
শান্তি প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক আইন শক্তিশালী করা এবং যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক বিশিষ্ট আইনজ্ঞ নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে তার দীর্ঘদিনের ভূমিকার প্রশংসা করেছে নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নরওয়ের রাজধানী অসলোতে নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি এ পুরস্কারের বিজয়ী হিসেবে তার নাম ঘোষণা করে। এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মোট ২৮৭ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মনোনয়ন পেয়েছিল। তাদের মধ্য থেকে নাভি পিল্লাইকে নির্বাচিত করা হয়।
১৯৬৩ সালে নাভি পিল্লাই দক্ষিণ আফ্রিকার নাটাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি এবং ১৯৬৫ সালে আইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ল স্কুলে পড়াশোনা করেন। সেখান থেকে ১৯৮২ সালে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং ১৯৮৮ সালে আইন বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। নাভি পিল্লাই প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকান, যিনি হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে আইন বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।
নোবেল কমিটির ভাষ্য, অসাধারণ সাহস ও সততার সঙ্গে নাভি পিল্লাই বিশ্বজুড়ে আরও কার্যকর আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ দেখিয়েছেন। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত নাভি পিল্লাই দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে বর্ণবাদী শাসনামলে জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের শুরু থেকেই তিনি বর্ণবৈষম্য, বিচ্ছিন্নতা ও সামাজিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার বিচারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাসহ অন্যদের পক্ষে আইনি লড়াইও করেছেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার উচ্চ আদালত, রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নাভি পিল্লাই। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ছিলেন। সম্প্রতি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। বর্তমানে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় নাভি পিল্লাইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো যৌন সহিংসতাকে গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা। রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার অংশ হতে পারে—এমন আইনি স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠায় তার প্রভাব ছিল গুরুত্বপূর্ণ। একই মামলায় প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে গণহত্যায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগেও একজন আসামির বিচার হয়। এ ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য ছিল।
নোবেল কমিটি বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যুদ্ধ ও সহিংসতা প্রতিরোধ করা সম্ভব—নাভি পিল্লাইয়ের কর্মজীবনে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রনেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং সহিংসতা ও সংঘাতের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচারের আশা জোগাতে তিনি কাজ করেছেন। তার স্বাধীনতা, দক্ষতা ও দৃঢ় অবস্থান তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সম্মানিত আইনজ্ঞদের একজন করে তুলেছে।
নোবেল কমিটির মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। কেবল শক্তিশালী রাষ্ট্রের ইচ্ছা বা সামরিক শক্তির ভারসাম্যের ওপর নয়, বরং আইনি নীতির ভিত্তিতে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। কূটনীতি, চুক্তি ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির গুরুত্বও বেড়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থা এখন নানা চাপে রয়েছে। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর অনেক সময় দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা এবং আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ওপর আক্রমণ আইনের শাসনকে দুর্বল করছে বলে মনে করে নোবেল কমিটি। তাদের মতে, আইনের বদলে শক্তির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হলে স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক আস্থা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এমন পরিস্থিতিতে নাভি পিল্লাইকে পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনের শাসনের গুরুত্ব তুলে ধরতে চেয়েছে নোবেল কমিটি। তাদের বক্তব্য, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ন্যায়বিচার অপরিহার্য। আইনের শাসন ছাড়া বিশ্বব্যবস্থা অন্যায্য, অদূরদর্শী ও অমানবিক হয়ে ওঠে।
নোবেল কমিটি আরও বলেছে, আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করা এবং বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা রক্ষা করতে সাহসী ও দৃঢ়চেতা মানুষের প্রয়োজন। নাভি পিল্লাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবন ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় আশার আলো দেখায়। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থাকে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে তিনি দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছেন।
সূত্র: নোবেল প্রাইজ অর্গানাইজেশন
আরটিভি/জেএমএ




