বিশ্বের দ্বিতীয় শীতলতম রাজধানী হিসেবে পরিচিত কাজাখস্তানের রাজধানী আস্তানা। বছরের বড় একটি সময় তীব্র শীতের জন্য পরিচিত এই শহর এখন নজিরবিহীন তাপপ্রবাহের কবলে। চলতি গ্রীষ্মেই ভেঙেছে কয়েক দশকের পুরোনো তাপমাত্রার রেকর্ড। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সাময়িক কোনো আবহাওয়াগত অস্বাভাবিকতা নয়; বরং মধ্য এশিয়াজুড়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা জলবায়ুরই স্পষ্ট প্রতিফলন। এর প্রভাব ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য, কৃষি, পানি ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর আরও গভীর হবে।
গ্রীষ্ম মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই আস্তানায় দুটি রেকর্ড গড়া তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। গত ১৪ জুলাই শহরটির তাপমাত্রা ওঠে ৩৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এতে ৩৪ বছর আগে একই দিনে রেকর্ড হওয়া ৩৫ দশমিক ৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা ভেঙে যায়। এরও আগে, ২৩ জুন তাপমাত্রা পৌঁছায় ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা ১৯৪১ সালের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যায়।
শুধু রাজধানী নয়, তীব্র গরমে পুড়ছে পুরো কাজাখস্তান। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি, আর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কোথাও কোথাও তা ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে। জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা কাজহাইড্রোমেট জানিয়েছে, জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলে ৩৫ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা অব্যাহত থাকতে পারে।
অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে, গত সপ্তাহজুড়ে জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা ‘১১২’-এর মাধ্যমে নাগরিকদের বারবার সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ভিডিওও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে প্রচণ্ড রোদের উত্তাপে গরম হয়ে যাওয়া রাস্তার ওপর ডিম ভেজে দেখাচ্ছেন স্থানীয়রা।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) জানিয়েছে, কাজাখস্তানের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকা জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কার্যকর অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার শহরগুলোতে তাপপ্রবাহজনিত মৃত্যুর সংখ্যা তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
তবে কাজাখস্তানে তাপপ্রবাহে প্রতিবছর কত মানুষ মারা যান, তার নির্দিষ্ট কোনো জাতীয় পরিসংখ্যান নেই। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ ধরনের মৃত্যুর জন্য এখনো আলাদা কোনো তথ্যভাণ্ডার বা সূচক চালু হয়নি।
এ ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ হিট-হেলথ অ্যাকশন প্ল্যানও এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। যদিও প্রবীণ, শিশু এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তাপপ্রবাহ-সংক্রান্ত সতর্কতা ও স্বাস্থ্যপরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
ডব্লিউএইচওর ইউরোপ অঞ্চলের পরিচালক হ্যান্স অঁরি পি. ক্লুজের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে মধ্য এশিয়ায় তাপপ্রবাহজনিত মৃত্যুর হার দ্রুত বাড়বে। বিশেষ করে কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তান সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকবে। তাই পরবর্তী গ্রীষ্মের আগেই প্রতিটি দেশের কার্যকর হিট-হেলথ অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়ন করা জরুরি।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, যেসব দেশ এমন পরিকল্পনা কার্যকর করেছে, সেখানে তাপপ্রবাহজনিত অতিরিক্ত মৃত্যু প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান তাপপ্রবাহ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা বৈশ্বিক উষ্ণায়নেরই ফল।
কাজহাইড্রোমেটের তথ্য বলছে, বিশ্বের গড়ের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে কাজাখস্তান। ২০২৫ সাল ছিল দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর। ওই বছর গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ দশমিক ৯৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
এর ফলে ৩০ ও ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার দিনের সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে খরা ও দাবানলের ঝুঁকি। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চলে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। যদিও অধিকাংশ আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে, তবু দীর্ঘস্থায়ী গরমের কারণে নতুন করে দাবানলের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
অন্যদিকে, আগেভাগে তুষার গলে যাওয়ায় বসন্তের বন্যা দ্রুত দেখা দিচ্ছে। এতে সেচের জন্য জলাধারে পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তুলনামূলক উষ্ণ শীতের কারণে মাটির গভীরে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতাও পৌঁছাচ্ছে না, যা কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫০ সালের পর থেকে কাজাখস্তানের হিমবাহগুলো তাদের মোট ভরের ১৪ থেকে ৩০ শতাংশ হারিয়েছে। বর্তমানে হিমবাহ দ্রুত গলার কারণে নদীতে সাময়িকভাবে পানির প্রবাহ বাড়লেও শতাব্দীর শেষ দিকে পরিস্থিতি উল্টো হয়ে ভয়াবহ পানিসংকট দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সির দরিয়া, ইলি ও অন্যান্য পার্বত্য নদীর পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে মধ্য এশিয়াজুড়ে পানি, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান গম রপ্তানিকারক দেশ কাজাখস্তানের জন্য দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ ও খরা কৃষি উৎপাদন, চারণভূমি এবং পানির সরবরাহকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এর প্রভাব শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে নয়, পুরো অঞ্চলের খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে। সূত্র: ইউরো নিউজ
আরটিভি/এমএইচজে




