
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্কুল ছুটি শেষে পুনরায় খুলতে শুরু করেছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের স্মার্টফোনবিহীন শ্রেণিকক্ষের এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অন্তত ৩৯টি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসিতে স্কুলে ফোন ব্যবহারের ওপর নতুন নীতিমালা কার্যকর হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক ও অভিভাবকরা প্রযুক্তির ক্ষতিকর প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসলেও, এই নীতি নির্ধারণী আলোচনাগুলোতে তরুণদের মতামত অনেকটাই উপেক্ষিত ছিল।
তবে অনেক শিক্ষার্থীই স্কুলে স্ক্রিন-টাইম কমানোর এই উদ্যোগকে সমর্থন করছেন। তাদের মতে, এসব নীতিমালা প্রায়শই অপরিকল্পিতভাবে প্রয়োগ করা হয় এবং এটি স্ক্রিন আসক্তির মূল কারণগুলোকে সমাধান করতে পারে না। এর ফলে, শিক্ষার্থীরা এখন নিজেদের 'ডিজিটাল সুস্থতা' নিশ্চিত করতে এবং প্রযুক্তিমুক্ত শিক্ষার পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে অফলাইন সহায়তা ও বিকল্প কর্মসূচির দাবি তুলছে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া নতুন আইনে স্কুলগুলোকে ক্যাম্পাসে ফোন ব্যবহার সীমিত করার নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অরেঞ্জ কাউন্টি স্কুল অব দ্য আর্টসের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী এলিস চোই মনে করেন, কেবল ডিভাইস আটকে রাখা খুব একটা কার্যকর হবে না, কারণ শিক্ষার্থীরা নিয়ম ভাঙার উপায় ঠিকই খুঁজে বের করবে। তার মতে, শিক্ষার্থীরা ডিভাইসে কতটা সময় কাটাচ্ছে তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই সময়টা তাদের ওপর কী প্রভাব ফেলছে।
চোই এবং তার মতো অনেক শিক্ষার্থী এখন স্কুলগুলোতে 'ডিজিটাল ওয়েলনেস এডুকেশন' বা ডিজিটাল সুস্থতা বিষয়ক শিক্ষার দাবি জানাচ্ছেন, যাতে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারে কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। তারা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় কাটানোর কারণে তরুণদের মধ্যে অনিদ্রা ও মনোযোগহীনতা বাড়ছে, যা শ্রেণিকক্ষের বাইরেও ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।
এদিকে, অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের স্কুলেই স্মার্টফোন নিষেধাজ্ঞার নীতিমালা তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। ক্যালিফোর্নিয়ার টাস্টিনের লিগ্যাসি ম্যাগনেট একাডেমির শিক্ষার্থী লিভ কংয়ের নেতৃত্বে একটি দল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে নতুন নীতিমালা তৈরি করেছে। এক বছর আগে স্কুল কর্তৃপক্ষ একতরফাভাবে ফোন নিষিদ্ধ করলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।
পরে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে কেবল ক্লাস চলাকালীন ফোন নিষিদ্ধ এবং বিরতির সময় ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে নতুন নিয়ম চালু করা হয়। একইভাবে সান ডিয়েগোতে ফোন নিষেধাজ্ঞার পর শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রশমনে কাজ করছেন ১৭ বছর বয়সী ভিহান ভরদ্বাজ। তিনি শিক্ষা কর্মকর্তাদের সাথে মিলে এমনভাবে নীতিমালাগুলো প্রচারের চেষ্টা করছেন, যাতে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারে যে এসব নিয়ম তাদের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ নয়, বরং তাদের সহায়তার জন্যই করা হয়েছে।
স্মার্টফোনের বিকল্প হিসেবে অফলাইন সংযোগ ও বিনোদনের ব্যবস্থা করতেও এগিয়ে আসছে শিক্ষার্থীরা। নিউইয়র্কে গত বছর ক্লাস চলাকালীন ফোন নিষিদ্ধ করার পর 'হ্যাশট্যাগ হাফ দ্য স্টোরি' নামের একটি অলাভজনক সংস্থার সহায়তায় শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রযুক্তিমুক্ত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় একটি গ্রামীণ স্কুলে আর্ট প্রোগ্রাম চালুর জন্য 'ক্রাফটস কার্ট' স্থাপন করা হয়েছে।
ব্রঙ্কসের ডেমোক্রেসি প্রেপ এন্ডুরেন্স হাইস্কুলের সাম্প্রতিক স্নাতক কেইডেন বোয়াহেন একটি অনুদানের সাহায্যে 'ওয়েলনেস ডে' আয়োজন করেন, যেখানে প্রায় ১০০ শিক্ষার্থী ফোন ছাড়াই খেলাধুলা ও আড্ডার মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়।
পাশাপাশি, লাজুক স্বভাবের বা ইন্ট্রোভার্ট শিক্ষার্থীদের সামাজিকীকরণে সহায়তার জন্য লং আইল্যান্ডের ভ্যালি স্ট্রিম নর্থ হাইস্কুলে এই শরৎকাল থেকে একটি 'ডিটক্স রুম' চালু হতে যাচ্ছে। বই ও স্ট্রেস রিলিজের খেলনা দিয়ে সাজানো এই রুমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও মানসিক প্রশান্তি খোঁজার সুযোগ পাবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্মার্টফোন নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি তরুণদের মানসিক বিকাশে এমন অফলাইন উদ্যোগগুলোই হয়ে উঠতে পারে আগামী দিনের শিক্ষার অন্যতম অনুষঙ্গ।
আরটিভি/টিআর


