
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসের সরকারি স্কুলগুলোতে এক শিক্ষাবর্ষেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছয় হাজারের বেশি মারামারির ঘটনা ঘটেছে। লস অ্যাঞ্জেলেস ইউনিফায়েড স্কুল ডিস্ট্রিক্টের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে মোট ৬ হাজার ১৩১টি মারামারির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা চার বছর আগের তুলনায় ২১ শতাংশ বেশি। একই সময়ে শিক্ষার্থীদের হুমকির ঘটনা বেড়েছে সাড়ে ১১ শতাংশ। সম্প্রতি এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর স্কুলগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক ও বিশেষজ্ঞরা।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের ৯ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত শিক্ষাবর্ষে লস অ্যাঞ্জেলেসের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের হুমকির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে ৪ হাজার ১৫টি। যদিও আগের শিক্ষাবর্ষের তুলনায় মারামারি ও হুমকির ঘটনা কমেছে, চার বছর আগের তুলনায় পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। স্কুল কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা কার্যক্রমে কিছু উন্নতি হলেও আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি ফ্রাঙ্কলিন হাই স্কুলের ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী জেভিয়ার নুনগারে-মার্টিনেজের মৃত্যুর পর অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে। বুধবার লস অ্যাঞ্জেলেস ইউনিফায়েড স্কুল ডিস্ট্রিক্টের প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন একদল অভিভাবক। তাঁরা স্কুলগুলোতে পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানোর দাবি জানান। গত পাঁচ বছর ধরে লস অ্যাঞ্জেলেসের সরকারি স্কুলগুলোতে পুলিশের নিয়মিত সক্রিয় উপস্থিতি নেই।
শিক্ষার্থীদের হয়রানি প্রতিরোধে কাজ করা সংগঠন স্পিক আউট অ্যাগেইনস্ট বুলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক মনিকা হারমন মনে করেন, স্কুলগুলোতে আরও কঠোর নিয়ম প্রয়োগ করা প্রয়োজন। বৃহস্পতিবার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হয়রানিবিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচি শেষে তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থী অন্যায় আচরণের অভিযোগ করলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
হারমনের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পরও অনেক ক্ষেত্রে পরদিনই তারা আবার স্কুলে ফিরে আসেন। পর্যাপ্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকায় একই ধরনের আচরণ বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে তার ধারণা। তিনি স্কুল কর্তৃপক্ষকে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানান।
ন্যাশনাল স্কুল সেফটি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক এবং পেপারডাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক রোনাল্ড স্টিফেনস স্কুল ডিস্ট্রিক্টের তথ্য পর্যালোচনা করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, মারামারি, হুমকি ও অবৈধ পদার্থসংক্রান্ত ঘটনার তথ্য কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এসব তথ্য পাওয়ার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, ভবিষ্যতে গুরুতর কোনো ঘটনা ঘটলে সেই প্রশ্নও সামনে আসতে পারে।
স্টিফেনস বলেন, লস অ্যাঞ্জেলেসের স্কুল ডিস্ট্রিক্টের নিরাপত্তা পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, শিক্ষার্থীদের তদারকি, প্রশিক্ষণ ও সহায়তার ক্ষেত্রে আরও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তার মতে, স্কুল নিরাপদ রাখতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মতামত নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নির্ধারণ করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞ এই অধ্যাপক আরও বলেন, স্কুলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সব সময় জটিল প্রযুক্তির প্রয়োজন হয় না। শিক্ষার্থীদের পাশে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উপস্থিতি, নিয়মিত তদারকি এবং তাদের সমস্যার প্রতি গুরুত্ব দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ বিভাগের ক্যাপ্টেন এরিক এপোলিটো জানিয়েছেন, চলতি বছর স্কুলগুলোতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে পুলিশ। শিক্ষার্থীদের ছোটখাটো বিরোধ যেন বড় ধরনের সহিংসতায় রূপ না নেয়, সে জন্য আগেভাগে উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগ ও বিরোধ নিষ্পত্তির দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এরিক এপোলিটোর মতে, শিক্ষার্থীদের হয়রানি অনেক সময় সাধারণ বিরোধ থেকে গুরুতর সংঘাতে রূপ নিতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব সমস্যা আরও জটিল হতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের নিজেদের সমস্যা নিয়ে কথা বলা এবং আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর পদ্ধতি শেখানো জরুরি।
নিকা হারমনও শিক্ষার্থীদের সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার সংগঠনের কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের হয়রানির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অঙ্গীকার করানো হয়। তিনি বলেন, কোনো শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হলে অন্যদের শুধু দাঁড়িয়ে দেখা বা ভিডিও ধারণ না করে প্রতিবাদ করা এবং সাহায্য চাওয়া উচিত।
ফ্রাঙ্কলিন হাই স্কুলের শিক্ষার্থীর মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলে হারমন বলেন, আশপাশে থাকা শিক্ষার্থীরা সময়মতো এগিয়ে এলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, স্কুলগুলোতে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পাবে না।
তবে লস অ্যাঞ্জেলেসের স্কুলগুলোর সব নিরাপত্তাসংক্রান্ত সূচক খারাপ হয়নি। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে স্কুল বোর্ডের বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, অস্ত্রসংক্রান্ত ঘটনা চার বছর আগের তুলনায় ৩৮ শতাংশ কমেছে। গত শিক্ষাবর্ষে এ ধরনের ৯২৩টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
একই সময়ে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঝুঁকিসংক্রান্ত ঘটনার সংখ্যাও ১৪ শতাংশ কমেছে। গত শিক্ষাবর্ষে এ ধরনের ১০ হাজার ৫৫টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। তবে গত পাঁচ বছর ধরে এই ঝুঁকিসংক্রান্ত প্রতিবেদনই স্কুল ডিস্ট্রিক্টের নিরাপত্তাবিষয়ক তথ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় রয়েছে।
লস অ্যাঞ্জেলেস ইউনিফায়েড স্কুল ডিস্ট্রিক্টের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকারের বিষয়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগের শিক্ষাবর্ষের তুলনায় মারামারি, শারীরিক আগ্রাসন, হুমকি, অস্ত্রসংক্রান্ত ঘটনা এবং আত্মহত্যার ঝুঁকিসংক্রান্ত প্রতিবেদন কমেছে। তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরোধ এখনো উদ্বেগের বিষয় বলে স্বীকার করেছে কর্তৃপক্ষ।
স্কুল ডিস্ট্রিক্ট জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক আচরণ উৎসাহিত করা, পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নত করা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি চালু রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং নিরাপদ স্কুল পরিবেশ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
সহিংসতা প্রতিরোধে বিভিন্ন কমিউনিটি সংগঠনের সঙ্গেও কাজ করছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। ক্যাম্পাসে তদারকি বাড়ানো এবং যেসব স্থানে অতিরিক্ত নজরদারি প্রয়োজন, সেগুলো চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে চার বছর আগের তুলনায় মারামারি ও হুমকির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদারের দাবি জানিয়ে যাচ্ছেন অভিভাবক ও বিশেষজ্ঞরা।
আরটিভি/ এসকেডি


