
বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে প্রায় ২০ কোটি মুসলিমের রাজনৈতিক অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব কতটা নিশ্চিত? দেশটির গণতন্ত্র কি মুসলিম সংখ্যালঘুদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে? কারাবন্দি মুসলিম গবেষক শারজিল ইমামের এক সাক্ষাৎকার ঘিরে ভারতে নতুন করে এই বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এমন তথ্য প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর দিল্লির কারাগার থেকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য কুইন্ট’-কে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে দেশটির জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সংবিধান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ৩৮ বছর বয়সী শারজিল। তার দাবি, ভারতে প্রায় ২১ কোটি মুসলিম থাকলেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তাদের রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত সীমিত। ভারতের জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ মুসলিম হলেও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ পর্যাপ্ত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শারজিলের অভিযোগ, ভারতের সংবিধানে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং দেশটির ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তার মতে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কে এই শারজিল ইমাম?
ভারতের বিহার রাজ্যের জাহানাবাদ জেলার বাসিন্দা শারজিল ইমাম মুম্বাইয়ের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়াশোনা করেন। পরে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করলেও একসময় গবেষণায় ফিরে যান। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতের মুসলিমদের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছিলেন তিনি।
২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদি সরকারের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাসের পর দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। মুসলিম নারীদের নেতৃত্বে দিল্লির শাহিনবাগে দীর্ঘদিনের অবস্থান কর্মসূচি আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। শারজিল ছিলেন ওই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে আন্দোলনের সময় দেওয়া বক্তব্যের জেরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে দিল্লির সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় উসকানি ও ষড়যন্ত্রসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ওই সহিংসতা শুরু হওয়ার সময় তিনি কারাগারে ছিলেন। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন মুসলিম শিক্ষার্থী ও অধিকারকর্মীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তারা দীর্ঘদিন ধরে বিচার ছাড়াই কারাবন্দি রয়েছেন বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ।
গান্ধী-নেহরুর রাজনীতি নিয়েও প্রশ্ন
সাক্ষাৎকারে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধী ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর রাজনৈতিক দর্শন নিয়েও সমালোচনা করেন শরজিল। তার দাবি, কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি এবং ক্ষমতাসীন বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মধ্যে মৌলিক কিছু মিল রয়েছে। উভয় ধারাই ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও রাজনৈতিক ক্ষমতা ভাগাভাগির ক্ষেত্রে একই ধরনের ধারণা অনুসরণ করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে শারজিলের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন অনেক বিশ্লেষক। আইন গবেষক মোহাম্মদ জিশান আহমদের মতে, শরজিল গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলেছেন। তবে ধর্মনিরপেক্ষতা ও হিন্দুত্ববাদকে একইভাবে দেখা যুক্তিসংগত নয়। তার মতে, মুসলিম সমাজের ভেতরে শ্রেণি, জাতপাত, নারী অধিকার ও মতাদর্শগত পার্থক্যও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে তুরস্কের ইবনে খালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইরফান আহমদ মনে করেন, ভারতের মুসলিমদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকট শুধু কোনো একটি রাজনৈতিক দলের কারণে নয়; বরং দেশটির জাতীয়তাবাদের ধারণার মধ্যেই এর শিকড় রয়েছে।
মুসলিমদের জন্য আলাদা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি
শারজিল ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব চালুর পক্ষে মত দিয়েছেন। তার মতে, বর্তমান নির্বাচনী পদ্ধতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠদের প্রভাব বেশি থাকায় মুসলিমরা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ছেন। এ ক্ষেত্রে কবি ও দার্শনিক মুহাম্মদ ইকবালের রাজনৈতিক চিন্তাধারার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তবে তার এসব বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন অনেকে। তাদের মতে, শারজিলের প্রস্তাব ভারতের সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
এদিকে শারজিলের সঙ্গে একই মামলায় কারাবন্দি আরেক সাবেক শিক্ষার্থী নেতা উমর খালিদের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। উমর খালিদ ভারতের সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষতার কাঠামোর মধ্যে থেকেই রাজনৈতিক আন্দোলনের পক্ষে কথা বলেন। তার মুক্তির দাবিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিভিন্ন ব্যক্তি ও মানবাধিকার সংগঠন সরব হয়েছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, উমর খালিদের বিষয়ে উদারপন্থী ও বামপন্থীদের সরব অবস্থান থাকলেও শারজিলের ক্ষেত্রে তাদের অনেকেই নীরব। এর কারণ হিসেবে শারজিলের রাজনৈতিক বক্তব্যে ধর্মীয় পরিচয় ও মুসলিমদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে শারজিল ইমামের সাক্ষাৎকার ভারতের মুসলিমদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দেশটির গণতন্ত্রে সংখ্যালঘুদের অবস্থান কতটা শক্তিশালী, সেই প্রশ্নও আবার সামনে এসেছে।
সূত্র: আল জাজিরা
আরটিভি/জেএমএ




