
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের অস্টিনে খাবার পৌঁছে দিতে গিয়ে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার (আইসিই-ICE) এক অফিসারের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছেন ভেনেজুয়েলার ২৮ বছর বয়সী এক যুবক। তার নাম উইলবার রাফায়েল গারসেস পেরেজ। তার আইনজীবী কেট লিংকন-গোল্ডফিঞ্চ এ তথ্য জানিয়েছেন।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরের দিকে উত্তর অস্টিনে এ ঘটনা ঘটে। গুলিতে পেরেজের শরীরের ওপরের অংশে আঘাত লাগে। প্রথমে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাকে গুরুতর তবে স্থিতিশীল অবস্থায় পাওয়া যায় বলে স্থানীয় জরুরি চিকিৎসা কর্তৃপক্ষ জানায়।
পেরেজের আইনজীবী জানান, তিনি খাবার সরবরাহের (ফুড ডেলিভারি) কাজ করছিলেন। তার গাড়িকে অভিবাসন অফিসাররা অনুসরণ করার পর ঘটনাটি ঘটে। টেক্সাসের জননিরাপত্তা বিভাগ জানিয়েছে, নীল রঙের একটি গাড়িকে ধাওয়া করার ঘটনায় অভিবাসন অফিসাররা তাদের সহায়তা চেয়েছিলেন।
ঘটনার একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও যাচাই করে দেখা গেছে, একটি গাঢ় রঙের গাড়ির পাশে নীল গাড়ি থেমে আছে। এরপর কয়েকটি গুলির শব্দ শোনা যায়। পরে ওই নীল গাড়ির চালকের দিকে একজনকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। তবে গুলি চালানোর পুরো ঘটনা ভিডিওতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি।
অস্টিন পুলিশ জানিয়েছে, গুলি চালানোর সময় তাদের সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছিলেন না। টেক্সাসের জননিরাপত্তা বিভাগের সদস্যরা পরে ঘটনাস্থলে পৌঁছে গাড়ির চালককে চিকিৎসা সহায়তা দেন।
আইনজীবীর দাবি
পেরেজের আইনজীবী কেট লিংকন-গোল্ডফিঞ্চ জানান, পেরেজ যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে প্রবেশ করেছিলেন এবং একটি মানবিক অনুমতিপ্রাপ্ত কর্মসূচির মাধ্যমে দেশটিতে এসেছিলেন। তার বৈধ কাজের অনুমতিপত্রও ছিল বলে আইনজীবীর দাবি।
তবে মার্কিন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ বলেছে, পেরেজ বাইডেন প্রশাসনের সময় অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে দেশ থেকে বহিষ্কারের চূড়ান্ত আদেশ ছিল। ঘটনাটি তদন্ত করছে স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা তদন্ত বিভাগ। এতে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাও সহায়তা করছে বলে জানানো হয়েছে।
আইনজীবী আরও জানান, পেরেজকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়ার পর অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে তাকে টেক্সাসের পিয়ারসালের দক্ষিণ টেক্সাস অভিবাসন আটককেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
পেরেজের পিঠে এখনও গুলি আটকে রয়েছে বলে তার আইনজীবীর কার্যালয় জানিয়েছে। আইনজীবীর দাবি, গুলিটি মেরুদণ্ডের কাছাকাছি থাকায় চিকিৎসকেরা তা বের করেননি। পেরেজ তার আইনজীবীকে জানিয়েছেন, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং শুরুতে প্রয়োজনীয় ব্যথানাশকও দেওয়া হয়নি।
পেরেজের স্ত্রী বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। তবে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি স্বামীর সঙ্গে কথা বলতে পারেননি বলে আইনজীবী জানিয়েছেন। আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর পেরেজ স্ত্রীকে ফোন করে জানান যে তাকে গুলি করা হয়েছে। কথা বলার সময় তিনি প্রচণ্ড ব্যথায় চিৎকার করছিলেন এবং একপর্যায়ে ফোন কেটে যায়।
হাসপাতাল থেকে নেওয়া হয় অভিবাসন হেফাজতে
আইনজীবী জানান, তিনি পেরেজের স্ত্রীর সঙ্গে হাসপাতালে গিয়েছিলেন তার শারীরিক অবস্থার খবর নিতে। কিন্তু তাদের হাসপাতাল চত্বর থেকে বের করে দেওয়া হয়।
পরে অস্টিনের মেয়র কার্ক ওয়াটসন হাসপাতালে গিয়ে বিষয়টি জানতে চান। আইনজীবীর দাবি, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরে নিশ্চিত করে যে পেরেজকে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
পেরেজের চিকিৎসা নেওয়া হাসপাতাল এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনার পর অস্টিনের মেয়র কার্ক ওয়াটসন স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, শহরের পুলিশ এ অভিযানে জড়িত ছিল না। অস্টিনের পুলিশ প্রধান লিসা ডেভিস জানান, ঘটনাস্থলে অল্প সময়ের একটি পায়ে হেঁটে ধাওয়া করার ঘটনা ঘটেছিল এবং পুলিশ তদন্তকারীরা সেখানে ছিলেন।
টেক্সাসের জননিরাপত্তা বিভাগ জানিয়েছে, তাদের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে।
পেরেজের আইনজীবী প্রশ্ন তুলেছেন, কেন তার মক্কেলকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং তার বর্তমান অবস্থার বিষয়ে পরিবারকে পরিষ্কার তথ্য দেওয়া হয়নি।
ঘটনাস্থলে বিক্ষোভ
গুলির ঘটনার পর উত্তর অস্টিনে বহু মানুষ জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভকারীরা অভিবাসন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন। কেউ কেউ অভিবাসন অভিযান বন্ধের দাবিতে প্ল্যাকার্ড বহন করেন।
রাতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে টেক্সাসের জননিরাপত্তা বিভাগের সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেন। কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটকানোর ঘটনাও ঘটে। রাত ১১টার দিকে বিক্ষোভকারীরা এলাকা ছেড়ে চলে যান বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের লাতিন আমেরিকান বংশোদ্ভূত নাগরিকদের বৃহত্তম অধিকার সংগঠনও অভিবাসন আইন প্রয়োগের ওপর স্বাধীন নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
ট্রাভিস কাউন্টির সরকারি কৌঁসুলির কার্যালয়ও তদন্তে সমান অংশীদার হওয়ার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়ার দাবি জানিয়েছে।
আইনপ্রণেতাদের প্রতিক্রিয়া
টেক্সাসের কংগ্রেস সদস্য গ্রেগ কাসার ঘটনার স্বাধীন তদন্ত, গুলির সময় ধারণ করা ক্যামেরার সব ফুটেজ প্রকাশ এবং আইন ভঙ্গ করে থাকলে সংশ্লিষ্ট অভিবাসন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
টেক্সাসের আরেক কংগ্রেস সদস্য হোয়াকিন কাস্ত্রোও ঘটনার পূর্ণ জবাবদিহি দাবি করেছেন।
এদিকে, টেক্সাসের একটি আসনের জন্য সিনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা জেমস তালারিকোও ঘটনাটি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানিয়েছেন এবং তদন্তের দাবি করেছেন।
দেশজুড়ে অভিবাসন অভিযান জোরদার
যুক্তরাষ্ট্রে চলতি গ্রীষ্মে অভিবাসন আইন প্রয়োগের অভিযান জোরদার হয়েছে। জুলাই ও আগস্টে প্রথমবারের মতো প্রতি মাসে ৫০ হাজারের বেশি গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা।
অস্টিনের ঘটনাটি টেক্সাসে অভিবাসন কর্মকর্তাদের গুলির আরেকটি ঘটনা। এর আগে চলতি বছরের জুলাইয়ে হিউস্টনে লরেঞ্জো সালগাদো আরাউখো নামে মেক্সিকোর এক নাগরিককে অভিবাসন কর্মকর্তা গুলি করে হত্যা করেন। ওই ঘটনার তদন্তও চলছে।
অস্টিনের সাম্প্রতিক গুলির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা শরীরে ধারণ করা ক্যামেরা ব্যবহার করেছিলেন কি না এবং পেরেজকে লক্ষ্য করেই অভিযান চালানো হয়েছিল কি না—এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য দেয়নি।
সূত্র: এনবিসি নিউজ
আরটিভি/জেএমএ


