কার্যক্রমের জন্য পুলিশ তাকে নিয়ে গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে মামলা করবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও জানান প্রক্টর।
মুনতাছিরকে মারধরের অভিযোগের বিষয়ে প্রক্টর কামরুল হোসেন জানান, তার সামনে ওই শিক্ষার্থীর গায়ে হাত তোলার কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে প্রক্টর কার্যালয়ে আনার আগে বাইরে কী ঘটেছে, তা তার জানা নেই।
হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদুর রহমান সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বলেন, কিছুক্ষণ আগে ওই শিক্ষার্থীকে আনা হয়েছে। সে এখন হাজতে আছে। আমরা বিষয়টি পর্যালোচনা করে পরবর্তী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, দেখব। তবে এখন পর্যন্ত কোনো মামলা করা হয়নি।
আরটিভি/এমএইচজে


