
যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের ভিসা ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগে নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এ তদন্তের ঘোষণা দেন।
অভিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো— হার্ভার্ড, ইয়েল, স্ট্যানফোর্ড, ব্রাউন, পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসি ডেভিস, ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, অ্যারিজোনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা এমআইটি।
তার অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠান বিদেশি গবেষকদের জন্য নির্ধারিত ভিসা কর্মসূচি অতিরিক্ত ব্যবহার করে মার্কিন শিক্ষার্থী ও গবেষকদের কর্মসংস্থান এবং মজুরির ওপর চাপ তৈরি করছে।
ভ্যান্স বলেন, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে জে-১ ভিসা কর্মসূচির অপব্যবহার হয়ে থাকতে পারে এবং বিষয়টি তদন্ত করা প্রয়োজন। বিদেশি গবেষকদের নিয়োগের মাধ্যমে মার্কিন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ও গবেষকদের তুলনায় কম ব্যয়ে কাজ করিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে মার্কিন কর্মীদের স্বার্থের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। তদন্তের ফল প্রকাশের আগে কোনো প্রতিষ্ঠান ভিসা জালিয়াতি করেছে বলে চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তদন্তের আওতায় থাকা নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টডক্টরাল গবেষক এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণা প্রকল্পের কর্মীদের মধ্যে প্রায় ৬১ শতাংশ বিদেশি নাগরিক।
তাদের দাবি, জাতীয় পর্যায়ে এই হার প্রায় ৩৮ শতাংশ। তবে এই পরিসংখ্যান কীভাবে হিসাব করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি গবেষকদের উপস্থিতির হার বেশি হওয়ার অর্থ নিজে থেকেই ভিসা জালিয়াতির প্রমাণ নয়।
তদন্তে মূলত ভিসার শর্ত, নিয়োগের প্রক্রিয়া এবং সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণায় বিদেশি কর্মীদের নিয়োগের নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগের মহাপরিদর্শক অ্যান্থনি ডি’এসপোসিটো জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ইতিমধ্যে তদন্তের অংশ হিসেবে সমন জারি করা হয়েছে। বিদেশি প্রভাব, আর্থিক সম্পর্কের অনিয়ম এবং ভিসার অপব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
ইউসি ডেভিস কর্তৃপক্ষ অবশ্য জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়টি ভিসাসংক্রান্ত সব কেন্দ্রীয় আইন ও বিধিবিধান মেনে চলে।
ফক্স৪০-কে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, নিয়ম মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করতে তারা কেন্দ্রীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। তদন্তের বিষয়ে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের ভিত্তি, তদন্তে কী ধরনের নথি পরীক্ষা করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
জে-১ ভিসা যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিনিময় কর্মসূচির আওতাভুক্ত অস্থায়ী ভিসা। এর মাধ্যমে বিদেশি শিক্ষার্থী, গবেষক, শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট শিক্ষা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ বা সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেশটিতে যেতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক গবেষক ও পোস্টডক্টরাল গবেষকদের যুক্তরাষ্ট্রে আনার ক্ষেত্রে এই ভিসা ব্যবহার করে থাকে।
অন্যদিকে, এইচ-১বি ভিসা বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করার সুযোগ দেয়। দুটি ভিসার উদ্দেশ্য ও শর্ত আলাদা হলেও ট্রাম্প প্রশাসন সাম্প্রতিক সময়ে উভয় কর্মসূচির ব্যবহার নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
ভ্যান্সের অভিযোগ, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় জে-১ ভিসার মাধ্যমে বিদেশি গবেষকদের নিয়োগ দিয়ে মার্কিন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ও গবেষকদের তুলনায় কম বেতনে কাজ করাচ্ছে।
তার মতে, এতে স্থানীয় গবেষকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ ও আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে বিদেশি গবেষকদের বেতন তুলনামূলক কম কি না, কিংবা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ভিসার শর্ত ভেঙেছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট নিয়োগের শর্ত, কাজের ধরন ও আর্থিক নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে প্রশাসনের অভিযোগের পক্ষে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এই তদন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর অভিবাসন নীতির অংশ। বিদেশি শিক্ষার্থী, দক্ষ কর্মী ও গবেষকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ এবং কাজের সুযোগ নিয়ে প্রশাসন সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও প্রকৌশল গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ফলে ভিসা ব্যবহারের নিয়ম আরও কঠোর হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা কার্যক্রম, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নিয়োগ এবং সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোও প্রভাবিত হতে পারে।
শ্রম বিভাগের মহাপরিদর্শক ডি’এসপোসিটি বলেছেন, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে তার পরিচিতি বা মর্যাদার কারণে তদন্তের বাইরে রাখা হবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তে ভিসার অপব্যবহারের পাশাপাশি বিদেশি প্রভাব এবং আর্থিক সম্পর্কের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাবে।
তবে তদন্ত চলাকালে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নথি পর্যালোচনা এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পরই পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
আরটিভি/এসআর


