
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সন্তানরা।
অন্যদিকে, গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘রিসার্চ এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০২৬’ পাওয়া শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মঞ্চে পুরস্কার না দিয়ে ব্যাকস্টেজে পুরস্কার প্রদান করা হয়। পরে তাদের ছবি তোলার জন্য দাঁড় করিয়ে রাখা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সন্তানদের মন্ত্রী ও বিশিষ্ট অতিথিদের হাত থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার দেওয়া হলেও গবেষক শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে একই ধরনের আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণ করা হয়নি। তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দিয়ে পেছনে দাঁড় করিয়ে ছবি তোলা হয়। গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার প্রদানের প্রচারণা চালানো হলেও পুরস্কার বিতরণে এমন বৈষম্য নিয়ে ক্যাম্পাসজুড়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে এ ঘটনা ঘটে। ‘রিসার্চ এক্সিলেন্স অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপস’ শীর্ষক এ পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. এ এন এম এহসানুল হক মিলন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আবদুল খালেক, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ এবং বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম শহিদুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানের পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ৩০ জন শিক্ষক ও ১৯ জন শিক্ষার্থীকে ‘রিসার্চ এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সন্তানদের মধ্যে যারা এসএসসি-২০২৩ ও এইচএসসি-২০২৫ সালের উভয় পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে, এমন পাঁচজনকে ‘ইউনিভার্সিটি কমিউনিটি চিলড্রেনস এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়ার কথা ছিল। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের আয়োজনও রাখা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সন্তানদের মন্ত্রী ও অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথিদের হাত থেকে মঞ্চে পুরস্কার দেওয়া হলেও গবেষণা পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাদের ব্যাকস্টেজে পুরস্কার দিয়ে পরে ছবি তোলার জন্য দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এতে গবেষকদের যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী প্রথমে পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষকদের, এরপর শিক্ষার্থীদের এবং সবশেষে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সন্তানদের পুরস্কার দেওয়ার কথা ছিল। তবে অনুষ্ঠানের মাঝপথে সূচি পরিবর্তন করে তৃতীয় কার্যসূচিতে থাকা শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সন্তানদের পুরস্কার বিতরণ প্রথমে করা হয়। এ পরিবর্তন নিয়ে আয়োজক কমিটির মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল বলে জানিয়েছে সূত্রটি। গবেষণা পুরস্কার প্রদানের বিষয়টি প্রচার করা হলেও পুরস্কার বিতরণের ক্ষেত্রে গবেষকদের প্রত্যাশিত মর্যাদা না পাওয়ার অভিযোগ ঘটনাটিকে ঘিরে সমালোচনা আরও বাড়িয়েছে।
এ বিষয়ে পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী মো. এন্তাজুর রহমান বলেন, গবেষণার স্বীকৃতি পাওয়া নিঃসন্দেহে আনন্দ ও গর্বের বিষয়। তবে পুরস্কার বিতরণের ক্ষেত্রে কাউকে মঞ্চে এবং কাউকে ব্যাকস্টেজে পুরস্কার দেওয়ার বিষয়টি মনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার দেওয়া হলে প্রত্যেক পুরস্কারপ্রাপ্তের জন্য সমান মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। ভবিষ্যতে এ ধরনের আয়োজনে স্বচ্ছতা ও সমতা বজায় রাখার প্রত্যাশাও জানান এ শিক্ষার্থী।
পুরস্কারপ্রাপ্ত আরেক শিক্ষার্থী মো. মাইনুদ্দিন হোসাইন বলেন, গবেষক শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজিত পর্বে তাদের যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের মন্ত্রী ও বিশিষ্ট অতিথিদের হাত থেকে পুরস্কার দেওয়া হলেও গবেষক শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিয়ে ব্যাকস্টেজে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। একজন গবেষকের কাছে পুরস্কার পাওয়ার পাশাপাশি প্রধান অতিথির হাত থেকে তা গ্রহণ করাও বিশেষ আনন্দের বিষয় উল্লেখ করে আয়োজনের ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এ শিক্ষার্থী।
আরেক পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী দিব্যেন্দু হালদার বলেন, গবেষণায় উৎসাহ জোগাতে ‘রিসার্চ এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়ার উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। তবে শিক্ষামন্ত্রী ও অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথির উপস্থিতিতে তাদের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণের যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ না হওয়ায় তারা ব্যথিত হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সন্তানরা সরাসরি অতিথিদের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করলেও গবেষণা পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ব্যবস্থা কেন নেওয়া হলো, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘কিউ১ (Q1) জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের পর একজন গবেষক এই অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। অথচ মন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সন্তানেরা। এর চেয়ে হতাশাজনক আর কিছু হতে পারে না।’ তার মতে, গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার স্বীকৃতি এবং পরীক্ষায় ভালো ফলের স্বীকৃতি—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। তবে গবেষণার জন্য নির্ধারিত পুরস্কার বিতরণের ক্ষেত্রে গবেষকদের যথাযথ গুরুত্ব ও সম্মান দেওয়া উচিত ছিল।
গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতি দিতে এ ধরনের আয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণায় আরও উৎসাহিত করার কথা। তবে পুরস্কার বিতরণে দৃশ্যমান এই পার্থক্য আয়োজনের ব্যবস্থাপনা, সমতা এবং গবেষকদের যথাযথ স্বীকৃতি নিশ্চিত করার বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ফেসবুক গ্রুপগুলোতেও পোস্ট দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক শিক্ষার্থী।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আয়োজক কমিটির একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তির সঙ্গে আরটিভি নিউজের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
আরটিভি/এসএস


