
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) চুরির ঘটনা বেড়েই চলেছে। বুটেক্স ক্যাম্পাসের মাঠ সংলগ্ন রাস্তা, ডে-কেয়ার সেন্টার ও অ্যাকাডেমিক ভবন থেকে চুরি হয়েছে একাধিক মুঠোফোন, মানিব্যাগ ও বেসিনের পানির নল।
পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলগুলো থেকেও ল্যাপটপ, মুঠোফোন ও নগদ টাকা চুরির ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা এখন পর্যন্ত চুরি যাওয়া জিনিসপত্র উদ্ধার বা ঘটনার কোনো দৃশ্যমান সমাধান পায়নি।
সবশেষ বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে ফুটবল দলের অনুশীলন চলাকালীন মাঠসংলগ্ন বসার আসনে থাকা শিক্ষার্থীদের ব্যাগ থেকে দুটি মুঠোফোন ও একটি মানিব্যাগ চুরি হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে সন্দেহজনক ব্যাক্তির ফুটেজ পাওয়া গেলেও এখনও তাকে শনাক্ত করা যায়নি।
ভুক্তভোগী ৪৮তম ব্যাচের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দুই শিক্ষার্থী শিহাব সালেহীন ও রিয়াসাদ আমিম রিশাদ ফুটবল দলের অনুশীলনে অংশ নেওয়ার সময় তাদের মুঠোফোন ও মানিব্যাগ একটি ব্যাগের ভেতরে রেখে খেলার মাঠে অনুশীলনে যান। আনুমানিক সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে অনুশীলন শেষে তারা তাদের দুটি মুঠোফোন ও মানিব্যাগ নিখোঁজের বিষয়টি জানতে পারেন।
ভুক্তভোগীরা গুগলের ‘ফাইন্ড মাই ডিভাইস’ ব্যবহার করে একটি ফোনের সবশেষ অবস্থান গুলিস্তানের সুন্দরবন স্কয়ার সুপার মার্কেট এলাকায় এবং অন্যটির অবস্থান পরদিন মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়াম সংলগ্ন এলাকায় খোঁজ পান।
ঘটনার ভুক্তভোগী শিহাব সালেহীন জানান, চুরির ঘটনায় আমাদের দুটি মুঠোফোন ও একটি মানিব্যাগ খোয়া গেছে। মানিব্যাগে জাতীয় পরিচয়পত্র, বিশ্ববিদ্যালয় ও হলের পরিচয়পত্র, র্যাপিড পাস, ব্যাংক কার্ড ও নগদ টাকা ছিল। সব মিলিয়ে আমাদের প্রায় ৯০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজে চোরের অস্পষ্ট ছবি পাওয়া গেলেও তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছি।
তিনি আরও জানান, আমরা দুজনই টিউশন করে ঢাকায় নিজেদের খরচ চালাই। ক্যাম্পাসের ভেতরে এমন ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতার পাশাপাশি কিছু আর্থিক সহায়তা পেলে আমাদের জন্য অনেক উপকার হবে।
ঘটনার আরেক ভুক্তভোগী রিয়াসাদ আমিম রিশাদ জানান, সিসিটিভি ফুটেজে ওই ব্যক্তির ছবি পাওয়া গেলেও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা-ব্যবস্থা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। প্রধান ফটক ও পকেট গেটে নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া সিসিটিভি ক্যামেরার সংখ্যা ও ফুটেজের মানও পর্যাপ্ত নয়। আমরা চাই, নিরাপত্তা-ব্যবস্থা জোরদার করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য স্থাপনাতেও চুরির ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনের ডে-কেয়ার সেন্টার থেকে একটি মুঠোফোন চুরি হয়। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ডে-কেয়ার সেন্টারের দরজা খোলা থাকার সুযোগে এক বহিরাগত সেখানে প্রবেশ করে মুঠোফোনটি নিয়ে যায়। মুঠোফোনের মালিক ডে-কেয়ারের কর্মচারী খাইরুন নেসা ঘটনার পর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানান এবং এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। তবে চুরি যাওয়া মুঠোফোনটি এখনও উদ্ধার হয়নি।
এ ছাড়া, একই মাসে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ল্যাবসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ভবনের বিভিন্ন তলার ওয়াশরুম থেকে একাধিক বেসিনের পানির নল বা ট্যাপ চুরির ঘটনাও ঘটেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলগুলোতেও একাধিক চুরির ঘটনা ঘটেছে। গত ১৪ জুলাই শহীদ আজিজ হলে ৪৮তম ব্যাচের ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী অনয় রেজার একটি ল্যাপটপ চুরি হয়।
এ ছাড়া গত ২০ জুন জি.এম.এ.জি. ওসমানী হলের ৪৭তম ব্যাচের দুই শিক্ষার্থী ফাহিম ও নাইমের মুঠোফোন চুরি হয়।
এর আগে ১ এপ্রিল সকালে বুটেক্সের ছাত্রীদের বীর প্রতীক ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম হলে ল্যাপটপ, একটি মুঠোফোন ও নগদ প্রায় চার হাজার টাকা চুরির ঘটনা ঘটে। ঘটনাগুলোর সিসিটিভি ফুটেজে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির সুযোগে বহিরাগত ব্যক্তি হলের ভেতর বিভিন্ন কক্ষে প্রবেশ করে চুরি করে নিয়ে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ আবাসিক হলগুলোতে কর্মরত আছে অস্থায়ী ৩৫ জন নিরাপত্তাকর্মী এবং পাশাপাশি ৯ জন স্থায়ী কর্মচারী নিরাপত্তা সেবা দিচ্ছে। তবে এসব নিরাপত্তাকর্মীদের দায়িত্ব পালনে অসচেতনতা ও দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। দায়িত্ব পালনের সময় নিরাপত্তাকর্মীরা কর্মস্থলে যথাযথ মনোযোগ না দিয়ে লুডু খেলাসহ স্মার্টফোন ব্যবহারে সময় কাটান বলে জানা যায় আবাসিক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে।
শিক্ষার্থীদের দাবি, নিরাপত্তাকর্মীদের দায়িত্ব পালনে আরও সতর্কতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন ধরনের মানুষ থাকে। খোলা জায়গা বা পাবলিক প্লেসে নিজের জিনিসপত্রের নিরাপত্তার বিষয়টি নিজেকেই নিশ্চিত করতে হবে। পাবলিক প্লেসে কে কখন কোন দিক দিয়ে আসে বা কী নিয়ে যায়, সেটা শতভাগ নিশ্চিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ব্যাগে মোবাইল, ল্যাপটপ বা মানিব্যাগ রেখে মাঠে খেলতে গেলে সেগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে। পুলিশ বা নিরাপত্তাকর্মী এসে কারও ব্যাগ পাহারা দেবে—এটা সম্ভব নয়। এছাড়া খেলার সময় স্পোর্টস ক্লাবের নির্ধারিত জায়গা বা রুমে এসব রাখা যেতে পারে।
নিরাপত্তার জন্য আনসার মোতায়েনের বিষয়ে তিনি বলেন, আনসারের বিষয়ে কোনো আপডেট নেই। এখানে আনসার আসার জন্য তাদের বসবাস ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে সেই সুবিধা দিতে পারছে না। এ কারণে এই মুহূর্তে আনসার আসার সম্ভাবনা নেই।
আরটিভি/এসএস


