
বলিউড তারকাদের ঘিরে হামলা ও হুমকির ঘটনায় আবারও আলোচনায় কুখ্যাত গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোই। মুম্বাইয়ে অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনার পর বিষ্ণোই চক্রের নামে ছড়িয়ে পড়া একটি বার্তায় হামলার দায় স্বীকারের পাশাপাশি সালমান খানের সঙ্গে কাজ করা ব্যক্তিদেরও হুমকি দেওয়া হয়েছে। তবে বার্তাটির সত্যতা এবং হামলার সঙ্গে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
কারাগারে বন্দী থাকা সত্ত্বেও অপরাধজগতের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা, বিদেশে অবস্থানরত সহযোগীদের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের প্রভাব ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছেন লরেন্স বিষ্ণোই। পাঞ্জাবি গায়ক সিধু মুসেওয়ালা হত্যা, সালমান খানের বাসভবনের বাইরে গুলি এবং মহারাষ্ট্রের সাবেক মন্ত্রী বাবা সিদ্দিকি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়ও তার নাম উঠে এসেছে।
১৯৯৩ সালে ভারতের পাঞ্জাবে জন্ম লরেন্স বিষ্ণোইয়ের। শৈশব কাটে আবোহার এলাকায়। পরে পড়াশোনার জন্য চণ্ডীগড়ে যান। সেখানে ডিএভি কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন। এ সময়ই গোল্ডি ব্রারের সঙ্গে তার পরিচয় হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ছাত্ররাজনীতিকে কেন্দ্র করে বিরোধ ও সংঘাতের পর ধীরে ধীরে অপরাধজগতে জড়িয়ে পড়েন তিনি বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে হামলা, হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধের একাধিক মামলা রয়েছে।
গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ার পরও অপরাধজগতের সঙ্গে তার যোগাযোগ অব্যাহত ছিল বলে তদন্তকারীদের অভিযোগ। তাদের দাবি, কারাগারের বাইরে থাকা সহযোগীদের মাধ্যমে চক্রের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
বর্তমানে গুজরাটের আহমেদাবাদের সবরমতি কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী রয়েছেন লরেন্স বিষ্ণোই। তাকে অন্য কারাগারে স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
লরেন্স বিষ্ণোইয়ের সঙ্গে বলিউড অভিনেতা সালমান খানের বিরোধের সূত্র ১৯৯৮ সালের কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের ঘটনা। রাজস্থানে ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়’ সিনেমার শুটিং চলাকালে দুটি কৃষ্ণসার হরিণ হত্যার অভিযোগ ওঠে সালমানের বিরুদ্ধে।
বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে কৃষ্ণসার হরিণ পবিত্র প্রাণী হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় ঘটনাটি ঘিরে ক্ষোভ তৈরি হয়। ২০১৮ সালে এ মামলায় সালমান খানকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। পরে জামিনে মুক্তি পান তিনি।
একই বছর সালমানকে হত্যার হুমকি দেওয়ার ঘটনা সামনে আসে। পরবর্তী সময়েও অভিনেতার কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে বিষ্ণোইয়ের বিরুদ্ধে।
২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় সালমানের বাসভবন গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টসের বাইরে মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি গুলি চালান। পরে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের তদন্তে এ ঘটনার সঙ্গে বিষ্ণোই চক্রের যোগসূত্রের কথা উঠে আসে। এরপর থেকে সালমানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ে।
২০২২ সালের ২৯ মে পাঞ্জাবি গায়ক সিধু মুসেওয়ালা হত্যাকাণ্ডের পর বড় পরিসরে আলোচনায় আসে বিষ্ণোই চক্রের নাম। বিদেশে অবস্থানরত গোল্ডি ব্রার ওই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেন। ভারতের তদন্তকারী সংস্থাগুলোও এ ঘটনায় লরেন্স বিষ্ণোইয়ের সহযোগীদের অভিযুক্ত করে।
এরপর ২০২৪ সালের ১২ অক্টোবর মুম্বাইয়ে খুন হন মহারাষ্ট্রের সাবেক মন্ত্রী বাবা সিদ্দিকি। সালমান খানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। হত্যাকাণ্ডের পর বিষ্ণোই চক্রের নামে ছড়িয়ে পড়া একটি বার্তায় সালমানকে সহায়তাকারীদের হুমকি দেওয়া হয়। এতে অভিনেতাকে ঘিরে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দেয়।
২০২৫ সালে কানাডার সারেতে কৌতুকাভিনেতা কপিল শর্মার ক্যাফেতে একাধিকবার গুলি চালানোর ঘটনাও আলোচনায় আসে। একটি হামলার দায় স্বীকার করে ছড়ানো বার্তায় সালমানের সঙ্গে কপিলের সম্পর্কের প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পরিচালক রোহিত শেঠির মুম্বাইয়ের জুহুর বাড়িতে গুলির ঘটনার পরও বিষ্ণোইয়ের সহযোগী পরিচয়ে দায় স্বীকারের বার্তা সামনে আসে। এসব ঘটনার সঙ্গে চক্রটির সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি প্রতিটি ক্ষেত্রেই তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিবেচনা করা জরুরি।
কারাগারে বন্দী থেকেও অপরাধচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার অভিযোগ লরেন্স বিষ্ণোইকে নিয়ে আলোচনার অন্যতম বিষয়। তদন্তকারীদের দাবি, তার সহযোগীরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং দেশের বাইরে অবস্থান করেও চক্রের কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে।
সিএনএনের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে কারাগার থেকে যোগাযোগ, বিদেশে অবস্থানরত সহযোগীদের ভূমিকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে বিষ্ণোই চক্রের কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থার অভিযোগপত্রের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চক্রের সদস্যদের মধ্যে তথ্য সীমিত রাখার কৌশল অনুসরণ করা হয়। এতে তদন্তকারী সংস্থার পক্ষে অপরাধের পরিকল্পনা, নির্দেশদাতা এবং মাঠপর্যায়ে হামলাকারীদের মধ্যে যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হতে পারে।
তবে এসব অভিযোগের ভিত্তিতে চক্রটির প্রতিটি অপরাধে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের সরাসরি নির্দেশ বা অংশগ্রহণ ছিল এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
তারকাদের লক্ষ্য করে হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায় স্বীকারের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিশ্লেষকদের নজরে রয়েছে। এ ধরনের বার্তা হামলার শিকার ব্যক্তি ও তার ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে অপরাধী চক্রের পরিচিতি, প্রভাব এবং ভীতিকর ভাবমূর্তি ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
তবে কোনো গোষ্ঠীর নামে বার্তা ছড়িয়ে পড়লেই সেই গোষ্ঠী হামলার সঙ্গে জড়িত এমনটি ধরে নেওয়া যায় না। বার্তার উৎস, সত্যতা, হামলাকারীদের পরিচয় এবং তদন্তে পাওয়া তথ্য যাচাই করা জরুরি।
টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলির ঘটনার পর বলিউড তারকাদের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সালমান খানের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তবে বিষ্ণোই চক্রের নামে ছড়িয়ে পড়া বার্তার সত্যতা এবং হামলার সঙ্গে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের সরাসরি যোগসূত্র তদন্তে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এ ঘটনায় তার ভূমিকা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
আরটিভি/এসকে


