
নোবেল পুরস্কারের নাম কমবেশি সবারই জানা। মানবজাতির কল্যাণে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিজ্ঞান, সাহিত্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেওয়া হয় এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার। তবে এর এক মজার ‘ভাই’ও রয়েছে ইগনোবেল পুরস্কার।
যেসব গবেষণা প্রথমে মানুষকে হাসায়, কিন্তু পরে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে, সেসব গবেষণাকে দেওয়া হয় ইগনোবেল। ‘ইগনোবেল’ নামটি এসেছে ইংরেজি ‘ইগনোবেলে’ শব্দ থেকে, যার অর্থ মর্যাদাহীন বা সম্মানজনক নয়।
এবারের ইগনোবেল পুরস্কারেও জায়গা করে নিয়েছে বেশ কিছু ব্যতিক্রমী ও চমকপ্রদ গবেষণা। এর মধ্যে রয়েছে মাটির নিচে ১ হাজার জোড়া অন্তর্বাস পুঁতে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা, তেলাপোকার দুধের শক্তিমাত্রা, চুম্বনের বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা এবং কীভাবে সঠিকভাবে নাক ঝাড়া উচিত এমন নানা বিষয়।
ফ্রাঞ্জ বেন্ডার, মার্সেল ভ্যান ডের হেইডেন, আটলান্ট বিয়েরি ও পিয়া ভিভিয়ানি এই চার বিজ্ঞানী এমন এক পরীক্ষার জন্য পুরস্কার পেয়েছেন, যা শুনলে প্রথমে বেশ অদ্ভুত মনে হতে পারে।
তাঁরা বিশ্বের ২৫টি ভিন্ন দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১ হাজার জোড়া সুতি অন্তর্বাস মাটির নিচে পুঁতে রাখেন। পাশাপাশি ব্যবহার করা হয় টি-ব্যাগও।
এর উদ্দেশ্য অবশ্য নিছক কৌতূহল মেটানো ছিল না। বিভিন্ন অঞ্চলের মাটির গুণাগুণ ও জৈব পদার্থ ভাঙার ক্ষমতা বোঝার জন্যই এই অভিনব পরীক্ষা চালানো হয়।
৩০ দিন পর গবেষকেরা মাটির নিচ থেকে অন্তর্বাস ও টি-ব্যাগ তুলে দেখেন, সেগুলো কতটা পচেছে এবং মাটির সঙ্গে কতটা মিশে গেছে। এর মাধ্যমে মাটির জৈবিক কার্যকলাপ সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করেন তারা।
চুম্বনকে সংজ্ঞায়িত করা শুনতে সহজ মনে হলেও বিজ্ঞানীদের কাছে বিষয়টি এতটা সরল নয়। প্রচলিত সংজ্ঞাগুলো মূলত মানুষের আচরণকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু প্রাণিজগতের অন্যান্য সদস্যও ঠোঁট বা মুখ ব্যবহার করে একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ করে। তাই এমন একটি সংজ্ঞা তৈরির চেষ্টা করেন গবেষকেরা, যা শুধু মানুষের ক্ষেত্রে নয়, পুরো প্রাণীজগতের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা যায়।
গবেষকদের দেওয়া সংজ্ঞা অনুযায়ী, চুম্বন হলো—খাদ্য স্থানান্তর ছাড়া একই প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে মুখ বা ঠোঁটের নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত, আক্রমণাত্মক নয় এমন মুখে-মুখে যোগাযোগ, যেখানে ঠোঁট বা মুখের কিছু নড়াচড়া থাকে।
চুম্বনের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা যে বেশ জটিল এক সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন, তা বলাই যায়!
দুধ বলতেই সাধারণত গরু, ছাগল কিংবা উদ্ভিদভিত্তিক দুধের কথা মনে আসে। কিন্তু তেলাপোকার দুধের কথা শুনলে অনেকেরই ভ্রু কুঁচকে যেতে পারে।
তবে বিশেষ এক প্রজাতির তেলাপোকা ডিপ্লোপটেরা পাঙ্কটাটা বাচ্চাদের খাওয়ানোর জন্য এক ধরনের দুধজাতীয় পুষ্টিকর পদার্থ উৎপন্ন করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই পদার্থে গরুর দুধের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি শক্তি রয়েছে। তেলাপোকার এই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতিও জায়গা করে নিয়েছে ইগনোবেল পুরস্কারে।
নাক ঝাড়ার মতো দৈনন্দিন একটি কাজ নিয়েও যে বৈজ্ঞানিক গবেষণা হতে পারে, সেটিই দেখিয়েছে এবারের ইগনোবেল।
জাপানের এক বিজ্ঞানী নাক ঝাড়ার সময় কী পরিমাণ গতি ও শক্তি প্রয়োগ করা হয়, তা পরিমাপ করতে ৬০টি পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, যারা সঠিকভাবে নাক ঝাড়তে জানেন না, তাঁদের জন্য একটি কার্যকর নির্দেশনা তৈরি করা।
গবেষণায় নাক পরিষ্কার করার পদ্ধতি এবং এর সঙ্গে ব্যথা ও সংক্রমণের সম্ভাবনার সম্পর্কও বিবেচনা করা হয়।
অর্থাৎ, পরেরবার সর্দি-জ্বরে নাক ঝাড়ার সময়ও বিজ্ঞানীদের এই গবেষণার কথা মনে পড়তে পারে!
নতুন বাবা-মায়ের কাছে নিজের শিশুর শরীরের গন্ধ অনেক সময়ই বিশেষ আকর্ষণীয় মনে হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর গন্ধ শোঁকার সময় বাবা-মায়ের মস্তিষ্কে আনন্দ ও পুরস্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। এই গন্ধ বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে বন্ধন তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু সন্তান যখন ধীরে ধীরে কিশোর-কিশোরীতে পরিণত হয়, তখন পরিস্থিতি বদলে যায়।
২৩৫ জন বাবা-মাকে নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরের গন্ধ বাবা-মায়ের কাছে আগের মতো আকর্ষণীয় থাকে না।
গবেষকদের ধারণা, এর সঙ্গে সন্তানের স্বাধীন হয়ে ওঠার বিষয়টি সম্পর্কিত হতে পারে। ছোট শিশুর সঙ্গে বাবা-মায়ের যে ঘনিষ্ঠ বন্ধন প্রয়োজন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই নির্ভরতার প্রয়োজন কমে আসে। ফলে শিশুর গন্ধের প্রতি বাবা-মায়ের মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়াতেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
হাস্যকর বা অদ্ভুত মনে হলেও এসব গবেষণার পেছনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন। আর সেই কারণেই ইগনোবেল পুরস্কারের মূল দর্শন ‘প্রথমে হাসায়, তারপর ভাবায়।’
আরটিভি/এসকে


