
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সোনোমা থেকে সান ফ্রান্সিসকোর দিকে প্রশান্ত মহাসাগরের পাশ দিয়ে এগোলে দেখা মেলে দুটি গম্বুজওয়ালা একটি ছোট্ট অর্থোডক্স গির্জার। পাশে সাইরিলিক হরফে লেখা সাইনবোর্ড। আর একটু এগোলেই পাহাড়ের কিনারায় কাঠের তৈরি পুরোনো দুর্গের মতো একটি স্থাপনা। এর নাম ফোর্ট রস রুশ ভাষায় ‘ক্রেপস্ত রস’।
আজ এটি ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। তবে প্রায় দুই শতাব্দী আগে জায়গাটি ছিল রুশ সাম্রাজ্যের উত্তর আমেরিকান উপনিবেশের অংশ। ১৮১২ থেকে ১৮৪২ সাল পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়ার উত্তর উপকূলে রুশদের স্থায়ী উপস্থিতি ছিল।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেই সময়ের ক্যালিফোর্নিয়া মূলত স্প্যানিশ ও পরে মেক্সিকান শাসনের জন্য পরিচিত হলেও রুশদের এই অধ্যায় এখন অনেকটাই বিস্মৃত। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির নৃবিজ্ঞানী কেন্ট লাইটফুটের ভাষায়, এটি যেন একটি ‘ভুলে যাওয়া সাম্রাজ্য’।
আলাস্কার খাদ্যসংকট থেকেই ক্যালিফোর্নিয়ায় রুশদের আগমন
১৬০০ ও ১৭০০-এর দশকে ইউরোপীয় শক্তিগুলো যখন পশ্চিম দিকে উপনিবেশ বিস্তার করছিল, রাশিয়া তখন পূর্ব দিকে এগিয়ে সাইবেরিয়া পেরিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে পৌঁছায়। পরে আলাস্কার বিভিন্ন দ্বীপ ও উপকূলে রুশ বসতি গড়ে ওঠে।
১৭৯৯ সালে রুশ-আমেরিকান কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আলাস্কায় রাশিয়ার বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়। সমুদ্রভোঁদড়ের চামড়ার ব্যবসা থেকে তারা বিপুল লাভ করলেও আলাস্কার তীব্র শীত তাদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে পর্যাপ্ত কৃষি উৎপাদন সম্ভব না হওয়ায় দেখা দেয় খাদ্যসংকট।
এই পরিস্থিতিতে রুশরা এমন একটি উষ্ণ অঞ্চল খুঁজতে থাকে, যেখানে কৃষিকাজ করা যাবে এবং সেখান থেকে আলাস্কার বসতিগুলোতে খাদ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তখন তাদের নজর পড়ে ক্যালিফোর্নিয়ার দিকে।
সান ফ্রান্সিসকো থেকে ফোর্ট রস
১৮০৬ সালের এপ্রিলে রুশ-আমেরিকান কোম্পানির পরিচালক নিকোলাই রেজানোভ ‘জুনো’ জাহাজ নিয়ে সান ফ্রান্সিসকো উপসাগরে পৌঁছান। তখন আলাস্কার রুশ বসতিগুলোতে খাদ্যসংকট তীব্র ছিল এবং তার নাবিকদের অনেকেই স্কার্ভিতে আক্রান্ত ছিলেন।
সেসময় ক্যালিফোর্নিয়া ছিল স্প্যানিশ নিয়ন্ত্রণে। প্রায় ছয় সপ্তাহ সান ফ্রান্সিসকোতে অবস্থান করে রেজানোভ খাবার সংগ্রহ করেন। পরে উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূল পরিদর্শন করে তিনি দেখতে পান, অঞ্চলটি আলাস্কার তুলনায় অনেক উষ্ণ ও কৃষিকাজের জন্য উপযোগী। একই সঙ্গে সেখানে স্প্যানিশদের উপস্থিতিও তুলনামূলকভাবে কম।
এরপরই উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা নেয় রুশরা।
১৮১২ সালে সেখানে গড়ে ওঠে ফোর্ট রস। শুরুতে ২৫ জন রুশ ও প্রায় ৮০ জন স্থানীয় আলাস্কান শিকারি সেখানে অবস্থান করতেন।
বহুজাতিক সমাজে পরিণত হয় ফোর্ট রস
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ফোর্ট রস শুধু একটি দুর্গ নয়, বরং ছোট একটি বহুজাতিক বাণিজ্য ও উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়।
১৮৩০-এর দশকে এখানে প্রায় ৪০০ মানুষ বসবাস করতেন। রুশদের পাশাপাশি আলাস্কা থেকে আসা আলেউত ও কোডিয়াক শিকারি, স্থানীয় ক্যালিফোর্নিয়ার জনগোষ্ঠী এবং ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত মানুষেরাও সেখানে থাকতেন।
স্থানীয় কাশায়া পোমো ও কোস্ট মিউক জনগোষ্ঠীর নারীদের সঙ্গে রুশ ও ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত পুরুষদের বিয়ে ও পরিবার গড়ে ওঠে। ফিনল্যান্ড ও হাওয়াই থেকেও দক্ষ কাঠমিস্ত্রি, কামারসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ সেখানে কাজ করতে আসতেন।
গবেষকদের মতে, অন্যান্য অনেক ইউরোপীয় উপনিবেশের তুলনায় ফোর্ট রসের সামাজিক কাঠামো ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি সহনশীল।
ক্যালিফোর্নিয়ায় উৎপাদনের নতুন দিগন্ত
ফোর্ট রস ধীরে ধীরে কৃষি ও কারিগরি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। সেখানে জাহাজ নির্মাণ, ইট ও কাচ তৈরি এবং বাতাসচালিত কল স্থাপনের মতো কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো।
ক্যালিফোর্নিয়ার কৃষি ও ওয়াইন শিল্পের ইতিহাসেও রুশদের ভূমিকার কথা উঠে আসে। ১৮১৪ সালে সেখানে পীচগাছ দিয়ে বাগান শুরু করা হয়। পরে বিভিন্ন ফল ও ফসলের চাষ হয়।
১৮১৭ সালে বর্তমান সোনোমা কাউন্টিতে রুশরা প্রথম আঙুরগাছ রোপণ করেছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসবিদদের উদ্ধৃত করে বিবিসি জানিয়েছে। স্থানীয় ‘মিশন’ জাতের আঙুর দিয়ে তারা অল্প পরিমাণে হালকা লাল ওয়াইনও তৈরি করত।
ক্যালিফোর্নিয়াকে ঘিরে বড় পরিকল্পনা ছিল রাশিয়ার
ফোর্ট রসকে কেন্দ্র করে রুশদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধু কৃষি বা বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে রাশিয়ার প্রভাব আরও বিস্তারের পরিকল্পনাও ছিল।
১৮২১ সালে জার আলেকজান্ডার প্রথম আধুনিক ওরেগন থেকে আলাস্কা পর্যন্ত বিশাল এলাকার ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়ে একটি সাম্রাজ্যিক ফরমান জারি করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট জন কুইন্সি অ্যাডামস এর বিরোধিতা করেন।
এই বিরোধ পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর আমেরিকা মহাদেশে নতুন উপনিবেশ বিস্তার ঠেকানোর মার্কিন নীতির বিকাশেও ভূমিকা রাখে।
শেষ পর্যন্ত কেন বন্ধ হয়ে গেল ফোর্ট রস?
বড় পরিকল্পনা থাকলেও ফোর্ট রস প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। একদিকে এটি রুশ-আমেরিকান কোম্পানির জন্য যথেষ্ট লাভজনক হয়নি, অন্যদিকে আলাস্কার বসতিগুলোর খাদ্যচাহিদাও পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
অতিরিক্ত শিকারের কারণে ১৮২০-এর দশকের শুরুতেই সমুদ্রভোঁদড়ের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে যায়। কৃষিতেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় উপকূলীয় কুয়াশা ও ইঁদুরের উপদ্রব। ১৮২৬ থেকে ১৮৩৩ সালের মধ্যে সেখানে বছরে গড়ে মাত্র ১৩ টন গম উৎপাদিত হতো।
এরপর ১৮৩৯ সালে ব্রিটিশ মালিকানাধীন হাডসনস বে কোম্পানি রুশ আলাস্কায় খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহে রাজি হলে ফোর্ট রসের গুরুত্ব আরও কমে যায়।
১৮৪১ সালে সুইস অভিবাসী জন সাটার রুশদের কাছ থেকে ফোর্ট রসের ভবন ও অন্যান্য সম্পদ ৩০ হাজার ডলারে কিনে নেন। এর মধ্য দিয়েই ক্যালিফোর্নিয়ায় রুশ উপনিবেশের অধ্যায়ের কার্যত অবসান ঘটে।
রুশরা চলে গেলেও ইতিহাস থেকে যায়
ফোর্ট রস বিক্রির কয়েক বছর পর জন সাটারের জমিতে সোনা আবিষ্কৃত হয়। শুরু হয় ক্যালিফোর্নিয়ার বিখ্যাত গোল্ড রাশ, যা পুরো অঞ্চলের ইতিহাস বদলে দেয়।
রুশদের সেই অধ্যায়ের চিহ্ন অবশ্য এখনো ক্যালিফোর্নিয়ায় ছড়িয়ে আছে। সান ফ্রান্সিসকোর রুশ হিল এলাকার নামের সঙ্গে রুশ-আমেরিকান কোম্পানির নাবিকদের সমাধির সম্পর্ক রয়েছে। বডেগা বে এবং রুশ রিভার ভ্যালিতেও রয়েছে রুশ উপস্থিতির ঐতিহাসিক স্মৃতি।
রুশরা যে নদীকে ‘স্লাভিয়াঙ্কা’ নামে ডাকত, সেটিই আজকের রুশ রিভার। বর্তমানে অঞ্চলটি ক্যালিফোর্নিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন ও ওয়াইন এলাকা।
প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে তাকিয়ে থাকা পুরোনো কাঠের দুর্গ, অর্থোডক্স গির্জা আর সাইরিলিক লেখা তাই আজও মনে করিয়ে দেয় ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাস শুধু স্প্যানিশ, মেক্সিকান কিংবা আমেরিকানদের গল্প নয়। প্রায় দুই শতাব্দী আগেও যুক্তরাষ্ট্রের এই ভূখণ্ডের এক অংশে ছিল রাশিয়ার উপনিবেশ।
আরটিভি/এসকে


