বিমান হামলায় বাবাকে হারিয়েও দেশসেরা গাজার এই তরুণী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬ , ০৭:৫১ পিএম


বিমান হামলায় বাবাকে হারিয়েও দেশসেরা গাজার এই তরুণী
ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবির আল-মাগাজিতে পরিবারের সঙ্গে উল্লাস করছে ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থী সাবা রাবাহ। ছবি: সংগৃহীত

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার আকাশে যখন একের পর এক বোমার বিস্ফোরণ, চারদিকে মৃত্যু আর ধ্বংসস্তূপ— ঠিক সেই সময়ই নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন ১৮ বছর বয়সী সাবা রাবাহ। চূড়ান্ত পরীক্ষার মাত্র কয়েক দিন আগে অস্থায়ী আশ্রয়ের সামনের বাড়িতে ভয়াবহ বোমা হামলা হয়। প্রাণ বাঁচাতে পরিবার নিয়ে আবারও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে হয় তাকে।

তবে যুদ্ধ, স্বজন হারানোর বেদনা আর বারবার বাস্তুচ্যুতির মতো কঠিন বাস্তবতাও তার শিক্ষার পথ থামাতে পারেনি। সব প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে ফিলিস্তিনের জাতীয় মাধ্যমিক পরীক্ষা তাওজিহি-তে বিজ্ঞান বিভাগে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে দেশসেরা হয়েছেন গাজার এই মেধাবী শিক্ষার্থী। পরীক্ষায় তিনি অর্জন করেছেন ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ নম্বর।

২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এবারই প্রথম ফিলিস্তিনে তাওজিহি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। গত জুনে গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর, মিসরসহ বিভিন্ন দেশে একযোগে অনুষ্ঠিত এ পরীক্ষায় অংশ নেন প্রায় ৮৯ হাজার শিক্ষার্থী। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগেই পরীক্ষার্থী ছিলেন ২৫ হাজারের বেশি।

যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞে গাজার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। যেসব স্কুল এখনো টিকে আছে, সেগুলোর অনেকগুলোই বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ফলে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শিশু দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।

অবিশ্বাস্য এই সাফল্য সাবা উৎসর্গ করেছেন তার মা, ভাইবোন, শিক্ষক এবং বিশেষ করে প্রয়াত বাবা ফায়েদ রাবাহকে। তিনি জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা আনরওয়া (UNRWA) পরিচালিত একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ২০২৪ সালের জুনে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন তিনি। এর কয়েক মাস আগে জানুয়ারিতে আল-মাগাজি শরণার্থী শিবিরে পরিবারের নিজ বাড়িটিও ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর থেকে পরিবারটিকে একাধিকবার আশ্রয় বদল করতে হয়েছে।

ফল প্রকাশের পর আল-মাগাজি শরণার্থী শিবিরে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। প্রতিবেশী ও স্বজনরা সাবাকে ঘিরে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন। সমাবর্তনের পোশাক পরা সাবাকে অভিনন্দন জানাতে তরুণরা ড্রাম বাজান, ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান প্রতিবেশীরা।

আরও পড়ুন

তবে এই আনন্দের মাঝেও ছিল গভীর বেদনার ছায়া। ঘরের দেয়ালে টাঙানো নিহত বাবার ছবির নিচে দাঁড়িয়ে সাফল্য উদযাপনের মুহূর্তটি হয়ে ওঠে আবেগঘন।

সাবার এই অর্জনের পেছনে রয়েছে কঠিন সংগ্রামের গল্প। বারবার আশ্রয় পরিবর্তনের কারণে তার অনেক বই-খাতা হারিয়ে যায়। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট না থাকায় রাতের পর রাত মায়ের মোবাইল ফোনের টর্চের আলোয় পড়াশোনা করতে হয়েছে তাকে। এমনকি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্য এলাকায় গিয়ে প্রাইভেট পড়া ও পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে। প্রতিটি যাত্রাপথেই ছিল হামলার আতঙ্ক।

ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন সাবা। তিনি বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়া ছিল তার বাবার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাবৃত্তি পেলে সেই স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যেতে পারবেন বলে বিশ্বাস তার।

সাবার মা ফেরিয়াল আহমেদ রাবাহ বলেন, অসীম শোক, যুদ্ধ আর সীমাহীন কষ্টের মধ্যেও মেয়ের এই সাফল্য তাদের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। দীর্ঘদিনের বেদনার পর এমন আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সূত্র: ফ্রান্স টুয়েন্টি ফোর

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission