
জীবনের বাস্তবতা ও একটি চাকরির প্রকৃত মূল্য বুঝতে হলে মানুষের অন্তত কিছুদিন বেকার থাকা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও সভ্যতা ডিসিপ্লিনের নবনিযুক্ত শিক্ষক খুরশীদ আলম।
তিনি বলেন, পরিচয়হীনতা মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট।
সম্প্রতি তার সঙ্গে কথা হয় জীবনের নানা চড়াই-উতরাই, না পাওয়ার বেদনা আর শেষ পর্যন্ত সফলতার এক অবিশ্বাস্য যাত্রার গল্প নিয়ে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার গুণগত মান কমেছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমার কাছে রেজাল্ট কোন মুখ্য বিষয় না। কেউ যদি দক্ষতা অর্জন করতে পারে, তাহলে সে কোথাও আটকাবে না।
সাতক্ষীরার তালা উপজেলার আটুলিয়া গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা খোরশেদের। শৈশবে পড়াশোনায় তেমন মনোযোগ ছিল থাকলেও উপযুক্ত পরিবেশ ছিল না। ক্লাস ফোরে পড়ার পর যখন দেখলেন পড়ালেখা প্রতি আগ্রহী, বাবা তখন মাগুরার একটা মাদরাসায় ভর্তি করে দিলেন। পরীক্ষা শেষ হতেই জানা গেল ক্লাসে ফার্স্ট, কিন্তু সঙ্গে নাকি একটা বিষয়ে ফেইল। মনের ভেতর তার প্রশ্ন জাগলো, যে মাদরাসায় ফেইল করলে ফার্স্ট হওয়া যায়, সেখানে আর পড়াশোনা করা যায় না।
পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ না থাকে জামালপুর মাদরাসায় ভর্তি হয়। বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূর। বর্ষাকালে হাঁটু পর্যন্ত কাদা ঠেলে প্রতিদিন আসা-যাওয়া করতে হতো। কিন্তু সেখানেও একই ঘটনা একটি বিষয়ে ফেইল, অথচ আবার ফার্স্ট। খোরশেদ ভাবলেন, জীবনটাই এভাবে নষ্ট হয়ে যাবে।
এরপর নানার কথায় পাটকেলঘাটা আলামিন ফাজিল মাদরাসায় ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হওয়া। হোস্টেলের সুযোগ থাকলেও ছেলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে ভেবে বাবা নিষেধ করেন, তাই থাকতে হলো মসজিদ লজিংয়ে। চারশত টাকা আর তিন বেলা খাবারের বিনিময়ে মসজিদে রাতে একা থাকা। কিন্তু রাতের অন্ধকারে ভীষণ ভয় আর খারাপ খাবারের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে একদিন কাউকে কিছু না বলে বাড়ি চলে এলেন। বাবার ভয়ে মা তাকে ঘরের কোণে মাদুর দিয়ে ঢেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন।
পরবর্তীতে হোস্টেলে উঠেও স্বস্তি মেলেনি। বড় ভাইদের অত্যাচার আর গ্যাঞ্জামে পড়ার পরিবেশ ছিল না। ঠিক তখনই পাশে দাঁড়ালেন মাদরাসার নামকরা ও জনপ্রিয় শিক্ষক আশরাফ স্যার। স্যারের বাসায় জায়গা না থাকায় মুরগির কোঠা ভেঙে খোরশেদের জন্য ছোট একটা ঘর বানিয়ে দিলেন। স্যারের বিশ্বাস আর ভালোবাসার মর্যাদা দিতে কড়া শাসনে দিনরাত পড়াশোনা করলেন। দাখিল পরীক্ষায় অর্জন করলেন গোল্ডেন এ প্লাস, যা ছিল পুরো গ্রামের ইতিহাসে প্রথম।
২০০৯ সালে আশরাফ স্যারের পরামর্শে পরিবারের অমতে ঢাকায় এসে তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসায় আলিম-এ ভর্তি হলেন। মতিঝিলে যখন ফজরের আগে বাস থেকে নামলেন, অচেনা ঢাকা শহর দেখে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলেন। সঙ্গে ছিল শুধু একটি ছোট ট্রাঙ্ক।
আলিম শেষে এক ভাইয়ের এর পরামর্শে ভর্তি পরীক্ষার কোচিং শুরু হলো। ফার্মগেটের মেসে সাত হাজার টাকা হারিয়ে বাধ্য হয়ে ডাইনিং স্পেসে কষ্ট করে থেকে প্রস্তুতি চালিয়ে গেলেন। কিন্তু এরই মধ্যে আলিমের রেজাল্টে এ প্লাস মিস হয়ে গেল। বাড়ি থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হলো, পড়াশোনা করার দরকার নেই, টাকা-পয়সা আর দেওয়া হবে না।
পরিবারের সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেল। সামনে ঈদ, কিন্তু বাড়িতে কেউ যেতে বলে না। একাকী নিভৃতে কান্না করেছেন, তবুও মনের ভেতর শক্তি এনেছিলেন যে চান্স পেতেই হবে। দিনে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত পড়তে গিয়ে শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে গিয়েছিল যে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতেন না। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার দিন বন্ধু সাইদুজ্জামান নিজের পরীক্ষা বাদ দিয়ে তাকে ধরে ধরে কেন্দ্রে নিয়ে গেল।
পরিশ্রম বৃথা যায়নি। ঢাবি, রাবি, জাবি ও জবি—চার জায়গায় পরীক্ষা দিয়ে সব কটিতেই পড়ার সুযোগ পেলেন। বাবার ইচ্ছায় ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, হয়ে উঠলেন পুরো গ্রামের প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
ঢাবিতে ভর্তি হওয়ার পর সেখানে শিক্ষকতা করার তীব্র ইচ্ছা জাগে। ফার্স্ট ইয়ারে ফার্স্ট ক্লাস রেজাল্ট হলেও সেকেন্ড ইয়ারে রেজাল্ট কিছুটা খারাপ হয়, তবে থার্ড ইয়ার থেকে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেন। পরবর্তীতে মাস্টার্সে সেকেন্ড হলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা আর হলো না।
করোনার সময় বাড়িতে ফিরে উপলব্ধি করলেন। পরিচয়হীনতা মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট। তার মতে, ‘জীবনের বাস্তবতা ও চাকরির মূল্য বুঝতে মানুষের অন্তত দুই বছর বেকার থাকা প্রয়োজন।’
বিসিএসের জন্য কোনো কোচিং করেননি। মাসের পর মাস রাত-দিন শুধু পড়ালেখা নিয়ে থাকতেন, পরিবার ছাড়া সবার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন। মাস্টার্স শেষে বেসিক বই আর গাইড পড়ে প্রিলির প্রস্তুতি নেন, যা রিটেনেও সুবিধা দিয়েছিল।
দিন যায়, কিন্তু বিসিএসের রেজাল্টের খবর নেই। বাবা ছেলের পরিচয় সংকট নিয়ে দুশ্চিন্তা করতেন। পাশের বাড়িতে একজনের চাকরি হতে দেখে বাবা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘চাতক পাখির মতো চেয়ে আছি কখন বৃষ্টি হয়।’ কথাটা শুনে চোখে পানি এসে গিয়েছিল খোরশেদের।
সেই কঠিন সময়ে ছোট ভাই, যে নিজে পর্তুগালের স্কলারশিপ পেয়ে পরবর্তীতে সাউথ আফ্রিকায় পড়তে যায়, সে বলেছিল, ‘তুই টাকা-পয়সা নিয়ে টেনশন করিস না, টাকা-পয়সার বিষয় আমি আর আব্বা দেখব।’
অবশেষে বিসিএস পেয়ে প্রথম পোস্টিং টুঙ্গিপাড়া শেখ মুজিবুর রহমান কলেজে, পরে খুলনা বয়রা সরকারি মহিলা কলেজে। কিন্তু শেখানোর অনুকূল পরিবেশ না পাওয়ায় পরবর্তীতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্ত হন।
তার এই সাফল্যে বাবা-মায়ের অবদান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গ্রামে থেকে আমাদের দুই ভাইয়ের জন্য পড়া লেখার খরচ চালানোর মতো অসাধ্য সাধন করেছেন তারা। আমাদের খরচ জোগাতে গিয়ে বাবা না কখন ভালো খাবার খেয়েছে, না বাড়ি-ঘর করেছে।
তার কাছে সফলতা কি-জানতে চাইলে তিনি বলেন, টাকা-পয়সা বা ক্যারিয়ারকে আমি সফলতা হিসেবে দেখি না। মানুষ হিসেবে আমি নিজেকে গড়তে পেরেছি কি না, জাতির আমার প্রয়োজন আছে কি না। আমি যদি জাতির বোঝা না হই এবং আমার জন্য যদি মানুষ উপকৃত হয়, তহলেই আমি সফল।
আরটিভি/এমএম




