
‘আমি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরও তারা আমাকে রড ও স্ট্যাম্প দিয়ে মারতে থাকে। আমার পরিচিত মুখগুলোই আমাকে আঘাত করছিল।’ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাককানইবি) সাম্প্রতিক সংঘর্ষে মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়া ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী হোসাইন সাকিব এভাবেই বর্ণনা করেন তার ওপর হামলার ঘটনা।
গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে চলছিল নজরুল প্রিমিয়ার লীগ (এনপিএল) ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। একই মাঠের পাশে ফুটবল খেলছিলেন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীরা। খেলার মাঠের বাউন্ডারির ভেতরে বারবার ফুটবল চলে যাওয়াকে কেন্দ্র করে টুর্নামেন্টের আয়োজক ও ফুটবল খেলতে থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথমে বাকবিতণ্ডা হয়। পরে খেলা শেষে বিরোধ মীমাংসার জন্য দুই পক্ষ একত্র হলে আবারও বাগবিতণ্ডা থেকে হাতাহাতি শুরু হয়।
একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে দুই পক্ষের শিক্ষার্থীরা অগ্নিবীণা হলের সামনে এবং কলা ভবনের সামনে ও পেছনে কয়েক দফা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এতে ছয় শিক্ষার্থী আহত হন। তাদের মধ্যে চারজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে আরও দুজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে হোসাইন সাকিব বলেন, আমি বিদ্রোহী হল থেকে এক বন্ধুর সঙ্গে হাঁটতে বের হয়ে সিঙ্গারা হাউসের দিকে যাচ্ছিলাম। মূলত কী নিয়ে মারামারি হচ্ছিল, তা আমি জানতাম না। মাঠের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি, ব্যবস্থাপনা ও ফিন্যান্স বিভাগসহ কয়েকটি বিভাগের ৯০ থেকে ১০০ জন শিক্ষার্থী জড়ো হচ্ছেন। তাদের হাতে হাতুড়ি, স্ট্যাম্প, রড ও পাইপ ছিল।
তিনি বলেন, এ দৃশ্য দেখে কলা ভবনের সামনে গিয়ে নিজের বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে সতর্ক করেন এবং ঝামেলা না করে সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। এরপর তিনি নিজের মতো চলে যান। কিছুদূর যাওয়ার পর প্রক্টরের সামনেই ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সাকিবের ভাষ্য, পরে তিনি নির্মাণাধীন বিজ্ঞান অনুষদ ভবনের ফুটপাত দিয়ে পেছনের দিকে গিয়ে দাঁড়ান। সেখানে শুভ ও রবিউল নামের দুই বড় ভাই আসেন। তারা সেখান থেকে বিভাগের শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নিচ্ছিলেন এবং কার কতটা আঘাত লেগেছে, তা জানার চেষ্টা করছিলেন।
সাকিব বলেন, ঠিক তখনই ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল আমাদের দিকে এগিয়ে আসে। তাদের হাতে রড, স্ট্যাম্প ও হাতুড়ি ছিল। আমার সঙ্গে থাকা চারজন আগে দৌড়ে পালিয়ে যান। শুরুতে আমি পালানোর কথা ভাবিনি। কারণ, কল্পনাও করিনি যে তারা আমাকে মারবে, তাও আবার মেরে ফেলার মতো করে। আমি সবার শেষে দৌড় দিই। তখন শুনতে পাই, ‘এটা ইংলিশের, এটারেও ধর।’
এরপর তাকে ধাওয়া করে ধরে কলা ভবনের পেছনে একটি ড্রেনের ওপর ফেলে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন সাকিব। তিনি বলেন, তখনও আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম, এই পরিচিত মুখগুলোই আমাকে আঘাত করছে। আমার ডান হাতে ফোন ও ওয়ালেট ছিল। ড্রেনের ওপর পড়ে যাওয়ায় ফোনটি ভেঙে যায়। তাদের একজন আমার কপাল বরাবর রড দিয়ে আঘাত করে। পরপর তিনবার আঘাত করা হয়। আমি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যাই। এরপরও তারা আমাকে রড ও স্ট্যাম্প দিয়ে মারতে থাকে।
নিজের ওপর হামলায় জড়িত হিসেবে ব্যবস্থাপনা বিভাগের দিদারুল, রায়হান, মাসুদ রানা মুবিন, জিলানী, হোসাইন, আরিফ, মশিউর রহমান সাহান ও রিয়াদ এবং ফিন্যান্স বিভাগের রায়হান তালুকদার ও নসিমের নাম উল্লেখ করেন সাকিব। তার অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী সিফাতের নেতৃত্বে এ হামলা হয়। শুধু ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী হওয়ায় তাকে আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আঘাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে সাকিব বলেন, পিঠ থেকে পা পর্যন্ত আঘাতের চিহ্ন ছিল, শরীর রক্তে ভরে যাচ্ছিল। রক্ত জমে নাক বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মুখে রক্ত যাওয়ার পর আমার আবার জ্ঞান ফিরে আসে।
পরে বিভাগের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহায়তায় প্রথমে তাকে ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সাকিব জানান, সেখানে সিটি স্ক্যান ও এক্স-রে করার পর ৪৮ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। পরে তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সাকিব বলেন, আমি এখন বাসায় আছি। তবে মারধরের কারণে সারা শরীরে ব্যথা। ঘুমাতে পারছি না, মাথায় আঘাত নিয়ে শোয়া কষ্টকর। ঠিকমতো খেতেও পারছি না।
আরটিভি/জেএমএ




