
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার (আইসিই) এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিবাসী মিগুয়েল পারা হার্নান্দেজকে ইচ্ছাকৃতভাবে গাড়িচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ মুছে ফেলারও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সরকারি অ্যাটর্নি শন টিয়ার। তবে আইসিই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, তাদের কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে ওই ব্যক্তিকে গাড়িচাপা দেননি।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হ্যারিস কাউন্টির জেলা সরকারি অ্যাটর্নি শন টিয়ার বলেন, স্থানীয় তদন্তকারীদের সংগ্রহ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, গাড়িটি ইচ্ছাকৃতভাবে মিগুয়েলকে ধাক্কা দিয়ে চাপা দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। টেক্সাসের আইন অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে গুরুতর হামলা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হামলার মামলা হতে পারে বলেও জানান তিনি।
শন টিয়ার বলেন, তার কার্যালয় ও হ্যারিস কাউন্টির শেরিফের কার্যালয় যৌথভাবে ঘটনাটি তদন্ত করছে। তবে এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার সহযোগিতা করছে না। তার দাবি, ঘটনার সঙ্গে জড়িত গাড়িতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও মুছে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৪৮ বছর বয়সী মিগুয়েল পারা হার্নান্দেজের আইনজীবী ও অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গাড়িচাপায় তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে হাড় ভেঙে গেছে। একটি পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। সামনে তাকে আরও কয়েকটি অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
হিউস্টনের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম কেপিআরসি প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, ব্যস্ত সড়কে একটি সাদা রঙের গাড়ি বিপরীত দিক দিয়ে চলছিল। একপর্যায়ে গাড়িটি হলুদ বিভাজক পেরিয়ে মিগুয়েলের দৌড়ে যাওয়ার দিকের সড়কে চলে আসে। পরে গাড়িটি তার চলার পথের দিকে বাঁক নেয়। একটি বিপণিকেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকটি সরে যাওয়ার পর আইসিইর গাড়ির পেছনে সড়কে একজনকে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
শন টিয়ার জানান, তদন্তকারীরা গাড়িটিকে জিপ চেরোকি হিসেবে শনাক্ত করেছেন। গাড়িটিতে দুর্ঘটনার সময়কার গতি, চালকের দিক পরিবর্তন এবং ব্রেক ব্যবহারের তথ্য সংরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা ছিল। এসব তথ্য সংগ্রহের জন্য গাড়িটি ঘটনাস্থল থেকে সরানোর আগে বিশেষ ব্যবস্থায় নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করা প্রয়োজন ছিল।
তার দাবি, তদন্তকারীরা আইসিইকে গাড়ির তথ্য সংগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু সংস্থাটি তাতে সহযোগিতা করেনি। তার কার্যালয় গাড়িটি তল্লাশির পরোয়ানা তৈরির কাজ করছিল। এর মধ্যেই দুর্ঘটনার সময় গাড়ি চালাচ্ছিলেন বলে সন্দেহ করা ওই কর্মকর্তা গাড়িতে উঠে সেটি ঘটনাস্থল থেকে নিয়ে চলে যান। শন টিয়ার বলেন, তার ২০ বছরের কর্মজীবনে এমন ঘটনা আগে দেখেননি।
তবে গাড়ির তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আইসিই কোনো মন্তব্য করেনি। তথ্য সংগ্রহে বাধা দেওয়ার অভিযোগেরও জবাব দেয়নি সংস্থাটি।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) আইসিইর এক মুখপাত্র এক বিবৃতিতে ইচ্ছাকৃতভাবে গাড়িচাপা দেওয়ার অভিযোগকে মিথ্যা ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে দাবি করেন। সংস্থাটির বক্তব্য, তাদের কর্মকর্তারা আইন প্রয়োগের দায়িত্ব পালন করেন এবং তাদের পেশাগত সততা ও আচরণের সর্বোচ্চ মান বজায় রাখতে হয়। সংবাদমাধ্যমের কারণে কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনা বেড়েছে বলেও দাবি করেছে আইসিই, যদিও এ দাবির পক্ষে কোনো পরিসংখ্যান দেয়নি।
আইসিইর দাবি, মিগুয়েলকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয়নি। সংস্থাটি অন্য এক ব্যক্তিকে আটক করতে চেয়েছিল। ওই ব্যক্তি জোসে মেন্দোজা সারভান্তেসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে অবস্থান এবং একাধিক অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে মিগুয়েলের আইনজীবী কিম ব্রুনো ও অভিবাসী অধিকার সংগঠন ফিয়েলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সিজার এস্পিনোসা জানিয়েছেন, মিগুয়েল কিংবা তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে ওই ব্যক্তির কোনো সম্পর্ক নেই। মিগুয়েলের পরিবার ও আইনজীবীর দাবি, তার কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই এবং ঘটনার সময় তিনি কাজের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন।
শন টিয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, আইসিইর গাড়িতে অন্য একটি অভিযানের দুই ব্যক্তিও ছিলেন। ওই দুজন এবং মিগুয়েল—তিনজনই বর্তমানে আইসিইর হেফাজতে রয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে রাখা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে তার কার্যালয়। তিনি বলেন, কাউকে হেফাজতে নেওয়ার পর একই গাড়িতে অন্য ব্যক্তিদের ধাওয়া করা হলে সংশ্লিষ্ট সবাই ঝুঁকির মধ্যে পড়েন।
তদন্তকারীদের মতে, গাড়িটি বিভাজক পেরিয়ে বিপরীতমুখী সড়কে যাওয়ার সময় জরুরি বাতি ও সাইরেন ব্যবহার করা উচিত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এনবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে থাকা আইসিইর একাধিক কর্মকর্তার শরীরে ধারণযন্ত্র ছিল। সংস্থাটি এসব যন্ত্রের ভিডিও পর্যালোচনা করে অভ্যন্তরীণ তদন্ত চালাচ্ছে।
ঘটনার দুই সপ্তাহেরও কম সময় আগে ট্রাম্প প্রশাসন গাড়ি থামিয়ে অভিযান চালানোর নিয়ম আরও কঠোর করার নির্দেশনা দিয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল, নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই এ ধরনের অভিযান চালাতে পারবেন। অভিযানে ব্যবহৃত গাড়িতে জরুরি বাতি ও সাইরেন থাকতে হবে এবং ঘটনাস্থলে থাকা কর্মকর্তাদের শরীরে ধারণযন্ত্র পরতে ও তা চালু রাখতে হবে।
শন টিয়ারের কার্যালয় ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং যাদের কাছে ছবি বা ভিডিও রয়েছে, তাদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছে। তিনি বলেন, তথ্য দেওয়ার জন্য কাউকে তার নাগরিকত্ব বা অভিবাসনসংক্রান্ত অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে না। তদন্তের মূল লক্ষ্য হলো ঘটনার সত্যতা বের করা।
সূত্র: এনবিসি নিউজ
আরটিভি/জেএমএ


