
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব বা মুখপাত্র কেটি জাকারিয়া স্বীকার করেছেন, তিনি কখনও আইনজীবী হওয়ার পরীক্ষায় পাস করেননি। অথচ বিভিন্ন সময়ে নিজেকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন তিনি। এমনকি ট্রাম্পও তাকে আইনজীবী বলে উল্লেখ করেছেন। বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রক্ষণশীল ভাষ্যকার জ্যাক পোসোবিয়েককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কেটি জানান, তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় আইনজীবী হওয়ার পরীক্ষা দিয়েছিলেন, কিন্তু পাস করতে পারেননি। এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১১ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কোনো অঙ্গরাজ্যেও তিনি এ পরীক্ষায় পাস করেননি।
কেটি পেপারডাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পেশাগত ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে আইন বিষয়ে ডিগ্রি থাকলেই যুক্তরাষ্ট্রে আইনজীবী হিসেবে কাজ করার অনুমতি পাওয়া যায় না; এর জন্য সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হয়।
সাক্ষাৎকারে কেটি বলেন, পরীক্ষার সময় তার বিয়ে এবং স্বামীর চাকরির কারণে চীনে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। এ কারণে পরীক্ষার ফল নিয়ে তিনি খুব একটা ভাবেননি। চীনে নিজের কাজ করার জন্য ওই পরীক্ষায় পাস করার প্রয়োজন ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।
নিজেকে কখনও আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দেননি—এমন দাবি করে কেটি বলেন, এ বিষয়ে অনেক ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। নিজের পরিচয় কীভাবে তুলে ধরবেন, তা নিয়ে তিনি একাধিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়েছিলেন বলেও জানান।
তিনি বলেন, আমি বিষয়টি খুব সতর্কতার সঙ্গে সামলেছি। নিজেকে কখনও আইনজীবী হিসেবে উপস্থাপন করিনি।
তবে এ বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প আলাস্কা সফরে যাওয়ার সময় সাংবাদিকেরা কেটির কাছে জানতে চান, তিনি কোথায় আইনজীবী হওয়ার পরীক্ষায় পাস করেছেন। জবাবে তিনি বলেন, আমি চীনে গিয়েছিলাম। তার এ উত্তর নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, কেটি পেপারডাইন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পেশাগত ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। পরে স্বামীর চাকরির কারণে তিনি চীনে যান। সেখানে একটি মার্কিন বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে তার স্বামী কাজ করতেন এবং কেটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক আইন নিয়ে কাজ করতেন বলে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক বিবৃতিতে কেটি বলেন, তিনি প্রয়োজনীয় যোগ্যতা নিয়েই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক আইন নিয়ে কাজ করেছেন। তবে তিনি কোন যোগ্যতার কথা বলেছেন, তা স্পষ্ট নয়। চীনে আইনজীবী হওয়ার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ কেবল দেশটির নাগরিকদের রয়েছে।
এপ্রিল মাসে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও কেটি বলেছিলেন, তিনি তিন বছর বেইজিংয়ে করপোরেট আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিতিতেও নিজেকে আইনজীবী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্পও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে আইনজীবী বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।
নিউইয়র্ক টাইমসকে কেটি জানিয়েছিলেন, টেলিভিশনে আইনি বিষয়ে আলোচক হিসেবে উপস্থিত হতে শুরু করার সময় তিনি পেপারডাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতির সঙ্গে নিজের পরিচয় কীভাবে তুলে ধরবেন, তা নিয়ে কথা বলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে অ্যাটর্নি বা এসকোয়ার শব্দ ব্যবহার না করতে বলা হয়েছিল, তবে ‘লইয়ার’ শব্দ ব্যবহার করা যেতে পারে বলে জানানো হয়েছিল।
কিন্তু সিএনএনের বৃহস্পতিবারের (১৫ অক্টোবর) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত দুই বছরে কেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তত ১৫টি পোস্টে নিজেকে ‘অ্যাটর্নি’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
এদিকে, বুধবার (১৪ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের একটি বেসরকারি নজরদারি সংস্থা ক্যালিফোর্নিয়ার আইনজীবী নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কাছে কেটির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। সংস্থাটির প্রশ্ন, আইনজীবী হওয়ার পরীক্ষায় পাস না করেও নিজেকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি অঙ্গরাজ্যটির আইন লঙ্ঘন করেছেন কি না।
অভিযোগে ক্যালিফোর্নিয়ার আইন ও পেশাসংক্রান্ত বিধির একটি ধারার উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা আছে, বৈধ অনুমতি ছাড়া কেউ নিজেকে আইন পেশায় নিয়োজিত বা আইনচর্চার অধিকারী হিসেবে উপস্থাপন করলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অভিযোগকারী সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মিশেল কাপারস্মিথ বলেন, কেটি টেলিভিশনে আইনি বিষয়ে আলোচক এবং এখন হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র হিসেবে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে বারবার আইনজীবী পরিচয় ব্যবহার করেছেন বলে তাদের অভিযোগ। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তবে হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক স্টিভেন চিউং অভিযোগকারী সংস্থাটির কঠোর সমালোচনা করেছেন। তার দাবি, সংস্থাটি ট্রাম্পবিরোধী এবং তাদের অভিযোগ গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য নয়। তিনি কেটির যোগ্যতার পক্ষেও অবস্থান নেন। চিউং বলেন, মার্কিন জনগণকে ট্রাম্প প্রশাসনের কাজ সম্পর্কে জানাতে কেটি অত্যন্ত যোগ্য।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক নোরা ফ্রিম্যান ইংস্ট্রম বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ার আইনে এ বিষয়ে অস্পষ্টতা নেই। তার মতে, বৈধ অনুমতি ছাড়া আইনচর্চা করা যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি আইনচর্চার অধিকার রয়েছে বলে মিথ্যা পরিচয় দেওয়াও আইনের আওতায় পড়তে পারে। আদালতে উপস্থিত হওয়া বা কোনো মক্কেলের প্রতিনিধিত্ব করা ছাড়াও এ ধরনের আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কেটির বিরুদ্ধে করা অভিযোগের বিষয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার আইনজীবী নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেবে, তা এখনো জানা যায়নি।
সূত্র: সিবিএস নিউজ
আরটিভি/জেএমএ


