
দেশের সমুদ্রসম্পদ, নীল অর্থনীতি ও সামুদ্রিক খাতে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি ১৩ বছর পূর্ণ করে ১৪তম বছরে পদার্পণ করেছে। বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অর্জন এবং মেরিটাইম খাতে পেশাগত দক্ষতা বিকাশে অগ্রগতির পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়টিতে রয়ে গেছে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে দীর্ঘ অপেক্ষা।
২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টির স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য চট্টগ্রামের হামিদচরে ১০৬ দশমিক ৬৬ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে প্রতিষ্ঠার এক যুগ পেরিয়ে গেলেও ঢাকার মিরপুর-১২-এর অস্থায়ী ক্যাম্পাসে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। স্থায়ী ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ এগিয়ে গেলেও নির্ধারিত সময়ে স্থানান্তর সম্ভব না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে বিলম্ব হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের এপ্রিল সেমিস্টারে চট্টগ্রামের স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্নাতক পর্যায়ের পাঠদান শুরুর প্রস্তুতি চলছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে অস্থায়ী ক্যাম্পাসনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বেরিয়ে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে বিশ্ববিদ্যালয়টি। তবে এর জন্য অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষ, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, জনবল ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থানান্তরের প্রস্তুতিও সম্পন্ন করতে হবে।
স্থায়ী ক্যাম্পাস নিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষা
বাংলাদেশের প্রথম বিশেষায়িত মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য সামুদ্রিক বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার প্রসার এবং দেশের মেরিটাইম খাতের জন্য দক্ষ জনবল তৈরি। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে ২০১৮ সালে চট্টগ্রামের হামিদচরে স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর প্রথম সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। ২০২৪ সালের ৪ মার্চ ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের প্রত্যাশা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও বিভিন্ন সময়ে নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করে শিক্ষা কার্যক্রম স্থানান্তরের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে উপাচার্যের নির্মাণকাজ পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্টদের দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশনা সেই প্রচেষ্টার অংশ।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থানান্তর সম্ভব না হওয়ায় নতুন করে অপেক্ষায় পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। সাম্প্রতিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের এপ্রিল সেমিস্টার থেকে স্নাতক পর্যায়ের পাঠদান চট্টগ্রামে শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ক্যাম্পাস স্থানান্তর সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, জনবল ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
স্থায়ী ক্যাম্পাস কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ঠিকানা নয়; এটি একাডেমিক ও গবেষণাগত সক্ষমতা বাড়ানোরও গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, আবাসন, গ্রন্থাগার, সহশিক্ষা কার্যক্রমের জায়গা এবং মেরিটাইম খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুযোগ একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী বিস্তৃত জমিতে স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে উঠলে এসব সুবিধা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে শুধু নির্মাণকাজ শেষ করাই চূড়ান্ত সাফল্য নয়। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় আবাসন, মানসম্মত গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, পরিবহন, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করে পরিকল্পিতভাবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, দাবি ও পরিবর্তন
স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের দাবি বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের। ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থীরা ১৭ দফা দাবি উত্থাপন করে আন্দোলনে নামেন। স্থায়ী ক্যাম্পাসে দ্রুত স্থানান্তরের পাশাপাশি ফি কাঠামো পুনর্বিবেচনা, আবাসন সুবিধা, শিক্ষকসংকট নিরসন এবং শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের মতো বিষয়ও ছিল তাদের দাবিতে।
আন্দোলনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন ও ফি কাঠামো সংশোধনের মতো কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি আসে। ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি’ করা হয়। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ফি কাঠামো নিয়েও সংশোধিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সব দাবি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তর, পর্যাপ্ত আবাসন এবং শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জায়গা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির অগ্রগতি মূল্যায়নে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও অবকাঠামোগত নির্মাণকাজের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা এবং সমস্যার সমাধানকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষায়িত শিক্ষায় অগ্রগতি ও সম্ভাবনা
সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মেরিটাইম বিষয়ে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়টির গুরুত্ব রয়েছে। সমুদ্রবিজ্ঞান, নৌযান নির্মাণ ও অফশোর প্রকৌশল, মেরিন ফিশারিজ, মেরিটাইম স্টাডিজ এবং সমুদ্র আইনসহ বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে এখানে। বন্দর ও শিপিং ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং নীল অর্থনীতির মতো ক্ষেত্রেও এ ধরনের বিশেষায়িত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির সাম্প্রতিক কার্যক্রমেও একাডেমিক ও পেশাগত সহযোগিতার বিভিন্ন উদ্যোগ দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ, বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তির সুযোগ, গবেষণাসংশ্লিষ্ট আয়োজন এবং জাতীয় পর্যায়ের মেরিটাইম মুট কোর্ট প্রতিযোগিতার মতো উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
২০২৬ সালের আগস্টে বিশ্ববিদ্যালয়টির চার শিক্ষার্থী কোরিয়ান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (কেওআইসিএ) বৃত্তি অর্জন করেন। একই মাসে জাতীয় মেরিটাইম মুট কোর্ট প্রতিযোগিতারও আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয়টি। এ ছাড়া সামুদ্রিক ও নৌপরিবহন খাতে একাডেমিক ও পেশাগত সহযোগিতা বাড়াতে ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
এ ধরনের উদ্যোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও পেশাগত পরিসর সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তব প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ এবং কর্মজীবনে প্রবেশের সহায়তা কতটা নিশ্চিত করা যায়, তার ওপর।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪তম বছরে পদার্পণের প্রাক্কালে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশার কেন্দ্রে রয়েছে স্থায়ী ক্যাম্পাস। পোর্ট অ্যান্ড শিপিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অষ্টম ব্যাচের শিক্ষার্থী মাজহারুল হাবিব বলেন, “বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কারণে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। কিন্তু দীর্ঘদিন অস্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম চলায় পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, আবাসন এবং ব্যবহারিক শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে নানা সীমাবদ্ধতা অনুভব করতে হয়। আমরা চাই, স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের ঘোষণা যেন আরেকটি প্রতিশ্রুতি হয়ে না থাকে; নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সুবিধাসহ শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হোক।”
অন্যদিকে, ওশানোগ্রাফি অ্যান্ড হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের ষষ্ঠ ব্যাচের শিক্ষার্থী ফেরদৌস রানা বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অর্জন আমাদের জন্য গর্বের। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বৃত্তি ও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যেতে সহায়তা করছে। তবে এসব অর্জনের পাশাপাশি নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম, পর্যাপ্ত শিক্ষক, গবেষণাগার ও আবাসন সুবিধার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা এমন একটি ক্যাম্পাস চাই, যেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমেরও পর্যাপ্ত সুযোগ থাকবে।”
সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ
বিশ্ববিদ্যালয়টির সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। প্রথমত, চট্টগ্রামের স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্থানান্তরের আগে ও পরে শিক্ষার্থীদের আবাসন, যাতায়াত এবং একাডেমিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষার মান ধরে রাখতে শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণাগার উন্নয়ন, আধুনিক পাঠ্যক্রম এবং দেশি-বিদেশি মেরিটাইম প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আর্থিক চাপ, প্রশাসনিক সেবার মান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর সাফল্য শুধু শিক্ষার্থী ভর্তি বা ডিগ্রি প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দেশের সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহার, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বন্দর ব্যবস্থাপনা, নৌপরিবহন এবং নীল অর্থনীতিতে দক্ষ জনবল তৈরিতেও অবদান রাখতে হবে।
প্রতিষ্ঠার ১৩ বছর শেষে বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি একদিকে সম্ভাবনাময় বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের দীর্ঘ অপেক্ষা তার অগ্রযাত্রার বড় অপূর্ণতা হয়ে রয়েছে।
১৪তম বছরে প্রতিষ্ঠানটির সামনে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ অবকাঠামোগত প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব সুযোগ-সুবিধায় রূপান্তর করা। ২০২৭ সালের এপ্রিল সেমিস্টারে স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয়টির দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটতে পারে। তবে প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে শুধু নতুন ক্যাম্পাসে যাত্রা শুরুর মাধ্যমে নয়, বরং সেখানে মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা, আবাসন ও শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ কতটা নিশ্চিত করা যায়, তার ওপর।
আরটিভি/ এসকেডি


