
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে প্রার্থী হয়ে আলোচনায় আসেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী আকাশ দাস। নির্বাচনে নির্বাহী সদস্য পদে জয়ও পান তিনি।
তবে নির্বাচনের পর ধর্ষণের জন্য নারীদের দায়ী করে ফেসবুকে মন্তব্য করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একাংশের আপত্তির মধ্যে অন্যদের সঙ্গে শপথ নিতে পারেননি তিনি।
সেই আকাশ দাসকেই এবার শপথ পড়ানো হলো চাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র ১৭ দিন আগে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) আকাশ দাসকে শপথবাক্য পাঠ করান চাকসুর সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আল ফোরকান। আগামী ২২ অক্টোবর বর্তমান চাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত চাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী ছিলেন আকাশ দাস। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও সনাতন ধর্মাবলম্বী একজন শিক্ষার্থী হিসেবে ওই প্যানেল থেকে তার প্রার্থিতা নির্বাচনের সময়ই ক্যাম্পাসে আলোচনার জন্ম দেয়। শেষ পর্যন্ত নির্বাহী সদস্য পদে নির্বাচিত হন তিনি।
তবে নির্বাচনের পরই পরিস্থিতি বদলে যায়। ধর্ষণের একটি ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দেন আকাশ। সেখানে ধর্ষণের জন্য নারীদেরও দায় রয়েছে এমন মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
মন্তব্যটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শিক্ষার্থীরা তার মন্তব্যের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেন এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এর মধ্যেই চাকসু ও হল সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শপথ নেন ২৩ অক্টোবর । চাকসু ও হল সংসদের নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের একাংশ তখন জানান, আকাশ দাস শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলে তারা অনুষ্ঠান বয়কট করবেন। শেষ পর্যন্ত শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি আকাশ।
সে সময় আকাশ দাস বলেছিলেন, আমার জন্য যেহেতু সবার শপথ নিতে সমস্যা হচ্ছে, তাই আমি অনুষ্ঠানে যাইনি। তবে আমাকে অনেকেই কটু ভাষায় কথা বলেছে, যেটা আসলে ঠিক হয়নি। এখন পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি কোনো কারণ দর্শানো নোটিশ দেয়, তাহলে আমি সেটার জবাব দেব। এর বেশি কিছু আমি বলতে পারছি না।
এরপর চাকসুর প্রায় পুরো মেয়াদই শপথ না নিয়ে কাটে তার। অবশেষে বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র ১৭ দিন আগে তাকে শপথ পড়ানো হলো।
এতদিন পর এবং মেয়াদের একেবারে শেষ পর্যায়ে আকাশ দাসকে কেন শপথ পড়ানো হলো এ বিষয়ে চাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আল ফোরকান বলেন, সিদ্ধান্তটি হঠাৎ নেওয়া হয়নি। আকাশের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তদন্তকমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি চাকসুর কার্যনির্বাহী সভায় তোলা হয়।
উপাচার্য বলেন, তাকে হঠাৎ করে শপথ পড়ানো হয়নি। এতদিন তার বিরুদ্ধে তদন্তকমিটি গঠন করা হয়েছিল। তদন্ত কমিটি সার্বিক দিক বিবেচনা করে তার ব্যাপারে রিপোর্ট প্রদান করে। এরপর আমরা কার্যনির্বাহী সভায় জিনিসটি উপস্থাপন করি।
কার্যনির্বাহী সভায় চাকসুর অন্য সদস্যরাও কেন আকাশকে শপথ পড়ানো হয়নি, তার ভিত্তি জানতে চেয়েছিলেন বলে জানান উপাচার্য। তিনি বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পরই তাকে শপথ পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তদন্ত কমিটির কাছে আকাশ দাস নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন কিনা—এমন প্রশ্নে উপাচার্য বলেন, তিনি যে দোষ করেছেন, এর প্রেক্ষিতে তিনি নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তদন্ত কমিটি বলেছে, সে যেহেতু ক্ষমা চেয়েছে, তার ব্যাপারটা একটু পজিটিভলি দেখা যেতে পারে। সেই প্রেক্ষিতেই আমরা শপথ পড়িয়েছি।
আকাশ দাসের শপথের বিষয়ে চাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সাঈদ বিন হাবিব বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ভিসি স্যার তাকে শপথ পড়িয়েছেন। এটি প্রশাসনিক ব্যাপার। এ ব্যাপারে ভিসি স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সঠিক তথ্য পাবেন।
আকাশ দাসকে শপথ পড়ানোর বিরোধিতা করেছেন ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত চাকসুর সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) আইয়ুবুর রহমান তৌফিক।
তিনি বলেন, চাকসুতে নির্বাচিত হওয়ার পরপরই ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে আলোচনায় আসেন আকাশ। বিশেষ করে ধর্ষণের জন্য নারীকে দায়ী করে পোস্ট দেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদ করেন। আকাশ শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলে অনেকেই শপথ নেবেন না বলেও তখন ঘোষণা দিয়েছিলেন।
তৌফিকের ভাষ্য, পরবর্তী সময়ে তদন্ত কমিটির কমিটির কাছে ক্ষমা চান আকাশ। গত ফেব্রুয়ারিতে তার বিষয়ে ক্ষমার সিদ্ধান্ত হওয়ার পর থেকেই তিনি শপথ নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত চাকসুর মেয়াদের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে তার শপথ হলো।
তৌফিক বলেন, আমি আকাশ দাসের শপথ নেওয়ার বিষয়টি শিক্ষার্থীদের অবগত করার কথা বলেছিলাম। আইনগতভাবে সে শপথ নিতে পারলেও, চাকসুর সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার নৈতিক ভিত্তি তার নেই।
শিবিরের ‘ইনক্লুসিভ রাজনীতি’ ও আকাশ দাসকে ছাত্রশিবিরের প্যানেলে রাখার উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তৌফিক। তার অভিযোগ, সনাতন ধর্মাবলম্বী একজন শিক্ষার্থীকে প্যানেলে রেখে নির্বাচনের সময় নিজেদের ‘ইনক্লুসিভ রাজনীতি’ তুলে ধরতে চেয়েছিল ছাত্রশিবির।
তৌফিক বলেন, আকাশ দাস শিবির প্যানেলের তথাকথিত “ইনক্লুসিভ রাজনীতির” শিকার। সনাতন ধর্মাবলম্বী এই ছেলেকে শিবির কেবল রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে। চাকসু নির্বাচনের আগে তারা বোঝাতে চেয়েছে, সনাতন ধর্মাবলম্বী একজন শিক্ষার্থীকেও আমরা প্যানেলে রাখতে পারি।
আকাশ দাসের শপথ নেওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন নবাব ফয়জুন্নেসা হল সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) পারমিতা চাকমা, তিনি মেয়াদের শেষ সময়ে আকাশ দাসকে শপথ পড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে কিছুটা দূরে থাকায় আকাশের শপথের সর্বশেষ বিষয়টি সম্পর্কে শুরুতে বিস্তারিত জানতে পারেননি। তবে চাকসুর মেয়াদ যখন প্রায় শেষ, তখন তাকে নতুন করে শপথ পড়ানোর উদ্দেশ্য কী—সে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
পারমিতা চাকমা বলেন, চাকসুর মেয়াদ যেখানে শেষ, সেখানে হঠাৎ করে নতুন করে শপথ পড়ানোর মানে আমি খুঁজে পাচ্ছি না। তাদের উদ্দেশ্যটা কী, সেটাই বুঝতে পারছি না।
তিনি আরও বলেন, যার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে তাকে শপথ গ্রহণ থেকে দূরে রাখা হলো, পুরো চাকসুর সময়টাই সে কোনো কাজে সম্পৃক্ত ছিল না। এখন কী উদ্দেশ্যে তাকে নতুন করে শপথ পড়ানো হলো এই প্রশ্ন রাখছি।
মঙ্গলবার শপথ নেওয়ার পর আকাশ দাসের বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে কথা বলতে চান উপস্থিত সাংবাদিকেরা। তবে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
আগামী ২২ অক্টোবর বর্তমান চাকসুর মেয়াদ শেষ হবে। মঙ্গলবার শপথ নেওয়ার সময় বর্তমান সংসদের মেয়াদ বাকি ছিল মাত্র ১৭ দিন। যে বিতর্কের কারণে নির্বাচিত হয়েও শুরুতে অন্য প্রতিনিধিদের সঙ্গে শপথ নিতে পারেননি আকাশ দাস, চাকসুর প্রায় পুরো মেয়াদ পার হওয়ার পর শেষ ১৭ দিনের জন্য শপথ নিলেন তিনি।
আরতিভি/এসএস


