
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ সময় ধরে চাকরি না পাওয়া মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। বেকারত্বের হার ঐতিহাসিকভাবে তুলনামূলক কম হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক মন্দার দিকে এগোচ্ছে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশটির শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রায় ১৮ লাখ মানুষ অন্তত ২৭ সপ্তাহ ধরে বেকার ছিলেন। মোট বেকার মানুষের প্রায় ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্বের মধ্যে ছিলেন।
বিজনেস ইনসাইডারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের শুরুর দিক থেকে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে বেকার থাকা মানুষের অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে কারণ যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে কোনো অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে নেই। অতীতে এত বড়সংখ্যক মানুষ দীর্ঘ সময় বেকার থাকলে সাধারণত বেকারত্বের হারও বেশি থাকত এবং দেশ অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে থাকত বা সেখান থেকে বের হওয়ার পর্যায়ে থাকত।
ম্যাসাচুসেটসের বাসিন্দা জেরেমি স্পিগেলের অভিজ্ঞতা এই দীর্ঘ চাকরিসন্ধানের একটি উদাহরণ। ২০২৪ সালে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে পরিচালকের চাকরি হারানোর পর তিনি নতুন কাজের সন্ধান শুরু করেন। দুই দশকের বেশি কাজের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও প্রায় দুই বছর ধরে তিনি চাকরি খুঁজছেন। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ না পাওয়ার কারণে এখন তিনি নিজেকেও প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন।
স্পিগেল জানিয়েছেন, চাকরির আবেদন করে বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তার মনে হয়েছে, হয়তো সমস্যাটি তার নিজের মধ্যেই রয়েছে। তার পরিবারের একজন সদস্য পর্যন্ত প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি যে প্রতিষ্ঠানগুলোতে আবেদন করেছেন সেখানে কারও সঙ্গে তার কোনো সমস্যা হয়েছিল কি না। চাকরি খোঁজার বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে হতে পারে এমন আশঙ্কায় তিনি কখনো কখনো সামাজিক অনুষ্ঠানও এড়িয়ে চলেন।
দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্বের কারণ নিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে নানা ধরনের ধারণা তৈরি হয়েছে। কেউ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবকে দায়ী করছেন, কেউ বয়সভিত্তিক বৈষম্যের কথা বলছেন। আবার কেউ এমন চাকরির বিজ্ঞাপনের বিষয়টি সামনে আনছেন, যেগুলোতে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হলেও বাস্তবে নিয়োগের উদ্যোগ নেই। তবে এসব বিষয়কে দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্বের নিশ্চিত কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী ওফার শ্যারোন দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব নিয়ে গবেষণা করেন। তার মতে, চাকরিপ্রার্থীরা যখন দীর্ঘদিন কাজ না পাওয়ার পেছনে কোনো স্পষ্ট বাহ্যিক কারণ খুঁজে পান না, তখন তারা নিজেদের মধ্যেই সমস্যার কারণ খুঁজতে শুরু করেন। এতে আত্মদোষারোপ বাড়তে পারে এবং দীর্ঘ সময় ধরে চাকরি খোঁজার প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাসও কমে যেতে পারে।
ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা জন ম্যাককার্টিও দীর্ঘ চাকরিসন্ধানের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। ২০২২ সালে সফটওয়্যার প্রকৌশলীর চাকরি হারানোর পর তিনি ১৮ মাস ধরে নতুন কাজ খুঁজেছেন। পরে তিনি পেশা পরিবর্তন করে কারিগরি কাজ শুরু করেন এবং বর্তমানে একটি খুচরা প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করছেন।
ম্যাককার্টি জানান, কয়েকটি চাকরির ক্ষেত্রে তিনি প্রাথমিক ফোন ও কারিগরি সাক্ষাৎকার পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। কিন্তু ভিডিও সাক্ষাৎকারের পর তাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। একের পর এক প্রত্যাখ্যানের পর তার মনে হয়েছে, বয়স হয়তো চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে তার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে তিনি নিজেই নিশ্চিত নন, বয়সকে কারণ হিসেবে ভাবাটা বাস্তবতা নাকি দীর্ঘদিন চাকরি না পাওয়ার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার একটি উপায়।
ওফার শ্যারোন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চাকরি খোঁজা মানুষের জন্য আশা ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘমেয়াদি চাকরিসন্ধান একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। কিন্তু সমস্যার কারণ নিয়ে অনিশ্চয়তা বেশি থাকলে চাকরিপ্রার্থীদের পক্ষে সেই আশা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে দীর্ঘ সময় চাকরি খোঁজার পর কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত কাজে ফিরতে পারছেন। কিন্তু নতুন চাকরি পেলেও অনেকের ক্ষেত্রে আগের কর্মজীবনে ফিরে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কেউ কেউ পেশা পরিবর্তন করছেন, আবার কেউ আগের তুলনায় কম বেতনের চাকরি গ্রহণ করছেন। অন্যদিকে কেউ কেউ কাজ খোঁজা পুরোপুরি ছেড়ে দিচ্ছেন।
কিম্বারলি ম্যাকক্লেইন ২০২৪ সালে একটি ছোট অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে উপপরিচালকের চাকরি থেকে পদত্যাগ করার পর দ্রুত নতুন কাজ পাওয়ার আশা করেছিলেন। কিন্তু কয়েক মাস ধরে কোনো চাকরির প্রস্তাব না পাওয়ায় তিনিও নিজের বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করেন। এমনকি কোনো প্রতিষ্ঠানের অনানুষ্ঠানিক নিয়োগ-নিষেধ তালিকায় তিনি আছেন কি না, সেটিও ভাবতে শুরু করেছিলেন।
চাকরি খোঁজা শুরুর প্রায় দুই বছর পর সম্প্রতি একটি কল সেন্টারে পূর্ণকালীন গ্রাহকসেবা পেশায় চাকরি পেয়েছেন ম্যাকক্লেইন। তবে নতুন চাকরিতে তার আয় আগের চাকরির প্রায় অর্ধেক। তারপরও দীর্ঘ সময়ের প্রত্যাখ্যানের পর একটি চাকরির প্রস্তাব পাওয়াকে তিনি স্বস্তির বিষয় হিসেবে দেখছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব এখন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, জুলাইয়ে ২৭ সপ্তাহ বা তার বেশি সময় বেকার থাকা মানুষের সংখ্যা আগের মাসের ১৯ লাখ থেকে কিছুটা কমে ১৮ লাখে দাঁড়ালেও দীর্ঘমেয়াদি বেকারদের সংখ্যা এখনও উল্লেখযোগ্য।
আগামী দিনে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কমলে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়োগে আরও আত্মবিশ্বাসী হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে। আবার অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হলে বর্তমান চাকরির বাজার আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চাকরি খোঁজা অনেক মানুষকে পেশা পরিবর্তন, কম বেতনের কাজ গ্রহণ অথবা চাকরির সন্ধান পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
সূত্র: বিজনেস ইনসাইডার
আরটিভি/ এসকেডি



