
যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভ্রাতৃসংঘের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের লিখিত নথি ও ঘটনার দুই দিন পর পাঠানো কিছু খুদে বার্তা প্রকাশ্যে আসার পর ২০২৪ সালের ঘটনাটি নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে মামলাটির ফৌজদারি তদন্ত নতুন করে শুরু করেছে স্থানীয় কৌঁসুলির দপ্তর।
ঘটনার সময় ২০ বছর বয়সী ওই সাবেক শিক্ষার্থীকে মামলার নথিতে ‘জেন ডো’ নামে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। তার অভিযোগ, ২০২৪ সালের অক্টোবরে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চি ফাই ভ্রাতৃসংঘের (Chi Phi fraternity) বাড়িতে তাকে মাদক খাওয়ানো হয় এবং একাধিক ব্যক্তি তাকে ধর্ষণ করেন। পরে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশের কাছে অভিযোগ জানান। সম্প্রতি তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ও ওই সময়ের সাত ভ্রাতৃসংঘ সদস্যের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা করেন।
সিবিএস নিউজ নিউইয়র্কের হাতে আসা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের নথি অনুযায়ী, ঘটনার তিন সপ্তাহের বেশি সময় পর ১৪ নভেম্বর জেন ডোর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। পরদিনও জিজ্ঞাসাবাদ চলে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ বিভাগের একজন তদন্তকারী প্রশ্ন করেন। প্রথম দিনের সাক্ষাৎকারে বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি-সংক্রান্ত তদন্তকারী, একজন ভুক্তভোগী সহায়তাকারী এবং জেন ডোর একজন পরামর্শদাতাও উপস্থিত ছিলেন।
নথিতে বলা হয়েছে, জেন ডো ওই রাতে মদ্যপান ও মাদক গ্রহণের কথা জানান এবং তার স্মৃতিতে কিছু অংশ অস্পষ্ট ছিল বলে উল্লেখ করেন। শুরুতে ঘটে যাওয়া যৌন কর্মকাণ্ড এবং পরে যা ঘটেছে—দুটিকে তিনি আলাদা করে বর্ণনা করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিক যৌন কর্মকাণ্ডে তিনি সম্মত ছিলেন কি না জানতে চাইলে তিনি জানান, তখন তিনি খুব মাতাল ছিলেন, তবে ওই অংশ নিয়ে তিনি মোটামুটি স্বস্তিতে ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সে সময় তাকে খুব জোরে শারীরিকভাবে আঘাতও করা হচ্ছিল। পরে রাতের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি পুলিশকে বলেন, তিনি শতভাগ নিশ্চিত যে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় তদন্তকারী তার বক্তব্য লিখিত আকারে তৈরি করেন এবং প্রতিটি অংশ পড়ে শোনান। নথি অনুযায়ী, জেন ডোকে বক্তব্যের কোনো অংশ পরিষ্কার বা সংশোধনের সুযোগও দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় দিনে তিনি ছয় পৃষ্ঠার সংশোধিত বক্তব্যটি পড়ে দেখেন। স্বাক্ষর করার আগে তার পরামর্শদাতা তাকে আরও একজনের সঙ্গে বক্তব্যটি পর্যালোচনা করার সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন। নথি অনুযায়ী, স্বাক্ষরের আগে জেন ডো জানান, নিজের বক্তব্য নিয়ে তিনি খুবই আত্মবিশ্বাসী।
ঘটনার দুই দিন পরের বার্তায় কী ছিল
এদিকে সিবিএস নিউজ নিউইয়র্কের হাতে আসা কিছু খুদে বার্তায়ও ঘটনার নতুন তথ্য উঠে এসেছে। সূত্রের দেওয়া ওই বার্তাগুলো জেন ডো ও মামলার এক অভিযুক্তের মধ্যে আদান-প্রদান হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। বার্তাগুলো কথিত ঘটনার মাত্র দুই দিন পর পাঠানো হয়েছিল।
বার্তায় ওই ব্যক্তি ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং জানান, তার নিজের স্মৃতিও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তিনি আরও লেখেন, তিনি ও আরেক ব্যক্তি অতিরিক্ত মদ্যপ অবস্থায় থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি।
জবাবে জেন ডো লেখেন, তার নিজেরও স্মৃতি খুব অস্পষ্ট এবং সবাই অতিরিক্ত নেশাগ্রস্ত ছিল। প্রকাশিত বার্তায় তিনি ওই সময়ের যৌন কর্মকাণ্ডকে অবৈধ মনে হয়নি বলেও লেখেন। পাশাপাশি তিনি ওই ব্যক্তির সঙ্গে আবার ধূমপান করার প্রস্তাব দেন, তবে অতিরিক্ত লোকজন ও কেটামিন ছাড়া।
তবে জেন ডোর আইনজীবী থমাস জিউফ্রা জানান, তার মক্কেল ঘটনার পর ওই ব্যক্তির সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান করেছিলেন বলে তিনি নিশ্চিত, কিন্তু প্রকাশিত ছবিগুলোই সেই নির্দিষ্ট বার্তা কি না, তা তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি। তাঁর দাবি, ঘটনার পর জেন ডো মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন এবং কী ঘটেছিল তা বোঝার চেষ্টা করছিলেন।
কেন তদন্ত আবার শুরু হলো
টম্পকিন্স কাউন্টির জেলা অ্যাটর্নি ম্যাথিউ ভ্যান হাউটেন জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের নভেম্বরে দেওয়া জেন ডোর শপথ করা বক্তব্য এবং সম্প্রতি করা দেওয়ানি মামলার অভিযোগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তার মতে, আগের বক্তব্যে জেন ডোকে জোর করে মাদক খাওয়ানো বা একাধিক ব্যক্তি ধর্ষণ করেছে—এমন অভিযোগ ছিল না। বরং সেই বক্তব্যে মাদক গ্রহণ ও যৌন কর্মকাণ্ডে তার অংশগ্রহণকে স্বেচ্ছাসম্মত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। ওই বক্তব্য পর্যালোচনার পর তখন অভিযোগ আনা হয়নি বলে জেলা অ্যাটর্নি জানান।
তবে সম্প্রতি দেওয়ানি মামলা দায়ের হওয়ার পর এবং বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসার পর ২৮ সেপ্টেম্বর জেলা অ্যাটর্নির দপ্তর ফৌজদারি তদন্ত পুনরায় শুরু করার ঘোষণা দেয়। নতুন তদন্তে জেন ডোর বক্তব্যের পাশাপাশি দেওয়ানি মামলায় উঠে আসা নতুন তথ্যও বিবেচনা করা হবে। পরে বিষয়টি গ্র্যান্ড জুরির সামনে উপস্থাপনের কথা জানিয়েছেন জেলা অ্যাটর্নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্তেও শাস্তি
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ও ২০২৪ সালের ঘটনায় আলাদা তদন্ত করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্ত ও শুনানি শেষে অভিযুক্তদের কয়েকজনকে বহিষ্কার ও সাময়িক বরখাস্তসহ বিভিন্ন শাস্তি দেওয়া হয়। ভ্রাতৃসংঘটির শাখাটিও ২০২৪ সালে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং এখনও ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ রয়েছে।
অন্যদিকে মামলায় অভিযুক্ত দুজনের আইনজীবীরা তাদের মক্কেলদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের একজনের আইনজীবীর দাবি, ভ্রাতৃসংঘের কথোপকথনে আপত্তিকর বার্তা থাকলেও সেটিকে যৌন নিপীড়নের প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না।
জেন ডোর আইনজীবী অবশ্য দাবি করেছেন, ঘটনার পর তার মক্কেল মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন এবং তদন্তকারীরা মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করেননি।
মামলাটির ফৌজদারি তদন্ত এখন পুনরায় শুরু হয়েছে। জেন ডোর চূড়ান্ত ছয় পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য সিবিএস নিউজ নিউইয়র্ক দেখেনি বলে জানিয়েছে। ফলে প্রকাশিত জিজ্ঞাসাবাদের নথি ও খুদে বার্তাগুলো মামলার সামগ্রিক প্রমাণের একটি অংশ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
সূত্র: সিবিএস নিউজ , সিবিএস নিউজ ২
আরটিভি/জেএমএ


