
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পেছনের দিকে গেলেই বদলে যায় পরিচিত ক্যাম্পাসের দৃশ্য। চারপাশে সবুজ গাছপালা, তুলনামূলক নিরিবিলি পরিবেশ। সেখানেই নীরবে দাঁড়িয়ে আছে এমন এক ভবন, যার ভেতরে জমা হয়ে আছে শত শত বছরের ইতিহাস। প্রাগৈতিহাসিক জীবাশ্ম থেকে প্রাচীন মুদ্রা, পাথর ও ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য থেকে মুঘল আমলের কামান, সময় যেন এখানে থমকে আছে নানা নিদর্শনের মধ্যে।
কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পেছনের অংশে অবস্থান হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর কাছেই জাদুঘরটি দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যায়। অথচ একবার ভেতরে প্রবেশ করলে ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, শিল্পকলা ও লোকঐতিহ্যের ভিন্ন এক জগতের সঙ্গে পরিচয় ঘটে দর্শনার্থীদের।

ক্লাসের ফাঁকে কিংবা অবসর সময়ে শিক্ষার্থীদের কেউ আসেন ইতিহাস জানতে, কেউ গবেষণার উপকরণ খুঁজতে, আবার কেউ শুধুই কৌতূহল থেকে ঘুরে দেখতে। তাই কেবল পুরোনো নিদর্শন সংরক্ষণের স্থান নয়, ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের শেখা ও ঘুরে দেখার একটি আলাদা জায়গা হয়ে উঠেছে জাদুঘরটি।
২৪টি প্রত্নসামগ্রীর প্রদর্শনী থেকে আজকের জাদুঘর
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের ভাবনার সূত্রপাত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মলগ্নেই। ১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধনের সময় ইতিহাস বিভাগের উদ্যোগে ২৪টি প্রত্নসামগ্রী নিয়ে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ইতিহাসবিদ ড. এ আর মল্লিক শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি জাদুঘর গড়ে তোলার বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ইতিহাসবিদ ড. আবদুল করিমসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্যোগে একটি প্রাতিষ্ঠানিক জাদুঘর প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ কমিটি ও সিন্ডিকেটের অনুমোদনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৩ সালের ১৪ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর।

শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদ ভবনের ছোট একটি পরিসরে কার্যক্রম চললেও বিভিন্ন সময়ে স্থান পরিবর্তনের পর ১৯৯২ সালে জাদুঘরটি বর্তমান ভবনে আসে।
সময়ের সঙ্গে বেড়েছে এর সংগ্রহ, গবেষণা কার্যক্রম ও পরিধি। বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরকে দেশের ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সংগ্রহশালাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এক ছাদের নিচে পাঁচ গ্যালারির ইতিহাস
জাদুঘরের ওপরতলার প্রধান প্রদর্শনী অংশে রয়েছে পাঁচটি গ্যালারি- প্রাগৈতিহাসিক ও প্রত্নতত্ত্ব গ্যালারি, প্রাচীন ভাস্কর্য গ্যালারি, ইসলামিক শিল্পকলা গ্যালারি, লোকশিল্প গ্যালারি এবং সমকালীন শিল্পকলা গ্যালারি।
প্রতিটি গ্যালারির বিষয় ও সংগ্রহ আলাদা। কোথাও হাজার বছরের পুরোনো প্রত্ননিদর্শন, কোথাও বাংলার লোকজ জীবন, আবার কোথাও আধুনিক শিল্পীদের শিল্পকর্ম। ফলে এক গ্যালারি থেকে আরেক গ্যালারিতে যেতে যেতে দর্শনার্থীর সামনে খুলে যায় ইতিহাসের একেকটি অধ্যায়।

প্রাগৈতিহাসিক ও প্রত্নতত্ত্ব গ্যালারির উল্লেখযোগ্য সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ পাহাড় থেকে পাওয়া মাছের জীবাশ্ম। রয়েছে কাঠের জীবাশ্ম, বিভিন্ন প্রত্নস্থল থেকে সংগৃহীত টেরাকোটা ফলক, মাটির তৈরি প্রত্নবস্তু, সিলমোহর, পুঁতি ও প্রাচীন মুদ্রাসহ নানা নিদর্শন।
প্রাচীন ভাস্কর্য গ্যালারি আরও এক বিস্ময়ের জায়গা। জাদুঘরের সংগ্রহে রয়েছে ৫২টি পাথরের এবং ২৫টি ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য। পাল ও সেন যুগসহ বিভিন্ন সময়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে এসব প্রত্নবস্তু।
দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে ‘সার জং’
জাদুঘরের সবচেয়ে আলোচিত নিদর্শনগুলোর একটি মুঘল সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলের কামান ‘সার জং’। প্রায় ১৯৭ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের কারুকাজখচিত কামানটি সামনে দাঁড়ালে কয়েক শতাব্দী আগের এক সময় যেন মুহূর্তেই কাছে চলে আসে।
ইসলামিক শিল্পকলা গ্যালারিতে মুঘল ও সুলতানি আমলের বিভিন্ন নিদর্শনের পাশাপাশি রয়েছে প্রাচীন ও মধ্যযুগের মুদ্রা, হাতে লেখা পবিত্র কোরআন, পুঁথি, দলিল, ক্যালিগ্রাফি এবং ঐতিহাসিক মসজিদের ছবি। জাদুঘরের মুদ্রা সংগ্রহও বিশেষভাবে সমৃদ্ধ। প্রাচীন ও মধ্যযুগের প্রায় এক হাজার মুদ্রা রয়েছে এই সংগ্রহে।

অন্যদিকে লোকশিল্প গ্যালারিতে ধরা দিয়েছে বাংলার চিরচেনা গ্রামীণ জীবন। তাঁতের তৈরি সামগ্রী, চরকা, পালকি, পুরোনো অলংকার, ঢেঁকি, কাঠের নৌকা, মাটির পুতুল, তামা-পিতলের তৈজসপত্র, বেতের ঝুড়িসহ নানা উপকরণ মনে করিয়ে দেয় এক সময়ের জীবনযাত্রাকে।
সমকালীন শিল্পকলা গ্যালারিতে রয়েছে জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, মুর্তজা বশীর ও রশীদ চৌধুরীর মতো দেশের বরেণ্য শিল্পীদের কাজ। ফলে প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে আধুনিক শিল্প পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের এক বিস্তৃত যাত্রা একই ভবনে দেখতে পারেন দর্শনার্থীরা।
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইতিহাসের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ের স্মৃতিও সংরক্ষণ করছে জাদুঘরটি। এখানে রয়েছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান হল’। জুলাই আন্দোলনে শহীদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের দুই শিক্ষার্থী হৃদয় চন্দ্র তরুয়া ও মো. ফরহাদ হোসেনের বেশ কিছু স্মৃতিচিহ্ন এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে হৃদয় তরুয়ার পরিহিত পোশাকও রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে জুলাই আন্দোলনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগের স্মৃতি তুলে ধরা হয়েছে।

জাদুঘরে ঘুরতে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তারের কাছে সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় ছিল নিজের বিশ্ববিদ্যালয়েই এমন একটি জাদুঘর থাকা।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব জাদুঘর আছে, আগে জানতাম না। এখানে ইতিহাসের অনেক পুরোনো নিদর্শন স্বচক্ষে দেখতে পেরেছি। বিশেষ করে মুঘল আমলের বিভিন্ন নিদর্শন দেখেছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব এমন একটি জাদুঘর থাকা সত্যিই গর্বের বিষয়।
তবে এমন সমৃদ্ধ সংগ্রহ থাকা সত্ত্বেও জাদুঘরটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর কাছে সমান পরিচিত নয়।
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী নাফিসা কারিমা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব এমন একটি জাদুঘর থাকা আমাদের জন্য বিশেষ ব্যাপার। কিন্তু এটি এখনো শিক্ষার্থীদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পেছনের দিকে হওয়ায় অনেক সময় চোখের আড়ালেই থেকে যায়। ভেতরে এসে এত সমৃদ্ধ সংগ্রহ দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি।
শুধু প্রদর্শনী নয়, গবেষণারও জায়গা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের গুরুত্ব কেবল দর্শনীয় স্থান হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষকদের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র।
জাদুঘরের নিচতলায় রয়েছে ‘আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ কোষ গ্রন্থাগার’। এখানে বাংলা, সংস্কৃত, ফারসি, আরবি, পালিসহ বিভিন্ন ভাষার দুর্লভ পাণ্ডুলিপি, বই ও ঐতিহাসিক দলিল সংরক্ষিত রয়েছে। ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, শিল্পকলা, জাতিতত্ত্ব, প্রাচীন লিপি, লোকসংস্কৃতি ও বাংলাদেশের ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা গবেষকদের জন্য রয়েছে গবেষণার উপকরণ ও পাঠের সুযোগ।
এ ছাড়া জাদুঘরে রয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রী সংরক্ষণ গবেষণাগার। অর্থাৎ প্রদর্শনীতে রাখা নিদর্শন দেখানোর পাশাপাশি সেগুলো সংরক্ষণ এবং গবেষণার কাজও চলে একই প্রতিষ্ঠানে।
জাদুঘর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এখানে দুই হাজারের বেশি প্রত্ন ও ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। প্রাগৈতিহাসিক জীবাশ্ম, প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় মুদ্রা, পাথর ও ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য, টেরাকোটা ফলক, লোকশিল্প, পাণ্ডুলিপি, দলিল ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপকরণ বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এর সংগ্রহ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের সুপারভাইজার আলী হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারিতে বিভিন্ন যুগের ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষিত আছে এবং শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা নিয়মিত এগুলো দেখতে ও গবেষণার কাজে ব্যবহার করতে আসেন। ভবিষ্যতে জাদুঘরটিকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনাও রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের।
কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পেছনের নিরিবিলি জায়গাটিতে তাই শুধু একটি দোতলা ভবন দাঁড়িয়ে নেই; তার ভেতরে পাশাপাশি অবস্থান করছে বিভিন্ন সময়, সমাজ ও সংস্কৃতির অসংখ্য চিহ্ন।
কয়েক শতাব্দী আগের একটি মুদ্রা, পাথরে খোদাই করা ভাস্কর্য, হাতে লেখা একটি পাণ্ডুলিপি কিংবা মুঘল আমলের কামান প্রতিটি বস্তুই যেন নিজের সময়ের একটি গল্প বলে।
কোলাহলময় বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের খুব কাছেই এই নীরব জায়গাটি তাই ইতিহাসকে শুধু পড়ার নয়, চোখের সামনে দেখারও সুযোগ করে দেয়। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে এখনো কিছুটা আড়ালে থাকা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর সেই অর্থে ক্যাম্পাসের ভেতরেই লুকিয়ে থাকা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক সমৃদ্ধ ঠিকানা।
আরটিভি/এমএম




