
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রধান ক্যাথলিক ধর্মীয় নেতা আর্চবিশপ (খ্রিস্টধর্মের উচ্চপদস্থ ও প্রধান একজন ধর্মযাজক) টিমোথি ব্রগলিও ফোর্ট হুডে ১৩ জনকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত সাবেক সেনা চিকিৎসক নাসির আবদুল হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনার সমালোচনা করেছেন। তার মতে, এভাবে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড দেখানো সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ডের অনুকরণ করার শামিল হতে পারে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) দেওয়া এক বিবৃতিতে ব্রগলিও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের পরিকল্পনার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। হেগসেথ গত সপ্তাহে জানিয়েছিলেন, আগামী ডিসেম্বরে হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য জনসাধারণের দেখার জন্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
ব্রগলিও বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে দায়িত্ব পাওয়া কোনো ক্যাথলিক সেনাসদস্যের উচিত এ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাওয়া। তার আশঙ্কা, এ ধরনের কাজে অংশ নেওয়া সেনাসদস্যদের মধ্যে গভীর নৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমরা কি সত্যিই এই বিশ্বের সন্ত্রাসীদের অনুকরণ করতে চাই? আমাদের প্রতিপক্ষকে বর্বরভাবে হত্যা করে তা কি জনসমক্ষে প্রদর্শন করতে চাই?’
বিবৃতিতে ব্রোগলিও আরও বলেন, বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সাধারণত ভালো সুনাম রয়েছে। কিন্তু হুইলচেয়ারে থাকা একজন মানুষের মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য সারা বিশ্বে প্রচার করে সেনাবাহিনীকে সন্ত্রাসীদের কাতারে দাঁড় করানোর কোনো মূল্য আছে কি না, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। এ সিদ্ধান্ত মানুষের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
এ বিষয়ে পেন্টাগনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর তিন দিন আগে পোপ চতুর্দশ লিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, মৃত্যুদণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ এটি মানুষের অলঙ্ঘনীয় অধিকার ও মর্যাদার ওপর আঘাত। তবে তার ওই বক্তব্যে হাসানের মৃত্যুদণ্ডের পরিকল্পনা কিংবা সম্প্রতি প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগের পরও বেঁচে যাওয়া ক্রিস্টা পাইকের ঘটনার সরাসরি উল্লেখ ছিল না। বক্তব্যটি এসেছিল মৃত্যুদণ্ডবিরোধী বিশ্ব দিবস উপলক্ষে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ বলেছেন, এ ধরনের অপরাধের গুরুতর পরিণতি সম্পর্কে মানুষকে বোঝাতেই মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
২০১৩ সালে সামরিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন হাসান। ২০০৯ সালে টেক্সাসের ফোর্ট হুড সেনাঘাঁটিতে গুলি চালিয়ে ১৩ জনকে হত্যা এবং ৩০ জনের বেশি মানুষকে আহত করার দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সাবেক এই সেনা মনোরোগ চিকিৎসক বিচার চলাকালে স্বীকার করেছিলেন, তিনিই গুলি চালিয়েছিলেন। তার দাবি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর হাত থেকে ইসলামি বিদ্রোহীদের রক্ষা করতেই তিনি এ হামলা চালান।
হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে ১৯৬১ সালের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবে দেশটির সামরিক বাহিনী। পাশাপাশি ১৯৪৫ সালের পর প্রথমবারের মতো গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাও ঘটতে পারে।
আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য প্রকাশ্যে দেখানোর ঘটনা অত্যন্ত বিরল। প্রায় ৯০ বছর আগে কেনটাকিতে রেইনি বেথিয়াকে ধর্ষণের দায়ে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। প্রায় ২০ হাজার মানুষ সেই মৃত্যুদণ্ড প্রত্যক্ষ করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। ইরান, আফগানিস্তান ও উত্তর কোরিয়ায় এখনো প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘটে বলে মনে করা হয়।
হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সদস্যদের মধ্যেই সমালোচনা তৈরি হয়েছে। রিপাবলিকান দলের একাধিক আইনপ্রণেতাও এ পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছেন।
আলাস্কার সিনেটর লিসা মারকাউস্কি বলেন, এ ধরনের কাজ সন্ত্রাসী ও স্বৈরশাসকদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নয়। নর্থ ডাকোটার সিনেটর কেভিন ক্রেমার বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ড কোনো বিনোদন নয়।’
প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন জানিয়েছেন, তার দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতার এ পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিষয়টি তিনি হোয়াইট হাউসের কাছে তুলে ধরবেন।
জনসনের আশঙ্কা, মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্যের ভিডিও ভবিষ্যৎ সন্ত্রাসীদের নতুন করে লোক সংগ্রহের উপকরণ হয়ে উঠতে পারে। তাই পরিকল্পনাটির নীতিগত প্রভাবগুলো ভালোভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
অন্যদিকে, ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করা হলেও তিনি তা দেখবেন না।
সূত্র: সিবিএস নিউজ
আরটিভি/জেএমএ


